সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

সংবাদ পর্যালোচনা

সরকার উৎখাতে আরেকটি জঙ্গি অভ্যুত্থানের ছক?

✍ লিখেছেন: নীহারিকা রায়,উন্নয়ন কর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট প্রকাশিত: ৫ অক্টোবর ২০২৬, ৪:০৯ পিএম
সরকার উৎখাতে আরেকটি জঙ্গি অভ্যুত্থানের ছক?

বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশ এখন আষাঢ়ের মেঘের মতো ক্ষণে ক্ষণে রং বদলাচ্ছে। রাজনৈতিক চালবাজি, মূলধারার গণমাধ্যমের অকল্পনীয় নীরবতা এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তির ঘোরে দিশা হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ ও তরুণ সমাজ। সব মিলিয়ে নিকট ভবিষ্যতে বড় কোনো অস্বাভাবিক ঘটনার ইঙ্গিত মিলছে।

বাংলাদেশে পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় আসার সূচনা করেছিলেন বিএনপির জিয়াউর রহমান। দাবি করা হয়, ছোট-বড় মিলিয়ে ১৯টি সেনা অভ্যুত্থান মোকাবিলা করতে গিয়ে তিনি ১৯৭৭ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র দুই মাসে সেনাবাহিনীর ১,১৪৩ জন কর্মকর্তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিলেন। এরশাদের আমলের সাতটি অভ্যুত্থান-প্রচেষ্টাসহ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে এ পর্যন্ত মোট ২৯টি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছে বলে বলা হয়, যার মধ্যে মাত্র চারটি সফল হয়েছিল, বাকি সবই ব্যর্থ।

অভিযোগ আছে, জামায়াত, এনসিপি, এবি পার্টি, বিএনপির ভেতরে লুকিয়ে থাকা স্বাধীনতাবিরোধী অংশ এবং পাকিস্তানপন্থী কিছু বুদ্ধিজীবী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই উন্মত্ত আচরণ করছে। তারা কখনো সেনাবাহিনীর কাঁধে ভর করে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের হত্যা করেছে, আবার কখনো ক্যান্টনমেন্ট দখলের কথা অভিযোগে বলা হচ্ছে। এনসিপির নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী ডিজিএফআই কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন বলেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজ মুখেই স্বীকার করেছেন যে, তাঁরা সুপরিকল্পিতভাবে ক্ষমতা দখল করেছেন। তাঁর শাসনামলে সারা দেশে লাখ লাখ ঘরবাড়ি লুট ও মানুষ হত্যার সুযোগ করে দিয়েছেন, অথচ তখন সেনাবাহিনী নীরব ছিল এমন গুরুতর অভিযোগ আছে। এনসিপির তরুণ নেতারা ক্যান্টনমেন্টে হামলার হুমকি দিলেও সেনাবাহিনী নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল। নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী ডিজিএফআই অফিস গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার পরও তাঁকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার সাহস দেখানো হয়নি। সেনাবাহিনীর একাংশ যে নাহিদদের কাঁধে তুলে উল্লাস করেছে এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ম্যুরাল ভাঙায় সমর্থন দিয়েছে, আজ সেই "চাঁদা ভাই"-রা বারবার সেনাবাহিনীর মর্যাদায় আঘাত করছে।

আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বেনজির ভুট্টো বা কাজী আরেফ আহমেদের হত্যার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না, এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। আওয়ামী লীগের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো মীর জাফর মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে স্নাইপার রাইফেলের মতো আধুনিক অস্ত্র দিয়ে হামলা চালাবে না, তারও গ্যারান্টি নেই। আশঙ্কা আছ যে, ইউনূসপন্থীরা নতুন পরিকল্পনায় তারেক রহমানের বর্তমান সরকারকে হটিয়ে "বিপ্লবী সরকার" গঠন করে বাংলাদেশকে পূর্ব পাকিস্তান বা "বাংলাস্তান" বানানোর দিকে নিঃশব্দে এগোচ্ছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, এর লক্ষণ কী? অভিযোগ রয়েছে, লং মার্চের সময় চট্টগ্রামে পাকিস্তান থেকে খেলার সরঞ্জামের নামে মিথ্যা ঘোষণায় অস্ত্র আনা হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রের খবর অনুযায়ী, এর মাধ্যমে তাদের হাতে ৩০ হাজারেরও বেশি অস্ত্রের মজুত গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া সারা দেশে ২৪টির বেশি লঞ্চপ্যাডে নব্য জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ চলছে বলেও গুরুতর অভিযোগ আছে।

বিএনপির ভেতরে "লুঙ্গির নিচে থাকা" জামায়াত-শিবির নেতারা এখন বেশ সক্রিয়, এবং তাঁরা চূড়ান্ত নির্দেশের অপেক্ষায় আছেন বলে অভিযোগ। এঁরা মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। একটি অংশ বিএনপির মূল দল ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। এমনকি ডজনেরও বেশি এমপি "লুঙ্গির নিচে থাকা জামায়াত-শিবির" নেতা বলে অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা মহানগরীতে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের বেপরোয়া আচরণ কি কোনো ইঙ্গিত দেয় না? মহানগর উত্তরের কমিটি কেন বিলুপ্ত করা হলো, তা কি কেউ জানে না? দলীয় চেয়ারপারসন তারেক রহমানের নির্দেশ উপেক্ষা করে মিরপুরে রড্ডা নামের ক্লিনিক দখল ও বাংলামোটরে চাঁদাবাজির অসংখ্য ঘটনা ঘটছে, অথচ নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে সেসব খবর আসতে দেওয়া হচ্ছে না। বিমানবন্দরে মেজর আখতারের এবং সিলেটের এক নারী এমপির মেয়ের (ছাত্রী সংস্থার সাবেক নেত্রী) আচরণ কি কোনো ইঙ্গিত বহন করে না? গত ৪ অক্টোবর ২০২৬ কুষ্টিয়ায় লালন শাহের মাজার পরিদর্শনের সময় এনসিপি নেতা নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী লাঞ্ছিত হন এবং তাঁর গাড়িবহরে হামলা হয়। এতে ছাত্রদলের নাম এসেছে। এরা কোন পন্থী ছাত্রদল? বিভিন্ন মহল্লা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন আরও অনেক ঘটনা ও অস্ত্রবাজির খবর গণমাধ্যমে আসছে। এদের শিকড় যে ভিন্ন জায়গায় প্রোথিত, তা কি মনে হয় না?

অন্যদিকে, সিভিল ও পুলিশ প্রশাসনে নতুন করে কয়েক হাজার জামায়াত-শিবিরের স্লিপার সেলের নেতা-কর্মী ঢুকেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বহিষ্কৃত ব্রিগেডিয়ার আযমী নতুন প্রমশন পেয়ে বর্তমান সেনাপ্রধানের সহায়তায় নানা অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন, এমন কথা মুখে মুখে ফিরছে। গত ১ তারিখের সেনা দরবারেও এই বিষয়ে অভিযোগ উঠেছে বলে জানা যায়। ছাত্রজীবনে শিবির করা ড. শেখ আব্দুর রশীদ ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব নেন এবং ২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ওই পদে ছিলেন। এ সময় পুলিশে নতুন নিয়োগ ছাড়াও বিভিন্ন দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও বদলি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে পুলিশ ভেরিফিকেশনে বিসিএস থেকে বাদ পড়া বহু শিবির কর্মীকে ছাত্রদল সাজিয়ে সিনিয়রিটি ও বকেয়া বেতন-ভাতাসহ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ড. রশীদের মদদে। সূত্রের খবর, আগামী ডিসেম্বরের আগেই তাদের ঋণ শোধের সময় বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মোট কথা, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতাবিরোধীরা সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামবে, তাতে সন্দেহ নেই। কারণ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন তাদের কাছে জ্বলন্ত অনুপ্রেরণা। অন্যদিকে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিরা তাকিয়ে থাকবে আওয়ামী লীগের দিকে। শোনা যায়, জাসদ কিছু করতে পারে—এই আশঙ্কায় মব ও গণগ্রেফতার করে থামার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের সুবিধাবাদী নেতারা বিদেশি সাহায্যের প্রত্যাশায় বিদেশে আয়েশি জীবিনযাপনে ব্যস্ত আছেন। শুধু জেল-জুলুমে নির্যাতিত ত্যাগী কর্মীরাই ঢাল-তলোয়ার ছাড়া খালি হাতে মাঠে আছেন, অথচ অভিযোগ অনুযায়ী বিপরীত পক্ষ জামায়াতি জঙ্গিদের হাতে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র।

দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বিশেষজ্ঞকে এনে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত করা নানা সেমিনারের বক্তব্য এবং বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা জামায়াত-এনসিপির স্লিপার সেলের তৎপরতা কি এমনি এমনি? এসব কি ডিসেম্বরের আগেই সরকার উৎখাতের আরেকটি জঙ্গি অভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরির ইঙ্গিত বহন করে না?

লেখক: নীহারিকা রায়,উন্নয়ন কর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

এই সংবাদটি শেয়ার করুন:

সম্পর্কিত সংবাদ