রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

কারাপলাতক বন্দি ও জঙ্গিবাদের নতুন ঝুঁকি: দেশের নিরাপত্তায় উদ্বেগ, চলতি বছরে ১২২ বন্দির মৃত্যু, যার সবাই আ'লীগ সংশ্লিষ্ট ।

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা প্রকাশিত: ২০ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৫ এএম
 কারাপলাতক বন্দি ও জঙ্গিবাদের নতুন ঝুঁকি: দেশের নিরাপত্তায় উদ্বেগ, চলতি বছরে ১২২ বন্দির মৃত্যু, যার সবাই আ'লীগ সংশ্লিষ্ট ।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে কারাপলাতক বন্দিদের অবস্থান। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে কারামহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজনস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানান, সেই সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে মোট ২ হাজার ২৪৭ জন বন্দি পালিয়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় ১ হাজার ৫৫৭ জনকে গ্রেপ্তার বা উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনও ৬৯০ জন বন্দি অধরা ও পলাতক রয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য এসেছে নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে। সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়া ৮২৬ জন বন্দির মধ্যে ১৬৬ জন চিহ্নিত জঙ্গি এখনও নিখোঁজ এবং তাদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণ

পলাতক জঙ্গি ও সাজাপ্রাপ্ত বন্দিরা সুসংগঠিত হয়ে পুনরায় উগ্রবাদী তৎপরতা শুরু করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক মহলেও এই সংকট চরমভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে কারাপলাতক জঙ্গি এবং সীমান্ত এলাকার সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, এই নিখোঁজ জঙ্গিরা উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে নতুন করে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে।

বোমা উদ্ধার ও জঙ্গি তৎপরতার আলামত

জাতিসংঘের এই আশঙ্কার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে দেশের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে একের পর এক অব্যবহৃত বোমা, হ্যান্ড গ্রেনেড এবং বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধার করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিভিন্ন আস্তানায় আইইডি (IED) তৈরির সরঞ্জাম মিলছে, যা দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কারাপলাতক জঙ্গিদের একটি অংশ এবং তাদের সহযোগী গোষ্ঠীগুলো একত্রিত হয়ে নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরির চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে।

কারাগারের ধারণক্ষমতা ও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি

আইজি প্রিজনস দেশের কারাগারগুলোর বর্তমান ধারণক্ষমতা ও বন্দি সংকটের চিত্রও তুলে ধরেন। বর্তমানে দেশের ৬০টি জেলা কারাগার এবং ১৫টি সেন্ট্রাল কারাগারে মোট ধারণক্ষমতা মাত্র ৪৫ হাজার। তবে বাস্তবে বন্দির সংখ্যা এর দ্বিগুণেরও বেশি—প্রায় ৯৮ হাজার। চরম স্থানসংকট এবং চিকিৎসক স্বল্পতার দরুন বন্দিদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় এবং বিভিন্ন সময়ে কারাগারে বন্দিদের মৃত্যু নিয়ে স্বজনদের অভিযোগের প্রসঙ্গে তিনি জানান, চিকিৎসায় কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি ছিল না। পরিসংখ্যানে দেখা যায়:

• ২০২৫ সালে মোট ১৮৭ জন বন্দির মৃত্যু হয় (যার মধ্যে ১৮৫ জন ছিলেন তৎকালীন সরকারি দল আওয়ামী লীগ বা তাদের সমর্থক)।

• চলতি বছর (২০২৬) এখন পর্যন্ত ১২২ জন বন্দি মারা গেছেন, যারা সবাই আওয়ামী লীগ রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন।

• বর্তমানে প্রায় ১২২ জন বন্দি কারাগারের বাইরে বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ১৬৬ জন জঙ্গি ও ৬৯০ জন বন্দি মুক্ত থাকা দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্ফোরক ও বোমা উদ্ধারের ঘটনা জঙ্গিবাদের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই সংকট নিরসনে অতিদ্রুত সমন্বিত ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা, দেশের সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার করা এবং পলাতক আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা জরুরি।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)