সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

অর্থনীতি

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অনুপস্থিতি: ইইউর বাণিজ্য বয়কটের মুখে বাংলাদেশ ও নীতিনির্ধারকদের ব্যর্থতা এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অনুপস্থিতি: ইইউর বাণিজ্য বয়কটের মুখে বাংলাদেশ ও নীতিনির্ধারকদের ব্যর্থতা এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কড়া বার্তা ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের নতুন সংকট রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) এক কূটনৈতিক বক্তব্যে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে এক নতুন ও উদ্বেগের চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। ফ্রান্সসহ প্রধান ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সমমানের ও বৈষম্যহীন সুযোগ-সুবিধা (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) না পেলে ইউরোপীয় দেশগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রসার থেকে বিরত থাকবে।

বৈষম্যমূলক বাণিজ্যিক নীতি ও বিমান ক্রয় কূটনীতি: বোয়িং বনাম এয়ারবাস বিতর্ক বাণিজ্যে বৈষম্যের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ উঠে এসেছে বিমান ক্রয় সংক্রান্ত চুক্তির আলোচনায়। অতীতে ইউরোপীয় ইইউভুক্ত দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে এবং বাণিজ্যিক বৈচিত্র্য আনতে ইউরোপের কনসোর্টিয়াম ‘এয়ারবাস’ থেকে বিমান ক্রয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল মনোপলি বা একক আধিপত্য ভেঙে স্পেয়ার পার্টস ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমানো।

চুক্তির পরিবর্তন:

বিগত সময়ে এই পরিকল্পনা থেকে সরে এসে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ‘বোয়িং’ থেকে অতিরিক্ত বিমান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

দ্বিমুখী মানদণ্ড: ড. মোমেনের মতে, ইউরোপের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্যে ও চুক্তিতে সমতা বজায় না রেখে বিশেষ কোনো এক পক্ষের প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁক দেখানোর ফলেই ইইউ দেশগুলোর মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম হয়েছে।

জিএসপি প্লাস সুবিধা ও রফতানি বাণিজ্যের ওপর সম্ভাব্য আঘাত

বাংলাদেশ ২০২৬ সালে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) তালিকা থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। এলডিসি থেকে বের হয়ে গেলে ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে হলে জিএসপি প্লাস (GSP+) সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি ছিল।

ঝুঁকিতে রফতানি খাত:

বাংলাদেশের মোট রফতানির প্রায় ২২ শতাংশই যায় ইউরোপীয় বাজারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি তাদের বাণিজ্যে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে কড়াকড়ি আরোপ করে বা বিনিয়োগ বন্ধ রাখে, তবে দেশের তৈরি পোশাক খাতসহ পুরো অর্থনীতি মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

বিনিয়োগ স্থবিরতা:

বিগত আড়াই বছরে ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বৈদেশিক বিনিয়োগ না আসার পেছনেও এই নীতিগত অস্বচ্ছতা ও বৈষম্যমূলক আচরণ বড় ভূমিকা রেখেছে।

রাজনৈতিক বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার আন্তঃসম্পর্ক

বাণিজ্যিক নীতির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বৈষম্যমূলক চরিত্রও আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ সীমিত রাখা, ঢালাও আইনি পদক্ষেপ এবং প্রশাসনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অনুপস্থিতি বিদেশি অংশীদারদের সন্দিহান করে তুলেছে। অর্থনীতি ও রাজনীতি ও তপ্রোতভাবে জড়িত। একপাক্ষিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং বৈষম্যমূলক ট্রেড পলিসি চলতে থাকলে একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক বাজার হার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ধসে পড়ে চরম অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করবে।

উত্তরণের পথ ও সংলাপের আবশ্যকতা

ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই সতর্কবার্তা বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিগন্যাল। বৈষম্যমূলক নীতি থেকে সরে এসে বাণিজ্য ও রাজনীতি উভয় ক্ষেত্রেই সমতা বা 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' নিশ্চিত না করলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদের হারানো ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতে সকল রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি অর্থবহ সংলাপের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছ কূটনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: