শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভারত সফর: বাণিজ্য টানাপোড়েন, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও বাংলাদেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব

প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৪:৪৮ পিএম
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভারত সফর: বাণিজ্য টানাপোড়েন, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও বাংলাদেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব

১৭ থেকে ২২ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বহুল আলোচিত পাঁচ দিনের ভারত ও উজবেকিস্তান সফর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে প্রস্তাবিত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি (BTA), যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি এবং H-1B ভিসা সংক্রান্ত আইনি জটিলতার কারণে যখন দু'দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন তীব্র, ঠিক সেই মুহূর্তে এই সফর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, এই সফরে রুবিও ভারতের বাণিজ্যিক হাব মুম্বই ও জ্বালানি প্রক্রিয়াজাতকরণের কেন্দ্র জামনগরে বিভিন্ন বৈঠকে অংশ নেবেন। এছাড়া মধ্য এশিয়ায় প্রভাব বাড়াতে তিনি উজবেকিস্তানের সমরখন্দে C5+1 মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনেও অংশগ্রহণ করবেন।

১. ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের মূল টানাপোড়েন: বাণিজ্য, শুল্ক ও ভিসা নীতি

চলতি বছরের মে মাসে কোয়াড (Quad) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের পর এটি রুবিওর দ্বিতীয় ভারত সফর। তবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সাম্প্রতিক কিছু তিক্ততা এই সফরকে জটিল করে তুলেছে:

• বাণিজ্য চুক্তিতে অনিশ্চয়তা: চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে উভয় দেশ একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির কাঠামো ঘোষণা করলেও আমেরিকার পরিবর্তিত শুল্ক কাঠামোর কারণে প্রক্রিয়াটি থমকে গেছে। কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল সম্প্রতি স্বীকার করেছেন যে প্রেক্ষাপট বদলে গেছে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনা করেই চূড়ান্ত চুক্তি করতে হবে। • H-1B ভিসা ও গ্রিন কার্ডে নতুন বাধা: মার্কিন প্রশাসনের নতুন অভিবাসন নীতি অনুযায়ী H-1B ভিসার ফি ১ লাখ ডলারে উন্নীত করা এবং Permanent Labor Certification (PERM) স্থগিত করার সিদ্ধান্তে ভারতীয় প্রযুক্তি খাত (যেমন: Infosys, TCS, Wipro) বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের "আমেরিকানদের আগে নিয়োগ" দেওয়ার আহ্বানের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই মন্তব্যকে "গভীরভাবে অপমানজনক" বলে আখ্যা দিয়েছে। • জ্বালানি ও বাণিজ্য ভারসাম্য: একদিকে ওয়াশিংটন ভারতের রুশ জ্বালানি আমদানির ওপর রাশ টানতে চায়, অন্যদিকে জামনগর সফরের মধ্য দিয়ে মার্কিন জ্বালানি সংস্থাগুলোর জন্য ভারতের রিফাইনিং ও ক্লিন এনার্জি খাতে বড় বাণিজ্যিক বিনিয়োগ উন্মুক্ত করাই রুবিওর মূল কৌশল।

২. দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এই সফরের প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ায় চিনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব রুখতে ভারত-আমেরিকা অক্ষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিশ্বরাজনীতির বর্তমান পেক্ষাপটে রুবিওর এই সফর আঞ্চলিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করছে: • কোয়াড (Quad) ও চীন প্রতিরোধ: এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বেইজিংয়ের প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখে। অর্থনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে যৌথ অংশীদারিত্ব অব্যাহত রাখার স্পষ্ট বার্তা দিবে এই সফর। • মধ্য এশিয়ায় নজর : উজবেকিস্তানের সমরখন্দে কিরঘিজস্তান, কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের C5+1 বৈঠক প্রমাণ করে যে ওয়াশিংটন চীন ও রাশিয়ার প্রথাগত ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের ভেতরে নিজস্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি পথ তৈরি করতে চাচ্ছে। • আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য: ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির বাণিজ্যিক টানাপোড়েন সাময়িকভাবে স্পষ্ট হলেও নিরাপত্তা ইস্যুতে তাদের ঐকমত্য দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের কৌশলগত অবস্থানকে মার্কিন সমর্থন ধরে রাখতে সাহায্য করবে।

৩. বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য প্রভাব মার্কো রুবিওর এই সফর প্রত্যক্ষভাবে ভারতের জন্য হলেও, পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক অঙ্গনে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে:

(ক) ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও রাজনৈতিক প্রভাব • যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সমঝোতার চাপ: ওয়াশিংটন দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলকে দেখতে ভারতের কৌশলগত চোখ অনেকটাই ব্যবহার করে থাকে। ভারত ও আমেরিকার মধ্যে যদি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংহতি বাড়ে, তবে বাংলাদেশে অবাধ গণতান্ত্রিক চর্চা, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন ভারতের রাজনৈতিক চাওয়াকে কতটুকু ছাড় দেবে বা সমন্বয় করবে—তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি বড় বিবেচ্য বিষয় হবে। • দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে ভারসাম্যের খেলা: বাংলাদেশ বর্তমানে চীন ও ভারতের পাশাপাশি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গেও বাণিজ্যিক ও কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখে চলছে। ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের এই নতুন মোড় ঢাকায় চীন ও আমেরিকার মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করতে পারে। (খ) অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রভাব • পোশাক ও তৈরি পণ্য রফতানিতে প্রতিযোগিতা: ভারত যদি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক সুবিধা আদায়ে সফল হয়, তবে পোশাক ও অন্যান্য রফতানি খাতে বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তবে মার্কিন শুল্কনীতি যদি ভারতের ওপর কঠোর থাকে, তবে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিছুটা স্বস্তি পাবে। • অভিবাসন ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত (IT Sector): মার্কিন প্রশাসন ভারতীয় আইটি কর্মীদের ওপর H-1B ভিসা কড়াকড়ি করায় ভারতের আইটি ইন্ডাস্ট্রি কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে। এতে মার্কিন টেক-কোম্পানিগুলো বিকল্প আউটসোর্সিং হাব হিসেবে বাংলাদেশ ও অন্যান্য প্রতিবেশীদের বিবেচনায় নিতে পারে, যা বাংলাদেশের আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের জন্য একটি সম্ভাব্য সুযোগ তৈরি করতে পারে।

শেষ কথা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভারত ও উজবেকিস্তান সফর কেবল বাণিজ্যিক মতপার্থক্য নিরসনের দ্বিপাক্ষিক প্রয়াস নয়, বরং এটি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত উপস্থিতি জোরদারের পদক্ষেপ। শুল্ক ও ভিসা বিতর্ক সত্ত্বেও দুই গণতান্ত্রিক পরাশক্তির কৌশলগত জোট অপরিবর্তিত থাকছে। তবে এই সফরের ফলাফল পুরো দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক গতিপথের পাশাপাশি বাংলাদেশের আঞ্চলিক রাজনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের কৌশলে নতুন সমীকরণ সৃষ্টি করতে যাচ্ছে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: