রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

মতামত

ফাঁদে পড়িয়া বগায়……

লিখেছেন: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন প্রকাশিত: ১০ আগস্ট ২০২৬, ১২:০৩ পিএম
ফাঁদে পড়িয়া বগায়……

বলা হয়েছিল আপনি ২০৩০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন, বলা হয়েছিল এরপর আপনি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করবেন, বলা হয়েছিল আপনার গঠিত রাজনৈতিক দলটি দেশের দ্বিতীয় স্থানে থাকা রাজনৈতিক দল হিসেবে আজীবন কার্যক্রম পরিচালনা করবে, বলা হয়েছিল আজীবন আপনি যা চাইবেন সেটি আপনাকে সরবরাহ করা হবে। এটাও বলা হয়েছিল আওয়ামী লীগ চ্যাপ্টার ইজ ক্লোজড।

কিন্তু দু'বছর যেতে না যেতেই পরিস্থিতি এমনটাই পাল্টে গেল যে কিছুতেই আর হিসেব মিলছে না। ২০২৪ সালে বাইডেন সরকারের পরাজয়, বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিগ্রহ এবং বাণিজ্যিক সমস্যাগুলো এত দ্রুত সামনে আসে যে কিছুতেই নিয়োগকর্তারা সামলাতে পারলেন না। তারপর নতুনভাবে বলা হলো আপাতত পরিকল্পনা বদলাতে হবে, দেশের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।

সামনে চলে এলো প্ল্যান বি।

লন্ডন বৈঠকে কথা দেয়া হয়েছিল যে বিএনপি ক্ষমতায় এলে অবধারিতভাবে রাষ্ট্রপতি হবেন তিনি, কিন্তু তাতেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের ব্যাপক চাপ। কারিকরি অর্থ ব্যয় করে, কিছুতেই কোনো কূলকিনারা করতে না পারা।

সামনে এলো তৃতীয় প্রস্তাবনা—জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে বাংলাদেশ তার নাম প্রস্তাব করবে এবং তাকেই জিতিয়ে আনতে ও তাকে এই দায়িত্বে বসাতে যা যা করণীয় সরকার সেটা করবে। সেই মোতাবেক চলল চুলচেরা বিশ্লেষণ, পরিকল্পনা এবং লবিস্ট পাওয়ার নিয়োগ। রাতারাতি হয়েও গেল। বিপুল অঙ্কের বিনিময়ে—অঙ্কটি এই মুহূর্তে বলতে চাই না, কারণ এই প্রক্রিয়ায় নানা পর্যায়ে নানা ব্যক্তি ও নানা প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছেন, দিন যতই যাচ্ছে এই সংখ্যা ততই বাড়ছে।

এক লাখ রোহিঙ্গাকে ইফতার খাইয়ে পরিষ্কারভাবে তিনি জানিয়ে দিলেন আগামী ঈদ তারা তাদের বাড়িতে গিয়ে পালন করতে পারবেন, কিন্তু আগামী বছরের ঈদ আর আসে না। সর্বশেষ জাতিসংঘের মহাসচিবের খসড়া যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, তার নাম সেখানে নেই। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে অর্থ ফেরত চেয়েছেন লবিস্ট ফার্মের কাছে । উল্টো শুনেছেন, "বাড়াবাড়ি করলে সব ফাঁস করে দেব।" মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ হিসেবে যে বক্তব্য তিনি দিয়েছিলেন, যতটুকু গণমাধ্যমে এসেছে, তার বাইরেও অতি আনন্দে তিনি অনেক কিছু বলেছিলেন, অনেকের নাম বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক সংগঠনেরও নাম তিনি জানিয়েছিলেন—এগুলো প্রমাণ হিসেবে বিশেষ একটি জায়গায় সংরক্ষিত রয়েছে।

অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও রাষ্ট্রপতি করা হলে ব্যক্তিগতভাবে তার যে অর্জনের ঝুলি, সেটি আরও সমৃদ্ধ হতো বলে তিনি বারবার অনুরোধ জানিয়েছিলেন; কিন্তু পুরো বিশ্ব এমন বৈরী আচরণ তার সঙ্গে করল, তিনি এর উত্তর খুঁজে পান না—কেন হলো এসব? তিনি না একমাত্র এই অঞ্চলের সমুদ্রের অভিভাবক? বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদন করে নর্থ-ইস্টে সেগুলো না বিক্রি করা হবে? শেখ হাসিনাকে না ভারতে চুপ করে থাকতে হবে?, রিসেট বাটন চেপে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একেবারে না ধ্বংসের কোঠায় স্থাপন করতে হবে? সেনাবাহিনীকে আরও আধুনিকতার নামে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিতে হবে, এবং সবশেষে যে কোনো একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সকল কিছু পরিপূর্ণভাবে সারা জীবনের জন্য আরাম-আয়েশে কাটিয়ে দিতে হবে।

কিন্তু এটা যে বাংলাদেশ, এখানে যে কোনো পরিকল্পনা কিংবা পলিসি কিংবা প্ল্যান এ, প্ল্যান বি, প্ল্যান সি কিছুই খাটে না।

উল্টো পাঁচই আগস্ট দিল্লিতে যা ঘটল, সেটি তো পৃথিবীর ইতিহাসের রেকর্ড । কোন লবিস্ট ফার্মকে কত টাকা দিলে কোনো কোনো বিশ্ববিখ্যাত গণমাধ্যমে সংবাদ ছাপা যায়, মূল পৃষ্ঠায় বড় ছবি ছাপা যায়—এটা তিনি ভালো করে জানেন। কিন্তু দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের খবর বিশ্বের ৪৯৯টি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার পেল; একটি গণমাধ্যমও 'স্বৈরাচার', 'দণ্ডপ্রাপ্ত', 'খুনি', 'দুর্নীতিবাজ' ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করল না। তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? তাহলে কি চূড়ান্ত আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়ে গেছে? আমি তাহলে কী দোষ করেছিলাম? কেন আমাকে এ ধরনের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল? শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এখন তো শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমার কী হবে? বড় মাঠের খেলোয়াড় হিসেবে আমার গন্তব্য তাহলে কোথায়?

এসব ভাবতে ভাবতে বুকে ব্যথা, এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে কত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল দুচোখ বেয়ে! তার হিসেব কে রাখে। কেন জানি আজ বড্ড গাইতে ইচ্ছে করছে, আব্বাসউদ্দীনের বিখ্যাত একটি গান— ফাঁদ বসাইছে ফাঁদিরে ভাই… পুটি মাছও দিয়া….., মাছের লেভে বোকা বগা.. (প্যারিস থেকে), আসে উড়াল দিয়া….. ফান্দে পড়িয়া… বগায় কান্দেরে……

লেখক: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন, সাংবাদিক,রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক,দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা