শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

মতামত

মিডিয়ায় আওয়ামী লীগের দুর্বলতা কবে কাটবে?

লিখেছেন: নীহারিকা রায় প্রকাশিত: ৩০ জুলাই ২০২৬, ৯:৪০ এএম
মিডিয়ায় আওয়ামী লীগের দুর্বলতা কবে কাটবে?

বর্তমান বিশ্ব পরিচালনায় মিডিয়া বা গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম, আর এই মিডিয়া-জগতে এখন সবচেয়ে বড় ক্ষমতার অধিকারী সোশ্যাল মিডিয়া। বাংলাদেশের মতো অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে উদীয়মান একটি দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক সচেতনতায় সোশ্যাল মিডিয়া অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে। এটি যেমন একদিকে জনসংযোগ বাড়ায় এবং তরুণদের ইতিবাচক কাজে সম্পৃক্ত করে, তেমনি অন্যদিকে রাজনৈতিক অপপ্রচার ও উস্কানি ছড়ানোর অন্যতম হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। বলা যায়, প্রচলিত মূলধারার গণমাধ্যমকে পেছনে ফেলে সোশ্যাল মিডিয়া আজ জনমত গঠনের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার বিপুল বিস্তার ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশ্ব পরিসংখ্যানের উপাত্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৭৮ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ১৫ কোটি ১৯ লাখ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন এবং ৯ কোটি ৯১ লাখের বেশি মানুষ ইন্টারনেট সেবার আওতায় রয়েছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশের ৮৯.৪% মানুষ মোবাইল ফোন এবং ৫৮.৪% মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে গ্রাম বা শহরের সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র মানুষের পক্ষে নিয়মিত সংবাদপত্র পড়া বা টেলিভিশনের সামনে বসা সবসময় সম্ভব হয় না। ফলে তথ্যপ্রবাহের জন্য তারা পরিবারের হাতে থাকা মোবাইল ও ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, আর এ কারণেই সহজলভ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের সম্পৃক্ততা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, সোশ্যাল মিডিয়া এখন ক্ষুদ্র ব্যবসা, বিনোদন এবং অনেকের জন্য আয়ের অন্যতম উৎসেও পরিণত হয়েছে। গ্রামের অনেক তরুণ আজ সফল কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছেন। এই বিপুল জনপ্রিয়তার কারণেই প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোও এখন তাদের কনটেন্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করতে বাধ্য হচ্ছে। রাজনৈতিক সংগঠনে নাগরিক সাংবাদিকতা ও সোশ্যাল মিডিয়া প্রচলিত মিডিয়া এড়িয়ে সরাসরি জনগণের কাছে দ্রুত বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলো এখন সোশ্যাল মিডিয়াকে বেছে নিচ্ছে। খুব কম খরচে ও দ্রুততম সময়ে নিজেদের মতাদর্শের কর্মী-সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ করতে সোশ্যাল মিডিয়া অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এ ছাড়া এই প্ল্যাটফর্ম মূলধারার গণমাধ্যমের বাইরে স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ তৈরি করেছে, যাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে 'নাগরিক সাংবাদিকতা'। প্রতিটি মোবাইল ফোন এখন একেকটি ক্যামেরা—কোনো ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই সাধারণ মানুষ তার ভিডিও তৈরি করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে পারছেন, যা বিশাল জনবল থাকা সত্ত্বেও মূলধারার গণমাধ্যমের পক্ষে একা কভার করা সম্ভব নয়। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ার এই তথ্যের ওপর এখন মূলধারার সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলগুলোকেও নির্ভর করতে দেখা যায়। কোটা সংস্কার আন্দোলন কিংবা নিরাপদ সড়কের দাবির মতো বড় বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন অনলাইনেই সংঘটিত হয়ে জনপ্রিয় রূপ পেয়েছিল। ২০২৪ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলনে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। সত্য-মিথ্যার মিশ্রণে তৈরি ছবি ও ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করেছিল, যা নীতিনির্ধারকদের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছিল। সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার ও ড. ইউনূসের পিআর নেটওয়ার্ক তবে সোশ্যাল মিডিয়ার তীব্র নেতিবাচক দিকও রয়েছে। অপপ্রচার ও গুজব ছড়িয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা, অন্ধ দলীয় আনুগত্য এবং উগ্রবাদ ছড়ানোর কাজেও একে ব্যবহার করা হচ্ছে। অভিজ্ঞ মহল জানেন, ইউনূস সেন্টার মূলত সামাজিক ব্যবসা (Social Business) ও ক্ষুদ্রঋণ সংক্রান্ত বৈশ্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়, তাদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা কেবল বাংলা ও ইংরেজিতে সীমাবদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চিন্তাভাবনা ও 'ইতিবাচক ইমেজ' বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে বিশ্বের ১১৪টিরও বেশি 'ইউনূস সোশ্যাল বিজনেস সেন্টার' (YSBC) কাজ করে যাচ্ছে। এই আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, ইন্টার্নশিপ ও এক্সপোজার ভিজিট প্রোগ্রামের মাধ্যমে তাদের মিডিয়া সেল বিশ্বমানের দক্ষ কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের যুক্ত রেখেছে। ড. ইউনূসের পিআর টিম অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে সারা বিশ্বে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে রাতদিন কাজ করে চলেছে, ইচ্ছামতো ন্যারেটিভ তৈরি করছে। আওয়ামী লীগের প্রচারণায় অভাব ও সমন্বয়হীনতা বিপরীত চিত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তথা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোটি কোটি মানুষ দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকলেও একটি সুনির্দিষ্ট ও পেশাদার পরিকল্পনার অভাবে সেই বিপুল জনশক্তিকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষমতার রাজনীতি বা পদ-পদবি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও, তথ্যের এই আন্তর্জাতিক যুদ্ধে দলকে এগিয়ে রাখার তাগিদ বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা ছাড়া আর কারও মধ্যে তেমন প্রখরভাবে দেখা যায় না। যা কিছু কাজ হয়, তা অত্যন্ত বিক্ষিপ্তভাবে হয়; কোনো সুসংগঠিত বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস সেখানে নেই। ফলস্বরূপ, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এবং আওয়ামী লীগকে ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে বিপুল পরিমাণ মিথ্যাচার ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও তথ্যভিত্তিক জবাব দেওয়ার মতো শক্তিশালী কোনো প্ল্যাটফর্ম বা দলবদ্ধ প্রচেষ্টা চোখে পড়ছে না। অনেকে সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)কে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রচার সেল মনে করলেও আসলে এটি আওয়ামী লীগের গবেষণা সেল। রাজনৈতিক ময়দানে বর্তমানে তথ্যের লড়াইটাই আসল লড়াই। অপপ্রচার প্রতিহত করতে এবং সত্য ইতিহাস ও দেশের উন্নয়নচিত্র মানুষের কাছে তুলে ধরতে আওয়ামী লীগকে সনাতন ধারার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দক্ষ জনবল গঠন, আধুনিক প্রযুক্তি ও সুসংগঠিত তথ্য সেলের মাধ্যমে একাধিক প্ল্যাটফর্মে সোশ্যাল মিডিয়ায় কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে না পারলে, এই প্রচার-যুদ্ধে পিছিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

লেখক: নীহারিকা রায়,রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট