ঢাকা থেকে ওয়াশিংটন: সেনা-প্রশাসন সম্পর্কের ফাটল ও উদ্ভূত নতুন সমীকরন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ে একটি চাঞ্চল্যকর গুঞ্জন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। শেখ হাসিনার পতনের দুই বছর এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সাত মাসের মাথায় এসে রাষ্ট্রযন্ত্রের দুই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ—সরকার এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে কি সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়েছে?
১. ৫ আগস্টের পটপরিবর্তন ও সেনাপ্রধানের দৃঢ় ভূমিকা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের সংকটময় মুহূর্তে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অত্যন্ত চতুর ও কৌশলী পন্থায় টিকিয়ে রাখা এবং পর্দার আড়ালে সংকট মোকাবেলায় সেনাপ্রধানের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। তবে মিয়ানমার সীমান্ত বা ট্রানজিট উদ্যোগের মতো জাতীয় নিরাপত্তার সংবেদনশীল ইস্যুতে সেনাপ্রধানের 'নো-ননসেন্স' অবস্থান বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সেনাবাহিনী কোনোভাবেই আপস করবে না।
২. সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যকার শীতল লড়াইয়ের সূত্রপাত তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সাত মাসের মাথায় এসে বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে সেনাবাহিনীর ক্ষমতার ভারসাম্যে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। গত ৮ সেপ্টেম্বরের একটি ঘটনাকে এর তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের লিখিত নির্দেশ ও প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার নিয়ন্ত্রণাধীন অফিস থেকে ৪টি গুরুত্বপূর্ণ বদলি ও পদোন্নতির চিঠি ইস্যু করা হয়, যা সেনাপ্রধানের কর্তৃত্বকে খর্ব করার সুপরিকল্পিত চাল হিসেবে গুঞ্জন তুলেছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত পুরো মেয়াদ শান্তিপূর্ণভাবে চলার আশ্বাস দিয়েছেন, তবুও সামরিক মহলে আস্থার সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
৩. সেনাপ্রধানের বিদেশ সফর ও জিও (GO) জটিলতা পরিস্থিতির জটিলতা আরও স্পষ্ট হয় গত ৩ অক্টোবর সেনাপ্রধানের অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সফরকে কেন্দ্র করে। কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক সরকারি আদেশ বা জিও (GO) ছাড়াই তার ঢাকা ত্যাগের ঘটনাটি নজিরবিহীন। পরবর্তীতে তিনি দেশ ছাড়ার পর সরকারের নীতিনির্ধারকদের বোধোদয়ে এই আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়, যা শীর্ষ মহলের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতার ইঙ্গিত দেয়।
৪. সেনা দরবারে মধ্যমসারী অফিসারদের কঠিন প্রশ্ন
গত ১ অক্টোবর কর্নেল ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদার মধ্যমসারীর সেনা অফিসারদের নিয়ে আয়োজিত এক সেনা দরবারে শীর্ষ নেতৃত্বকে বেশ কিছু বিব্রতকর প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। অফিসারদের প্রধান উদ্বেগগুলো ছিল:
৫ আগস্টের আগের রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের কাস্টডি বা বন্দিদশার দীর্ঘসূত্রিতা।
বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার নামে নিয়মিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় দীর্ঘ সময় ধরে সেনাবাহিনীর রাজপথে মোতায়ন থাকা।
অতীতের বিভিন্ন নিরাপত্তা অভিযানের প্রকৃত কার্যকারিতা ও সফলতা।
৫. প্রবীণ সেনা কর্মকর্তাদের কোণঠাসা অবস্থা ও মেরুকরণ অতীতে বেগম খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন ও ৫ আগস্টের রাজনৈতিক সমঝোতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা প্রবীণ ও অবসরপ্রাপ্ত অনেক সিনিয়র সেনা কর্মকর্তা (যেমন—মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর) বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারণী পরিমণ্ডলে উপেক্ষিত ও কুণঠাসা বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে এই অভিজ্ঞ কর্মকর্তা ও প্রবীণ অংশটি বর্তমান সরকারের ওপর থেকে মনোযোগ সরিয়ে সরাসরি সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারের পেছনে শক্তিশালী প্রাচীর হয়ে দাঁড়াচ্ছেন।
৬. বিএনপির অন্দরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও 'ওল্ড গার্ড' বনাম 'লন্ডন ক্লাব'
বিএনপির ভেতরেও ক্ষমতার লড়াই এখন স্পষ্ট। একদিকে বেগম খালেদা জিয়ার অনুসারী পুরনো রাজনৈতিক অভিভাবক বা 'ওল্ড গার্ড', অন্যদিকে তারেক রহমানের লন্ডন থেকে আসা ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ায় দলে গভীর বিভাজন তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, দলের প্রবীণ ও পরীক্ষিত নেতাদের অবমূল্যায়ন এবং নীতিনির্ধারণে নতুনদের আধিপত্য ভবিষ্যতে বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে।
৭. মার্কিন সংস্থার সঙ্গে বিতর্কিত চুক্তি ও অর্থনৈতিক বিতর্ক
অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ের পাশাপাশি একটি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আমেরিকার ভার্জিনিয়াভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি 'সিকিউরি পোর্ট'-এর হাতে বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ স্থল সীমান্ত অবকাঠামোর বায়োমেট্রিক ডাটা, কার্গো এবং অভিবাসন স্ক্রিনিংয়ের পূর্ণাঙ্গ অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। মন্ত্রিসভার এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর প্রভাবে এই চুক্তি ত্বরান্বিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা নিয়ে বিএনপি ও সশস্ত্র বাহিনীর একটি বড় অংশে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে।
শেষ কথা বর্তমান রাজনৈতিক-সামরিক পরিস্থিতি কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; এটি ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং ভূ-রাজনীতির এক জটিল মারপ্যাঁচ। একদিকে তারেক রহমানের নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এবং অন্যদিকে জেনারেল ওয়াকারের নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী সেনাবাহিনীর মধ্যকার এই আস্থার ফাটল যদি দ্রুত নিরসন না হয়, তবে তা দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারে। সেনাপ্রধান বা আইএসপিআর-এর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে স্বচ্ছ ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা না আসায় জনমনে ধোঁয়াশা আরও ঘনীভূত হচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে এই পরিস্থিতির মোড় কোন দিকে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভারত সফর: বাণিজ্য টানাপোড়েন, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও বাংলাদেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
শেখ হাসিনার স্বদেশ ফেরার ঘোষণা ও ট্রাভেল পাস জল্পনা: কূটনৈতিক চাপ, আইনি জটিলতা এবং রাজনীতির উত্তপ্ত মেজাজ: একটি গভীর বিশ্লেষণ
সেনাপ্রধানের পদ নিয়ে টানাপোড়েন ও ক্ষমতার রাজনীতি: অন্তরালের সমীকরণ