রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: ভূ-রাজনীতি, কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও ক্ষমতার সমীকরণ

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:১২ এএম
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: ভূ-রাজনীতি, কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও ক্ষমতার সমীকরণ

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে শুরু করে নতুন রাজনৈতিক শক্তির আত্মপ্রকাশ—প্রতিটি পদক্ষেপে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক সমীকরণ। ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় টানাপোড়েন, চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষা এখন নতুন সরকারের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কূটনৈতিক চেষ্টা ও ব্যর্থতা

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এক জোরালো চেষ্টা চালানো হয়েছিল। সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে খোলসা করেন যে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্পর্কের বরফ গলাতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। তিনি তৌহিদ হোসেনকে দিল্লি সফরে যাওয়ার অনুরোধ জানালেও, বিন আমন্ত্রণে কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে দিল্লি যেতে রাজি হননি তৌহিদ হোসেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ধারাবাহিক কঠোর বক্তব্যের বিপরীতে বাংলাদেশও পরবর্তীতে কড়া জবাব দিতে বাধ্য হয়। পররাষ্ট্র উপদেষ্টার ভাষায়, আন্তরিক চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও ভারতের মনোভাবের কারণে এটি শেষ পর্যন্ত এক "ব্যর্থ প্রয়াস"-এ পরিণত হয়।

বহুপাক্ষিক অক্ষ: চীন, পাকিস্তান, তুরস্ক ও আমেরিকার প্রভাব

ভারতের সাথে ঢাকার দূরত্ব বাড়ার সুযোগে চীন, পাকিস্তান ও তুরস্ক বাংলাদেশের সাথে কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে। পাশাপাশি আমেরিকা ও জাপান শেষ মুহূর্তে বেশ কিছু স্পর্শকাতর চুক্তি সম্পাদন করে, যা ভারতের সম্মতি বা আলোচনা ছাড়াই বাস্তবায়িত হয়। অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানেও এর প্রভাব স্পষ্ট—

• চীন: ২১.২১% শেয়ার নিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ট্রেড পার্টনার হিসেবে আধিপত্য বজায় রেখেছে।

• ভারত: ৮.৪৭% বাণিজ্য অংশীদারিত্ব নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।

• আমেরিকা: ৮.৪৬% শেয়ার নিয়ে ভারতের একদম ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলছে।

একসময় বাংলাদেশকে ভারতের একক বড় বাজার এবং মেডিকেল ট্যুরিজমের মূল উৎস (৭০%) হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, বর্তমানে দূরত্বের সুযোগ নিয়ে মার্কিন ও চীনা প্রভাব অর্থনীতিকে নতুন রূপ দিচ্ছে।

ক্ষমতার রদবদল ও তারেক রহমানের কৌশলগত অবস্থান

অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমীকরণে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ড. ইউনূস লন্ডনে গিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতায় জোর দেন। পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার প্রয়াণে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর ঢাকায় সমবেদনা জানাতে এলেও, বিএনপির চীনমুখী ঝোঁক থামেনি।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ এবং সর্বোচ্চ আপ্যায়নের প্রস্তাব সত্ত্বেও তারেক রহমান আগে চীন সফর (মালয়েশিয়া হয়ে ২৪–২৬ জুন) সম্পন্ন করেন। যদিও পরবর্তীতে ভারতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদীর মধ্যস্থতায় দিল্লি সফরের একটি আবহ তৈরি হয়েছিল, কিন্তু ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনলাইন কনফারেন্সে যোগদানের ঘটনায় শেষ পর্যন্ত তারেক রহমানের ভারত সফর স্থগিত হয়ে যায়।

অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানের সামনে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। ভারতের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয়তা দেখালে দেশের অভ্যন্তরে বিরোধী ও ইসলামী দলগুলোর (যেমন জামায়াতে ইসলামী) জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে, চীন-পাকিস্তান লবি কিংবা আমেরিকান পরাশক্তির কৌশলগত সমর্থন হারালে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় টিকে থাকা বেশ কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ফলে অভ্যন্তরীণ জনমত এবং বৈদেশিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষাই হতে যাচ্ছে ঢাকার নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রধান পরীক্ষা।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)