মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

গুলশানে আওয়ামী লীগের হঠাৎ শোডাউন: প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা নাকি পতনের সংকেত ? কাবুলের ছায়া ও ঢাকার উত্তাল রাজনীতি

লিখেছেন: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন। প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৪ এএম
গুলশানে আওয়ামী লীগের হঠাৎ শোডাউন: প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা নাকি পতনের সংকেত ?  কাবুলের ছায়া ও ঢাকার উত্তাল রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার টানাটানি এবং রাজপথের উত্তাপ নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্র ও অত্যন্ত সুরক্ষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশানে ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতিকে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে। একটি নতুন সরকারের সাত মাসের মাথায় ঢাকার রাস্তায় এই ধরনের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক মহড়া, ককটেল বিস্ফোরণ, সেনাটহল এবং পরবর্তী প্রশাসনিক রদবদল দেশের রাজনীতিতে এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গুলশানের উত্তপ্ত দুপুর ও অভূতপূর্ব পরিস্থিতি ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার দুপুরে। রাজধানীর অন্যতম নিরাপত্তা বেষ্টিত এলাকা গুলশান-১ এর ভোলা মসজিদের সামনে থেকে হঠাৎ করেই আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের কয়েক হাজার নেতাকর্মী এক বিশাল মিছিল বের করে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এমন সুরক্ষিত কূটনৈতিক পাড়ায় এটি ছিল চরম বিস্ময়কর এবং অভাবনীয়। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা, মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে চরম উত্তেজনা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে এলে সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মিছিল চলাকালে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় পুলিশ টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ছুঁড়ে মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও চিত্রে রাজপথে চরম বিশৃঙ্খলা ও আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পুলিশি অ্যাকশন ও ককটেল বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থল থেকে দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সেনা মোতায়েন ও প্রশাসনিক রদবদল

ঘটনার আকস্মিকতা কেবল রাজপথের সংঘর্ষেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর পরপরই শুরু হয় এক জটিল নাটকীয়তা। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সমগ্র গুলশান এলাকা জুড়ে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন ও টহল বাড়াতে দেখা যায়। কূটনৈতিক পাড়ার নিরাপত্তার স্বার্থে এটি স্বাভাবিক মনে হলেও, সাধারণ মানুষের মনে তা গভীর সন্দেহের উদ্রেক করেছে।

পাশাপাশি, ঘটনার দিনই গণমাধ্যমের কাছে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য প্রদানকারী গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)-কে তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া বা ক্লোজ করা হয়। একদিকে রাজপথে ককটেল বিস্ফোরণ ও জনস্রোত, অন্যদিকে সেনা মোতায়েন এবং থানার ওসির দ্রুত অপসারণ—সব মিলিয়ে পুরো রাজধানীতে এক থমথমে পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

কাবুল ট্র্যাজেডি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমীকরণ

এই পুরো ঘটনাকে যদি কেবল একটি স্থানীয় রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা হিসেবে না দেখে আন্তর্জাতিক ও ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয়, তবে একটি চরম সত্য সামনে আসে। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের কাবুলে ওয়াশিংটন সমর্থিত আশরাফ গনি সরকারের কীভাবে পতন ঘটেছিল। ক্ষমতার চাটুকারিতা আর বিদেশী শক্তির ওপর অন্ধ ভরসা কীভাবে একটি শাসকগোষ্ঠীকে এক নিমেষে ধূলিসাৎ করে দেয়, কাবুল তার জ্বলন্ত প্রমাণ। বর্তমানে বাংলাদেশে মার্কিন মদদপুষ্ট হিসেবে বিবেচিত তারেক রহমানের নতুন ও রাজনৈতিকভাবে অনভিজ্ঞ প্রশাসনের সামনেও ঠিক একই ধরনের কঠিন পরীক্ষা এসে দাঁড়িয়েছে। বিদেশি সহায়তার ওপর ভর করে সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়া গেলেও, অভ্যন্তরীণ গণঅসন্তোষের মুখে তা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সচেতন মহলে। গুলশানের এই অভূতপূর্ব মিছিল ও উত্তেজনা প্রমাণ করে যে, রাজপথের রাজনৈতিক সমীকরণ ওয়াশিংটন বা ঢাকার নীতি-নির্ধারকদের ভাবনার চেয়েও অনেক বেশি জটিল।

জনজীবনের স্থবিরতা ও অর্থনৈতিক সংকট

গত কয়েক বছরে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও গ্যাসের সংকটসহ সার্বিক স্থবিরতা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ী সম্প্রদায়—সবাইকেই বিপর্যস্ত করে তুলেছে। অর্থনীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় সরকারের নিয়ন্ত্রণহীনতা ক্রমান্বয়ে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। প্রশাসনের এমন কাঁচা হাতে রাষ্ট্র পরিচালনা এবং ক্রমাগত অচল অবস্থার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এই দমবন্ধ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে মানুষ এখন বিকল্প চিন্তা করতে শুরু করেছে। রাজপথের এই উত্তাপ কেবল দেশের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ সমগ্র আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর।

ভবিষ্যতের পথ ও আসন্ন মোড়

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সেনাবাহিনী ও রাজপথের ভূমিকা অত্যন্ত সংবেদনশীল। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফেরানোর কোনো সুনির্দিষ্ট নোটিশ বা লিখিত নির্দেশ না থাকা সত্ত্বেও, পরিস্থিতির প্রয়োজনে সেনাবলের এই ব্যবহার সরকারের ভঙ্গুর অবস্থার কথাই তুলে ধরে। আজকের এই ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, দেশের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করেছে। কাঁচা হাতে রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং বিদেশি শক্তির ওপর অতিনির্ভরশীলতা শেষ পর্যন্ত কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমাধান আনে না। ঢাকার রাজপথের এই উত্তাপ ও গুলশানের বিস্ফোরক পরিস্থিতি হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতির আসন্ন কোনো বড় পরিবর্তনেরই ট্রেইলার। আগামী দিনগুলোতে এই ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

লেখক: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন।