মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

‘আমার সংবাদ সম্মেলন কীভাবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে? আমি তো অতটা প্রভাবশালী নই,’ বললেন শেখ হাসিনা।

লিখেছেন: সাক্ষাৎকার: শেখ হাসিনা, রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশের পাঁচবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু কন্যা। বাংলা কারেছেন: অশ্রু হাসি,রাজনীতিবিদ,কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রকাশিত: ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২:৪৯ পিএম
‘আমার সংবাদ সম্মেলন কীভাবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে? আমি তো অতটা প্রভাবশালী নই,’ বললেন শেখ হাসিনা।

ভারতে নির্বাসনে থাকাকালে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দলের সহকর্মীদের সাথে দেখা করার অধিকারের কথা উল্লেখ করে দ্য হিন্দু-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এই কথা বলেন। ভারতে অবস্থানকালে সংবাদ সম্মেলন করা এবং আওয়ামী লীগের সহকর্মীদের সাথে দেখা করার অধিকারের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নষ্ট করার কোনো উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না। দ্য হিন্দু-কে দেওয়া লিখিত উত্তর ও দীর্ঘ ফোনালাপসহ এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা—যিনি বাংলাদেশে হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন—বলেন, তিনি বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে অবিচল, যেমনটা তিনি আগেই ঘোষণা করেছেন। তিনি আরও বলেন, তাঁর দল যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে তাঁর পদত্যাগ করা উচিত, তবে তিনি তা করবেন। সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ নিচে দেওয়া হলো:

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকা নিরাপদ অশ্রয়ে আসার সময়ের ঘটনা সম্পর্কে আমাদের কী বলতে পারেন?

বাড়ি থেকে দূরে জীবন কাটানো কখনো সহজ নয়। তাই দেশ ছাড়া আমার জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল। ৫ আগস্টে (২০২৪) আমি স্বেচ্ছায় বাংলাদেশ ছাড়িনি। তারেক (বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান) যখন তাঁর নেতাদের সরকার পতনের জন্য [আরও প্রাণহানির] নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে আমি জানতে পারি, তখন আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে মানুষ হত্যা করাই তাদের মূল উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছে। আমি রক্তপাত চাইনি। তারা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছিল এবং আমাদের ওপর দায় চাপিয়ে দিচ্ছিল। ১৮ জুলাই (২০২৪) আমি হত্যাকাণ্ড তদন্তের জন্য একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করি। ভুক্তভোগীদের দেখতে আমি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। ১৫ জুলাই থেকে ১ আগস্টের (২০২৪) মধ্যে যারা স্বজন হারিয়েছেন, সেই পরিবারগুলোর সাথে আমি দেখা করেছি। আমি শোক প্রকাশ করেছি, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি এবং ক্ষতিপূরণ দিয়েছি। হাইকোর্টের তিনজন বিচারপতিকে নিয়ে কমিশন পুনর্গঠন করে আমি তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করেছিলাম। কিন্তু সহিংসতা থামেনি। পরিস্থিতির অবনতি ঘটতেই থাকে।

পুলিশ সদস্যদের হত্যা করা হচ্ছিল। থানা আক্রমণ করে লুটপাট চালানো হয়। সরকারি সম্পত্তি এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সেই মুহূর্তে আমার চারপাশের পরিস্থিতি খুব দ্রুত খারাপ হয়ে যায়। আমার নিরাপত্তা কর্মী, দলের নেতা এবং পরিবারের সদস্যরা আমাকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ত্যাগ করার অনুরোধ জানান।

সেদিন তাদের উদ্দেশ্য ছিল আমাকে ও আমার বোনকে হত্যা করা। এখন তারা নিজেরাই সেই উদ্দেশ্যের কথা স্বীকার করছে। আমি টুঙ্গিপাড়া (শেখ হাসিনার নিজ শহর) যেতে প্রস্তুত ছিলাম এবং পদত্যাগ করে চলে যাওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলাম। কিন্তু পদত্যাগ করার সুযোগ আমি পাইনি। এমনকি আমি যে দেশ ছেড়ে যাচ্ছি তা-ও জানতাম না। হেলিকপ্টারে ওঠার পর আমার কর্মীদের কাছ থেকে জানতে পারি আমাকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমি বললাম, "কী?" তারা যে এমন পরিকল্পনা করেছিল সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না, তবে তারা বলেছিল আমাকে নিরাপদ রাখার জন্যই তারা এটি করেছে। ভারত খুব অল্প সময়ের নোটিশে আমাকে গ্রহণ করেছে এবং আমার নিরাপত্তা ও থাকার ব্যবস্থা করেছে। তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমাকে আমার নিজের দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে—এটা মেনে নেওয়া আমার জন্য খুব কঠিন ছিল।

তারা আমাকে একাধিকবার হত্যার চেষ্টা করেছে, কিন্তু আমি বেঁচে গেছি। এবারও আমি বেঁচে গেছি। সে কারণেই আমি এখনও আমার মানুষের সাথে, যারা কষ্টে আছে তাদের সাথে, যারা স্বজন হারিয়েছেন এবং যারা বিএনপি ও জামায়াতের নৃশংসতায় আহত হয়েছেন তাদের সাথে কথা বলতে পারছি। আমি বিশ্বাস করি, জনগণের দোয়া ও আল্লাহর ইচ্ছায় আমি এই হত্যাপ্রচেষ্টা থেকেও বেঁচে গেছি।

৫ আগস্ট দিল্লিতে পৌঁছানোর পর আপনার কি ভারতে থাকার ইচ্ছা ছিল, নাকি অন্য কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল? আপনি কি অন্য কোনো দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় বা ভিসার জন্য আবেদন করেছেন?

না, আমি অন্য কোথাও যেতে চাইনি। আমি আমার দেশের পাশেই আছি, আমার মানুষের যতটা সম্ভব কাছাকাছি আছি। এখান থেকে আমি তাদের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারি। অন্য কোথায় যেতাম? অন্য কোথাও কীভাবে থাকতাম? স্থায়ীভাবে বিদেশে থাকার মতো কোনো সামর্থ্য আমার নেই। ১৯৭৫ সালে যখন আমার পরিবারকে হত্যা করা হয়, তখন আমি জার্মানিতে ছিলাম। শ্রীমতি [ইন্দিরা] গান্ধী আমাকে ফোন করে ভারতে এসে থাকতে বলেন। এরপর ১৯৮১ সালে, যখন আমি ছয় বছর ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলাম, তখনও [রাষ্ট্রপতি] জেনারেল জিয়াউর রহমান চাননি আমি ফিরে আসি, কিন্তু আমি ফিরে এসেছিলাম। ২০০৭ সালেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমার প্রত্যাবর্তন চায়নি, আমাকে গ্রেপ্তার করেছিল, তাও আমি ফিরে গিয়েছিলাম। তাই আমি আবারও ফিরে যাব।

আপনি আমেরিকা, যুক্তরাজ্য বা কোনো উপসাগরীয় দেশে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন বলে যে খবর রটেছে, সে সম্পর্কে কী বলবেন?

না, না, এটা সত্য নয়। আমি অন্য কোথাও কেন যাব?

ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্রে, আপনি কি ভারতে থাকাকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বা শ্রীমতি সোনিয়া গান্ধীর সাথে দেখা করেছেন?

সত্যি বলতে, এই পরিস্থিতিতে আমি তাঁদের সাথে দেখা করার চেষ্টা করতে চাইনি। নিঃসন্দেহে তাঁদের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে এখানে থাকাকালে আমি কেবল আমার দলের কর্মী এবং আত্মীয়স্বজনের সাথেই দেখা করব। হয়তো এমন একটি সময় আসবে যখন আমি দেশে ফিরে যাব এবং তারপর আবার ভারতে এসে সংবাদমাধ্যমসহ সবার সাথে দেখা করব (হাসেন)।

ফিরে যাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ, রুট বা প্রবেশপথ কি ঠিক হয়েছে? আপনার সাথে কি আওয়ামী লীগের অন্য নেতারাও ফিরবেন? আপনার ফেরার আগে বাংলাদেশ সরকারের সাথে কোনো আলোচনা হবে কি? যথাযথ সময়ে আমি তা বলব।

আপনি কি নিশ্চিত যে বাংলাদেশ সরকার আপনাকে ফিরে যেতে দেবে, সীমান্তে আটকে দেবে না?

এটি একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি। তারা বারবার ভারত সরকারকে আমাকে বাংলাদেশে পাঠাতে বলে [দণ্ড কার্যকর করার জন্য], কিন্তু আমি যখন বলি যে তাদের আমাকে পাঠানোর দরকার নেই, আমি নিজেই চলে আসব, তখন সেটাও তাদের জন্য সমস্যা বলে মনে হয়।

বাংলাদেশ সরকার বলছে, আপনার সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলন (৫ আগস্ট, ২০২০) ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পরিবেশ নষ্ট করেছে। আপনি কি মনে করেন আপনার প্রকাশ্য মন্তব্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলছে?

কথাটা শুনে আমি অবাক হয়েছিলাম। একটা সংবাদ সম্মেলন কীভাবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে? আমি জানতাম না যে আমি এত প্রভাবশালী যে আমার একটা সংবাদ সম্মেলন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নষ্ট করে দিতে পারে!

২০০৭ সালে তারেক রহমান লিখিত অঙ্গীকার দিয়েছিলেন যে তিনি কখনো রাজনীতি করবেন না। কিন্তু লন্ডনে অবস্থানকালে বিএনপির নেতৃত্ব হাতে নিয়ে তিনি অনলাইনে বক্তব্য দিয়েছেন, ভিডিও কনফারেন্স করেছেন এবং সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন। আমার সরকার কি এই ইস্যু তুলে ব্রিটিশ সরকারকে কোনো চিঠি দিয়েছিল? না। আমরা অন্য কোনো দেশকে তাঁকে স্তব্ধ করার কথা বলিনি। কাউকে ক্ষতি করা আমার উদ্দেশ্য কখনো ছিল না। আমি সত্য বলতে চেয়েছিলাম। বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অংশ। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনুস অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পর এবং ২০২৬ সালের প্রহসনের নির্বাচনের পর বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধু হ্রাস পায়নি, ধ্বংস হয়ে গেছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ৫০টি গণমাধ্যম সংস্থায় ভাঙচুর চালানো হয়েছে বা আগুন দেওয়া হয়েছে। ১৩ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে, ৩৮ জন সাংবাদিককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং ৩০০ জনেরও বেশি সাংবাদিক হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন মামলার মুখোমুখি। তাই আসল প্রশ্ন এটি নয় যে আমার সংবাদ সম্মেলন সম্পর্ক নষ্ট করেছে কি না। আসল প্রশ্ন হলো, সত্য ও বাক স্বাধীনতাকে এত ভয় পাওয়া হচ্ছে কেন।

আপনার প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদে আপনি জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করেছিলেন। সেটা কি কোনো ভুল ছিল? তারা তো এখন দেশের প্রধান বিরোধী দল...

জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা ছিল যুদ্ধাপরাধী—তারা দখলদারিত্বের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে কাজ করেছিল, তারা ধর্ষণ, হত্যা এবং গণহত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল। সে কারণেই তাদের নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে তারা অন্যান্য দলের সাথে জোটে অংশ নিত। ২০১৩ সালে আদালত তাদের নিবন্ধন বাতিল করে, ফলে তারা নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেনি।

সেসব তো বহু বছর আগের কথা। আজ ভারতীয় হাইকমিশন এমনকি ভারতের পররাষ্ট্র সচিবও (বিক্রম মিস্রি) তাদের সাথে বৈঠক করছেন...

যদি তা-ই হয়, তবে এ বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।

ভারত সরকার কি আপনাকে আর কোনো সংবাদ সম্মেলন না করার জন্য অনুরোধ করেছে? ভারত ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে আপনি কেমন সমর্থন আশা করেন?

বাংলাদেশ আজ কিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা বিশ্বের বোঝা জরুরি। সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল, যে দল বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনেছে, তাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মিথ্যা মামলায় আটক রাজনৈতিক বন্দিদের ভয়াবহ অবস্থায় রাখা হয়েছে। আজ অধিকাংশ আওয়ামী লীগ নেতার জামিন নামঞ্জুর করা হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধীরা সংসদে বসে আছে। বাকস্বাধীনতা হারিয়ে গেছে।

আমার দাবিগুলো সহজ। আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, প্রতিটি নাগরিকের—বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং অবাধ চলাচল ও বাক-মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সমর্থন করার আহ্বান জানাই।

বাংলাদেশ সরকার যদি আপনার সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর শর্তে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, আপনি কি তাতে রাজি হবেন?

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগই একমাত্র দল যা একটি সংবিধান অনুযায়ী চলে। দলের নেতাতাই ঠিক করেন দলের নেতা কে হবেন। ১৯৮১ সালে যখন আমি ভারতে নির্বাসনে ছিলাম, তখন দলের কাউন্সিলররা সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাকে সভাপতি করেছিলেন। আমি পদত্যাগ করতে প্রস্তুত, কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কে দেবেন তা নির্ধারণ করার সরকার বা বিএনপি কে?

সরকার কি কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বা আপনাকে আর সংবাদ সম্মেলন না করতে বলেছে? প্রশ্নটি করার কারণ হলো, সম্প্রতি ৩১ আগস্ট দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠান পুলিশ বাতিল করে দেয়, যেখানে আওয়ামী লীগ নেতাদের একটি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা ছিল।

ওই ঘটনা নিয়ে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। আওয়ামী লীগ এর সাথে জড়িত ছিল না। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে আপনার নির্দেশে পুলিশি অভিযানের সময় এই মৃত্যুগুলো ঘটেছে। আপনি কি ব্যক্তিগতভাবে এর দায় স্বীকার করেন? নিহতদের পরিবারের কাছে কি ক্ষমা চাইবেন?

পুলিশ যখন মাঠে কাজ করে, তখন তারা প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য কীভাবে প্রধানমন্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করতে পারে? পুলিশ নির্দিষ্ট নিয়মকানুন (Standard Operating Procedures) মেনে চলে। তারা জরুরি পরিস্থিতি, জনতা নিয়ন্ত্রণ এবং সহিংস পরিস্থিতি সামলানোর জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। যখন পুলিশ সদস্যদের আক্রমণ ও হত্যা করা হয় এবং থানায় আগুন দেওয়া হয়, তখন তারা পরিস্থিতি অনুযায়ী সাড়া দিয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে আমি ব্যক্তিগতভাবে কীভাবে কর্মকর্তাদের আদেশ দিতে পারি?

আমাদের দলের প্রায় ১০ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে, গুম করা হয়েছে, অথবা তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া ও ভাঙচুর করা হয়েছে। ১৬ জুলাই ছাত্রলীগ নেতা সবুজ আলী নিহত হন। তারপর থেকে প্রতিদিন আমাদের কর্মীদের হত্যা বা গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ সদস্য, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, ছাত্র, আইনজীবী, বিচারক, আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়। সরকারি ভবন ধ্বংস করা হয় এবং ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

তারা কি ক্ষমা চেয়েছে? না। মুহাম্মদ ইউনুস তাদের দায়মুক্তি দিয়েছেন। দুষ্কৃতকারীরা প্রকাশ্যে স্বীকারও করেছে যে মেট্রো স্টেশনে আগুন না দিলে এবং পুলিশ সদস্যদের হত্যা না করলে আন্দোলন সফল হতো না। তাহলে কার ক্ষমা চাওয়া উচিত?

আমি ৫ আগস্ট দেশ ছেড়েছি। তারপর থেকে আমার দেশের মানুষ নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর দায় কার? এখনও হত্যাকাণ্ড থামেনি। পরিবারের সদস্যদের সামনে নারী-শিশুদের নির্যাতন ও ধর্ষণ করা হচ্ছে এবং ভিডিও শেয়ার করা হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের থানায় অভিযোগ জানাতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি থানাগুলো আওয়ামী লীগ কর্মীদের প্রাথমিক এজাহারও (FIR) গ্রহণ করে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বিনা কারণে গ্রেপ্তারের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। হত্যা মামলা ও বিস্ফোরক আইনের অধীনে মামলা করা হয় যাতে জামিন না পাওয়া যায়।

আপনি ‘তারা’ এবং ‘আমার মানুষ’ শব্দ দুটি ব্যবহার করছেন। কিন্তু আপনি ১৫ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন—সব বাংলাদেশিই কি আপনার মানুষ নন? অনেক তরুণ আন্দোলনকারী বলেছেন, আপনি যখন তাদের ‘রাজাকার’ বলেছিলেন তখন তারা নিজেকে পর ভেবেছিলেন... আমি যখন 'আমার মানুষ' বলি, তখন আমার দলের কর্মীদের বোঝাই—যাদের মধ্যে ছয় লাখের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে; এত মানুষকে গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা হয়েছে, কোনো আইনি প্রক্রিয়া না মেনেই জেলে নির্যাতন করা হয়েছে। আমি কীভাবে তাদের ভুলে যেতে পারি? অবশ্য, সাধারণ মানুষ সকলেই আমার মানুষ।

আপনি কি এখনও বিশ্বাস করেন যে আপনার উৎখাতে মার্কিন সংস্থা বা বিদেশী শক্তির ভূমিকা ছিল? সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নিয়ে আপনার আগের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এখন আপনার অবস্থান কী?

মুহাম্মদ ইউনুস যখন ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে গিয়েছিলেন, তখন তিনি ক্লিনটন ফাউন্ডেশন আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি গর্ব করে বলেছিলেন যে বাংলাদেশে যা ঘটেছে তা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল না, বরং এটি একটি মাস্টারমাইন্ডের নেতৃত্বে নিখুঁতভাবে তৈরি করা পরিকল্পনা ছিল। কথিত সেই মাস্টারমাইন্ডও পরে একটি সংবাদ সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছিলেন যে আন্দোলনটি কোনো ছাত্র আন্দোলন ছিল না, বরং সরকার উৎখাতের আন্দোলন ছিল। ওই কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। আমি যা বলে আসছিলাম তারা সেটাই নিশ্চিত করেছে: এটি কোনো সাধারণ ছাত্র আন্দোলন ছিল না।

বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের পথগুলো শান্ত ও বিতর্কহীন পথ। এগুলো সামুদ্রিক বাণিজ্য ও ব্যবসায়ের জন্য অন্যতম ব্যস্ত পথ। এগুলো দীর্ঘকাল ধরে শান্ত রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকা উচিত। বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম, স্বাধীন দেশ এবং এটি তা-ই থাকতে হবে। আমাদের ভূমি, সমুদ্র, দ্বীপ এবং সম্পদ অবশ্যই বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থে ব্যবহার হতে হবে। বাংলাদেশ যেন ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র না হয়ে ওঠে।

ভারতের সাম্প্রতিক যুব আন্দোলনকে আপনি কীভাবে দেখছেন? পেছনের দিকে তাকালে, আপনার সরকার কি বাংলাদেশের আন্দোলনগুলো অন্যভাবে সামলাতে পারত?

ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না। ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ, এবং এর জনগণ ও প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব সমস্যাগুলো নিজেরায় সমাধান করবে।

বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার পর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারি চাকরিতে তাঁদের পুনর্বাসনের জন্য কোটা ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। এতে মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

২০১৮ সালে শিক্ষার্থীরা, প্রধানত বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী এবং যারা সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তারা কোটা ব্যবস্থা বাতিলের দাবি জানায়। এমনকি নারীরাও এতে সম্মত হয়। তাই কোটা ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য একটি রিট পিটিশন করা হয়। হাইকোর্ট রিটের পক্ষে রায় দেন, তবে সরকার এর বিরুদ্ধে আপিল করে।

আমি যতই ভিন্নভাবে এটি সামলানোর চেষ্টা করতাম না কেন, তাদের (আন্দোলনকারীদের) একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আমাকে অপসারণ করা। তাদের সাথে কোনো সমঝোতার সুযোগ ছিল না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একজন উপদেষ্টা এ-ও বলেছিলেন যে আমি পদত্যাগ না করলে তারা সশস্ত্র বিদ্রোহে যেতেও প্রস্তুত ছিল।

সাক্ষাৎকার: শেখ হাসিনা, রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশের পাঁচবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু কন্যা। বাংলা কারেছেন: অশ্রু হাসি,রাজনীতিবিদ,কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক