শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

অর্থনীতি

৩.২: আইএমএফের শঙ্কাজনক পূর্বাভাস: ৩৮ বছরের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধিতে নামছে বাংলাদেশ, সরকারের বাজেটি লক্ষ্য স্রেফ অলীক স্বপ্ন!

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৪:৫০ পিএম
৩.২: আইএমএফের শঙ্কাজনক পূর্বাভাস: ৩৮ বছরের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধিতে নামছে বাংলাদেশ, সরকারের বাজেটি লক্ষ্য স্রেফ অলীক স্বপ্ন!

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ ফ্ল্যাগশিপ প্রকাশনা ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’-এ ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের অর্থনীতির এক করুণ চিত্র। সংস্থাটির মতে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে মাত্র ৩.২ শতাংশে।

এই পূর্বাভাস যদি সত্যি হয়, তবে তা হবে গত ৩৮ বছরের মধ্যে দেশের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি। জলবায়ু বা প্রলয়ংকারী বন্যার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছাড়াই অর্থনীতির এই নিম্নমুখী ধস দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর চরম ভঙ্গুরতাকেই নগ্নভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

১. প্রবৃদ্ধির বাস্তব চিত্র বনাম সরকারের কাল্পনিক লক্ষ্যমাত্রা চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার যেখানে ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল, আইএমএফের পূর্বাভাসে তা নেমে এসেছে ঠিক অর্ধেকের কাছাকাছি।

ঐতিহাসিক পতন: ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে দেশের প্রলয়ঙ্করী বন্যার পর প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩.১১ শতাংশ। এমনকি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বৈশ্বিক কোভিড মহামারি চলাকালেও বাংলাদেশ ৩.৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে পেরেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই মহামারির সময়কেও ছাপিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ধারাবাহিক অবনমন: আইএমএফ চলতি বছরের এপ্রিলে প্রবৃদ্ধি ৪.৩ শতাংশ এবং জুলাইয়ে ৩.৫ শতাংশ হবে বলে জানিয়েছিল। কয়েক মাসের ব্যবধানে তা কমিয়ে ৩.২ শতাংশে নামিয়ে আনা প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না যে দেশের অর্থনৈতিক সংকট কতটা দ্রুত ঘনীভূত হচ্ছে।

অন্যান্য সংস্থার পূর্বাভাস: শুধু আইএমএফ নয়, বিশ্বব্যাংক (৩.৪%) এবং এডিবি (৪%)—সবকটি বহুজাতিক সংস্থাই সরকারের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে অবাস্তব হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

২. আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের তুলনায় তলানিতে বাংলাদেশ যেখানে বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধির গতি হারিয়ে ধুঁকছে, সেখানে প্রতিবেশী দেশগুলোর পারফরম্যান্স অর্ধেকেরও বেশি এগিয়ে। আইএমএফের একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে ভারতের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৭ শতাংশ এবং ভুটানের প্রবৃদ্ধি ছুঁতে পারে ৬.৯ শতাংশ। এ অঞ্চলভিত্তিক তুলনাই স্পষ্ট করে দেয় যে সমস্যা কেবল বৈশ্বিক নয়, বরং দেশীয় নীতিগত দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটই এর প্রধান অনুঘটক।

৩. ডাবল ডিজিট মূল্যস্ফীতি: ১৬ বছরের রেকর্ড ভেঙে নাভিশ্বাস জনজীবনে প্রবৃদ্ধির ধসের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনে মারাত্মক আঘাত হানতে যাচ্ছে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি।

আইএমএফের অনুমিত হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়াবে ১০.৯ শতাংশে, যা গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সর্বশেষ ২০১০-১১ অর্থবছরে এমন মূল্যস্ফীতি (১০.৯২%) দেখা গিয়েছিল।

সরকার মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও গত সেপ্টেম্বর মাসেই সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪ শতাংশ।

ক্রমাগত উর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি এবং টানা প্রবৃদ্ধির হ্রাস দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতাকে শূলের ওপর দাঁড় করিয়েছে।

৪. শিল্প সংকট, ব্যাংক খাতের ধস ও বিনিয়োগ খরা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চাকা স্থবির হয়ে পড়ায় নতুন বিন্যোগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি থমকে গেছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ উভয়েই ইঙ্গিত দিয়েছে যে:

জ্বালানি সংকট: গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে শিল্প কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাংক খাতের জরাজীর্ণ অবস্থা: ব্যাংকগুলোতে লাফিয়ে বাড়ছে খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি, যা পুরো আর্থিক খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। বেসরকারি খাতে মন্দা: বেসরকারি বিনিয়োগ থমকে যাওয়ায় ব্যবসা প্রসার ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ প্রায় বন্ধ।

৫. উদাসীন প্রশাসনিক অবস্থান ও ঋণ সহায়তার তোড়জোড় ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে অতিরিক্ত ঋণ সহায়তা চেয়েছেন। তবে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের এই আশঙ্কাজনক পূর্বাভাস নিয়ে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল বেশ উদাসীন। তিনি জানান, সরকার অন্য কোনো সংস্থার পূর্বাভাস নিয়ে বিতর্ক করতে চায় না এবং সময়ে সময়ে সূচক পর্যবেক্ষণ করে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে।

একই সাথে, বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে আগামী তিন বছরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ পেতে বাংলাদেশ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে:

প্রকল্প বাস্তবায়নের গড় সময় ৭ বছর থেকে কমিয়ে ৫ বছরে আনা। প্রকল্প অনুমোদনের সময় ১৮ মাস থেকে কমিয়ে ৮ মাসে নামিয়ে আনা।

শেষ কথা পর পর কয়েকটি বহুজাতিক আর্থিক সংস্থার একই ধরনের নেতিবাচক পূর্বাভাস স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এখন এক মারাত্মক সংকটকাল অতিক্রম করছে। বাস্তবভিত্তিক নীতি সংস্কার, ব্যাংক খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জ্বালানি সংকট সমাধান না করে স্রেফ বাজেটে কাল্পনিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কিংবা অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণ এনে এই পতন ঠেকানো সম্ভব নয়।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: