রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: কৌশলগত নীরবতা, ‘লিটমাস চেক’ ও তারেক সরকারের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা প্রকাশিত: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ৯:৫৮ এএম
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: কৌশলগত নীরবতা, ‘লিটমাস চেক’ ও তারেক সরকারের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের ২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন-উত্তর রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে। জিয়াউর রহমান বা বেগম খালেদা জিয়ার সময়কার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ঐতিহ্যগত ভারত-বিরোধী অবস্থান থেকে সরে এসে নির্বাচনী প্রচারণায় তারেক রহমানের নীরবতা নয়াদিল্লিকে ইতিবাচক মনে করে, ফলশ্রুতিতে বিজয়ের পরপরই প্রথম বিদেশী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অভিনন্দন বার্তা, রাষ্ট্রীয় সফরের আমন্ত্রণ এবং স্থগিত ভিসাসমূহ পুনঃচালুর পদক্ষেপ দু'দেশের আস্থার সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের ইঙ্গিত দেয়। তবে এই ইতিবাচকতার পেছনে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের মনে একটি মৌলিক প্রশ্ন এখনও দৃশ্যমান—তারেক রহমানের এই আচরণ কি সাময়িক নির্বাচনী কৌশল ছিলো, নাকি এটি বিএনপির পররাষ্ট্রনীতির এক স্থায়ী গুণগত পরিবর্তন?

ভারতীয় নীতিনির্ধারণে ‘লিটমাস চেক’ ও ইউনূস আমলের উত্তরাধিকার

নয়াদিল্লি তার এই সন্দেহের নিরসন ঘটাতে এবং তারেক রহমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির প্রকৃত গতিপথ মেপে দেখতে একটি বিশেষ ‘লিটমাস চেক’-এর কৌশল গ্রহণ করেছে। ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে গৃহীত একাধিক সিদ্ধান্ত ও আন্তর্জাতিক চুক্তি ভারতের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর ছিল বলে মনে করে নয়াদিল্লি।

ভারতের মূল মূল্যায়ন হলো—ইউনূস সরকার বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির সাথে কৌশলী চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে ভারতের বলয় থেকে পরিকল্পিতভাবে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল। ফলে বিএনপি সরকার সব বিতর্কিত উদ্যোগ ও চুক্তির ক্ষেত্রে কী অবস্থান গ্রহণ করে, তার ওপরই নির্ভর করছে দু'দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের স্থায়িত্ব।

যে ছয়টি প্রধান বিষয়ে নয়াদিল্লির গভীর উদ্বেগ

চীন-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও চট্টগ্রাম ড্রোন কেন্দ্র: নির্বাচনের মাত্র দুই সপ্তাহ পূর্বে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও চীনের ‘সিইটিসি’-র মধ্যে স্বাক্ষরিত ড্রোন কারখানা স্থাপনের চুক্তি ভারতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনে সামরিক ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলার এই পরিকল্পনা ভারতের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। নয়াদিল্লি চায় বিএনপি সরকার এই চীনা সামরিক ড্রোন প্রকল্পের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করুক। পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্কের সুবাতাস: ইউনূস সরকারের আমলে ১৪ বছর পর পাকিস্তানের সাথে সরাসরি বিমান চলাচল, বাণিজ্য পুনরুদ্ধার এবং উচ্চপর্যায়ের সামরিক সংলাপ শুরু হয়। নয়াদিল্লি সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা দাবি করে যে, ঢাকা কোনো অবস্থাতেই ইসলামের সাথে গভীর সামরিক কূটনীতিতে লিপ্ত হবে না। তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা: ইউনূস সরকার নদীর ৫০ বছর মেয়াদী মহাপরিকল্পনায় চীনা সহায়তা চেয়েছিল। ভারতের সুস্পষ্ট দাবি হলো, তিস্তা নদীর চুক্তি বিষয়ক আলোচনা কেবল ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।

সীমান্তবর্তী অঞ্চলে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক উত্থান: ২০২৬-এর নির্বাচনে জামায়াত ৬৮টি আসনে জয়লাভ করেছে, যার প্রায় ৭০ শতাংশ আসন এসেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম সীমান্তবর্তী খুলনা, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ থেকে। এই সীমান্ত সংলগ্ন রাজনৈতিক রূপান্তরকে অবকাঠামোগত নিরাপত্তা উদ্বেগ হিসেবে দেখছে ভারত।

ভারতের ট্রানজিট দাবি: বাংলাদেশের ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে নেপাল ও ভুটানে স্থলপথে সংযোগ সুবিধা পাওয়া এবং বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত জেলাগুলোতে সরাসরি উন্নয়নমূলক বিনিয়োগ করতে চায় ভারত।

শিলিগুড়ি করিডোর (‘চিকেনস নেক’) ও ভূ-কৌশলগত নিরাপত্তা: ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত এই সংকীর্ণ পথের সুরক্ষায় ভারতের সুস্পষ্ট দাবি—বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে এমন কোনো প্রতিকূল সামরিক উপস্থিতি বা অবকাঠামো গড়ে তুলতে দেওয়া যাবে না, যা ভারতের অখণ্ডতাকে ঝুঁকিতে ফেলে।

আগামী দিনের সমীকরণ

তারেক নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার নয়াদিল্লির এসব সংবেদনশীল দাবি ও উদ্বেগকে কীভাবে সমন্বয় করবে, তা বুঝতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে তাঁর ভারত সফর পর্যন্ত। পররাষ্ট্রনীতির এই খেলায় বিএনপির সামনে দুটি স্পষ্ট পথ খোলা রয়েছে:

"যদি বিএনপি সরকার ভারতের নিরাপত্তার জন্য বৈরী বা অচেনা পরিবেশ তৈরি করে, তবে আগামী ২ থেকে ৪ মাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকার কোণঠাসা হয়ে পড়তে পারে। পক্ষান্তরে, যদি ভারতের উদ্বেগকে প্রাধান্য দিয়ে অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখে, তবে আঞ্চলিক রাজনীতিতে হয়তো বিগত ষোলো বছরের সম্পর্কেরই আধুনিক সংস্করণ দৃশ্যমান হলেও হতে পারে।"

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)