‘মাথা নত করব না’: সেবার অঙ্গীকার ও আত্মমর্যাদা: ডব্লিউএইচওর দায়িত্ব ছেড়ে সত্যের জয়ে সায়মা ওয়াজেদ
অন্যায়-অবিচারের কাছে কোনোদিন মাথানত না করার যে শিক্ষা রক্তে প্রবাহিত হয়, তা কোনো পদ কিংবা ক্ষমতার লোভে ক্ষুণ্ণ হতে পারে না। ঠিক যেন সেই অনমনীয় মাতৃত্বের ছায়া, যা ঝড়-ঝাপটার মুখে দাঁড়িয়েও নিজের আত্মসম্মান ও সত্যের জায়গায় অবিচল থাকে। চারপাশের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, ক্রমাগত মিথ্যা রটনা আর অপপ্রচারের জবাব আইনি ও নৈতিকভাবে দেওয়ার পর, এবার বিশ্বমঞ্চে স্বাবলম্বিতা ও আত্মমর্যাদার এক অনন্য নজির স্থাপন করলেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। নিজের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগের কড়া জবাব দিয়ে এবং সমস্ত চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালকের পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে কোনো অপরাধ প্রমাণ ছাড়াই তাকে বিনাবেতনে ছুটিতে রাখা হয়েছিল, বাধা দেওয়া হয়েছিল তার অর্পিত দায়িত্ব পালনে। কিন্তু একজন লড়াকু মায়ের মতোই তিনি নীরবে অন্যায় মেনে নেননি; বরং নিজের আত্মসম্মানকে সর্বোচ্চ আসনে বসিয়ে ছুড়ে ফেলেছেন পদমর্যাদার মোহ। ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদরোস আধানম গেব্রিয়েসুসকে পাঠানো তাঁর পদত্যাগপত্রটি কেবল একটি দাপ্তরিক চিঠি নয়, বরং অন্যায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদী দলিল।
আবেগঘন সেই চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদ লিখেছেন, "আমার অঞ্চলের দেশগুলোর সেবা করার জন্যই আমি আঞ্চলিক পরিচালক পদে নির্বাচিত হয়েছিলাম এবং আমি আন্তরিকভাবে সেই দায়িত্ব পালন করেছি। আপনি যেহেতু আমাকে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনে বাধা দিয়ে চলেছেন, তাই ডব্লিউএইচওতে আপনার নেতৃত্বের ওপর আমার সব আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে আমি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।" (তথ্যসূত্র: রয়টার্স)
এই বাক্যগুলোর প্রতিটি শব্দে মিশে আছে একজন দায়িত্বশীল ও নিষ্ঠাবান মানুষের বুকফাটা কষ্ট, আবার একই সঙ্গে অন্যায়ের সামনে মাথা নোয়াব না—এমন দৃপ্ত অঙ্গীকার। সায়মা ওয়াজেদ কেবল একটি পদের দায়িত্বে ছিলেন না, তিনি এই অঞ্চলের অটিজম ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যেসব কাজ করেছেন, তা হাজারো মায়ের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। অটিস্টিক শিশুদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তিনি সবসময় ছিলেন একজন মমতাময়ী মায়ের মতো।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে আনা কোনো অভিযোগই সত্য বলে প্রমাণিত হয়নি। সত্য ও সততা তাঁর পাশে থাকা সত্ত্বেও যখন প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাঁকে কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছিল, তখন তিনি আপস করেননি। পদ আঁকড়ে ধরে থাকার চেয়ে নিজের ব্যক্তিত্ব, আদর্শ এবং আত্মসম্মান রক্ষা করাকেই তিনি শ্রেয় মনে করেছেন। ইতিহাস সাক্ষী, যারা কোনো অন্যায় না করেও কেবল ষড়যন্ত্রের শিকার হয়, তাদের এই নিঃসংকোচে সরে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ হয়ে দাঁড়ায়। সায়মা ওয়াজেদের এই সাহসী পদক্ষেপ বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করল—পদ কিংবা পদবি সাময়িক, কিন্তু আত্মসম্মান ও নীতির লড়াই চিরন্তন। মাথা নত না করার এই দীপ্ত মানসিকতা যুগ যুগ ধরে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
লেখক: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন।
সম্পর্কিত সংবাদ
মুখোশের আড়ালে মহালুটপাট:ইউনূস সরকারের দেড় বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশী বিষবৃক্ষ
গুলশানে আওয়ামী লীগের হঠাৎ শোডাউন: প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা নাকি পতনের সংকেত ? কাবুলের ছায়া ও ঢাকার উত্তাল রাজনীতি
রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ঝোড়ো প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত: অক্টোবরের আল্টিমেটাম ও ডিসেম্বরের যাত্রা। দিল্লির সংবাদ সম্মেলন থেকে বেনাপোল ট্রানজিট