মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

মুখোশের আড়ালে মহালুটপাট:ইউনূস সরকারের দেড় বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশী বিষবৃক্ষ

লিখেছেন: অশ্রু হাসি,রাজনীতিবিদ,কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৪ এএম
মুখোশের আড়ালে মহালুটপাট:ইউনূস সরকারের দেড় বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশী  বিষবৃক্ষ

চব্বিশের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যহীন সমাজ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের স্লোগান তুলে ক্ষমতার মসনদে বসেছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত এই সরকারের ওপর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। তবে দেড় বছরের মাথায় এসে সেই প্রত্যাশার পুরোটাই ধুলায় মিশে গেছে। সুশাসন ও সংস্কারের মুখরোচক বুলি আউড়ে ইউনূস সরকার প্রকৃতপক্ষে কায়েম করেছিল এক অভূতপূর্ব লুটতন্ত্র ও স্বেচ্ছাচারিতা। সাম্প্রতিক সময়ে পুনর্গঠিত দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়া অভিযোগের পাহাড় খুলতেই বেরিয়ে আসছে এই সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের দুর্নীতির থলথলে চেহারা। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, মাত্র ১৮ মাসে ইউনূস, তার উপদেষ্টা ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিমাণ ছাড়িয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা।

উপদেষ্টা আসিফের ১৩ হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য ও ৪ দেশে পাচার

ইউনূস সরকারের দুর্নীতির অন্যতম প্রধান পোস্টার বয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। দুদকের নথিতে তার বিরুদ্ধে এককভাবেই প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এসেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্জিত এই বিপুল অবৈধ অর্থ বিদেশে পাচারের প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে দুদক। আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুবাইয়ের ‘গ্রিন গ্রুপে’ বড় অঙ্কের বিনিয়োগ, পর্তুগালে জমি ক্রয় এবং সুইস ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা রাখার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে।

দুদকের হিসাব অনুযায়ী, আসিফ মাহমুদের সিন্ডিকেট কেবল চার দেশেই পাচার করেছে ১১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা রয়েছে। এই মহালুটপাটের অর্থ হস্তান্তরে আসিফ ব্যবহার করেছেন তার দুই বোনজামাই ও এক ভাগ্নেকে। দুদক ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু করেছে।

সুইস ফ্র্যাংক থেকে নিউইয়র্কের প্রাসাদ: প্রধান উপদেষ্টা ও শীর্ষ সহযোগীদের জালিয়াতি

অভিযোগের তীর থেকে রেহাই পাননি খোদ প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও। পদাধিকারের সুযোগ নিয়ে তিনি চার দেশে—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড ও নরওয়েতে—কমপক্ষে ৫ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন বলে নথিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে নরওয়েতে তার নিজ অ্যাকাউন্টে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানি ‘টেলিনর’ থেকে ৩৭৪ কোটি টাকা জমা হওয়ার সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পর্যালোচনা করছে দুদক। গ্রামীণফোনকে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে এই অর্থ লেনদেন হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে বিচারক, সাব-রেজিস্ট্রার নিয়োগ, বদলি বাণিজ্য ও জামিন বাণিজ্যের মাধ্যমে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক ডজন অভিযোগ জমা পড়েছে। অর্জিত এই অবৈধ অর্থ দিয়ে তিনি নিউইয়র্ক ও ফ্লোরিডায় বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন এবং সুইস ব্যাংকে গোপন হিসাব খুলেছেন।

অন্যতম প্রভাবশালী উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে উঠেছে ৮ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ। তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীর মাধ্যমে সাবেক মন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর সম্পদ বিক্রি করে দুবাই ও লন্ডনে ব্যবসা বিস্তারের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এমনকি আরেক উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম তার নিকটাত্মীয়ের নামে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে বিলাসবহুল বাড়ি কিনেছেন বলে জানা গেছে।

পরিসংখ্যানের আয়নায় ইউনূসের ‘অন্ধকার যুগ’

সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) প্রকাশিত সাম্প্রতিক উপাত্ত ড. ইউনূসের দুর্নীতিমুক্ত শাসনের দাবিকে নির্মমভাবে মিথ্যা প্রমাণ করে। ২০২৪ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ যেখানে ছিল ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ, ২০২৫ সালের হিসাবে তা এক লাফে প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁতে। ক্ষমতার বলয় ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও সরকারি নীতিনির্ধারণী জায়গা থেকে কীভাবে কোটি কোটি ডলার বিদেশে চালান করা হয়েছে, এই পরিসংখ্যানে তার স্পষ্ট প্রতিফলন মেলে।

সুশীল সমাজের চরম নৈতিক দেউলিয়াত্ব বাংলাদেশের ইতিহাসে ওয়ান-ইলেভেনের মতোই চব্বিশ-পরবর্তী সুশীল সমাজ ক্ষমতার সুযোগ পেয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এনজিওনির্ভর, বিদেশি ফান্ডে পরিচালিত এসব ব্যক্তিদের দেশের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা ছিল না। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা দখল করে শুধু সংস্কারের নাটকই সাজায়নি, বরং দুর্নীতি ও প্রতারণায় অতীতের সব রেকর্ড চুরমার করে দিয়েছে। সময় যত গড়াচ্ছে, এই তথাকথিত সুশীল সরকারের দেড় বছরের অপকর্মের ফিরিস্তি ততই দীর্ঘ ও কলঙ্কিত হচ্ছে।

ন্যায্য তদন্ত ও জনগণের দাবি

মব সন্ত্রাস ও সুশাসনের নামে ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হতে শুরু করেছে। দুদক নিরপেক্ষভাবে ও সাহসিকতার সঙ্গে আসিফ মাহমুদসহ শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করায় জনমনে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করে, এটি কেবল একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। অন্তর্বর্তী সরকারের সকল উপদেষ্টা এবং তাদের সুবিধাভোগী চক্রের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও কঠোর আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। লুণ্ঠিত হাজার হাজার কোটি টাকা ফিরিয়ে এনে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

লেখক: অশ্রু হাসি,রাজনীতিবিদ,কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক