কৌশলগত বন্দরের নিয়ন্ত্রণ পরদেশিদের হাতে: ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি ঘিরে তীব্র শ্রমিক অসন্তোষ ও শঙ্কা
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং এর সংশ্লিষ্ট ওভারফ্লো ইয়ার্ড ১৫ বছরের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পর বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের ধারাবাহিকতায় কৌশলগত এই জাতীয় সম্পদ বিদেশি অপারেটরের হাতে অর্পণের উদ্যোগ দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক ও শ্রমিক অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।
চুক্তির মূল রূপরেখা ও সরকারি অবস্থান
টার্মিনাল হস্তান্তর: পিপিপি (পিপিপি) প্রকল্পের আওতায় এনসিটি এবং ওভারফ্লো ইয়ার্ডের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে যাচ্ছে।
আর্থিক গুরুত্ব: চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ (২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক) এককভাবে সম্পন্ন হয় এই এনসিটি থেকে।
সরকারি যুক্তি: নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের দাবি, বিদেশি অপারেটর নিয়োগের ফলে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে, টার্মিনালের হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বহুগুণ বাড়বে এবং বৈশ্বিক মানের সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ধারাবাহিক বৈদেশিক নির্ভরতা: একে একে বিদেশিদের হাতে টার্মিনাল বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান টার্মিনালগুলো একে একে বিদেশি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে: • ইতিপূর্বে হস্তান্তরিত: পতেঙ্গা টার্মিনাল (সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল), লালদিয়ার চর ও পানগাঁও আইসিডি (ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস ও সুইজারল্যান্ডের মেডলগ)।
• চলমান প্রক্রিয়া: এনসিটির পাশাপাশি চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) এবং বে পোর্ট-মাল্টিপারপাস টার্মিনালেও বিদেশি অপারেটর বসানোর জোর আলোচনা চলছে।
তীব্র অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া ও শ্রমিক অসন্তোষ
জাতীয় কৌশলগত এই বন্দর বিদেশিদের ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে:
শ্রমিকদের হুঁশিয়ারি: বন্দর রক্ষা কমিটি, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন স্পষ্ট জানিয়েছে যে, বিদেশি শক্তির কাছে টার্মিনাল লিজ দিলে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। বন্দর কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
স্বচ্ছতার অভাব ও মূল্যায়নহীনতা: বন্দর রক্ষা কমিটির অভিযোগ, এনসিটির মতো লাভজনক ও কৌশলগত টার্মিনাল লিজ দেওয়ার আগে এর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য আয়, রাষ্ট্রীয় আর্থিক সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের কোনো পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তুলনামূলক মূল্যায়ন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
কর্মসংস্থানের শঙ্কা: শ্রমিক নেতারা আশঙ্কা করছেন, বিদেশি ব্যবস্থাপনার নামে দেশীয় কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে এবং হাজার হাজার শ্রমিক তাদের চাকরির নিরাপত্তা হারাবেন।
জাতীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরের মূল টার্মিনালগুলোর ব্যবস্থাপনা বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার এই প্রক্রিয়া একদিকে যেমন আধুনিকায়নের তাত্ত্বিক দাবি সামনে আনছে, অন্যদিকে এটি দেশের কৌশলগত নিরাপত্তা, রাজস্ব স্বার্থ এবং শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। স্বচ্ছতার অভাব এবং শ্রমিক অসন্তোষকে পাশ কাটিয়ে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বাস্তবায়ন দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
সামরিক নেতৃত্ব নিয়ে জল্পনা-কল্পনা: কেন দুই প্রধান রাজনৈতিক মেরুর কাছেই ‘অস্বস্তিকর’ সেনাপ্রধান? বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সেনাবাহিনীর অবস্থান
সরকার উৎখাতে আরেকটি জঙ্গি অভ্যুত্থানের ছক?
চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির কাছে হস্তান্তরের সরকারি উদ্যোগ, স্বচ্ছতা এবং সিকিউরিটি নিয়ে যত শঙ্কা এবং এর বহুমুখী প্রভাব।