শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

শেখ হাসিনার স্বদেশ ফেরার ঘোষণা ও ট্রাভেল পাস জল্পনা: কূটনৈতিক চাপ, আইনি জটিলতা এবং রাজনীতির উত্তপ্ত মেজাজ: একটি গভীর বিশ্লেষণ

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১:৪২ পিএম
শেখ হাসিনার স্বদেশ ফেরার ঘোষণা ও ট্রাভেল পাস জল্পনা: কূটনৈতিক চাপ, আইনি জটিলতা এবং রাজনীতির উত্তপ্ত মেজাজ: একটি গভীর বিশ্লেষণ

গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ এবং তার দেশে ফেরার গুঞ্জন। সম্প্রতি এই গুঞ্জন নতুন মোড় নিয়েছে। বিশ্ব রাজনীতি ও কূটনীতির নানা সমীকরণ মাথায় রেখে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির আইনি মারপ্যাঁচ, এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকার কূটনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উত্তাপ নিয়ে এই বিশ্লেষণ।

১. ট্রাভেল পাস আবেদন ও নয়া কূটনৈতিক জল্পনা চলতি মাসেই নয়া দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাসপোর্ট কিংবা ট্রাভেল পাসের জন্য আবেদন করতে পারেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা—এমন তথ্য মিলেছে একাধিক কূটনৈতিক সূত্রে। তার আগের এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দুটি আন্তর্জাতিক এবং কয়েকটি ভারতীয় গণমাধ্যমে তার নতুন অডিও সাক্ষাৎকার প্রচারের কথা রয়েছে, যেখান থেকে তার স্বদেশ ফেরার ব্যাপারে আরও সুনির্দিষ্ট বার্তা আসতে পারে।

তবে প্রশ্ন হলো, তিনি যদি ট্রাভেল পাসের জন্য আবেদন করেন, তবে তা বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটি বড় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, গত অন্তর্বর্তীকালীন ও বর্তমান সরকারের আমলে তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করা হয়েছে। ফলে বৈধ ভ্রমণ নথির অভাব তার প্রত্যাবর্তনের প্রধান প্রশাসনিক বাধা। কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে, বিষয়টি নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের পাশাপাশি পশ্চিমা আরও দুটি দেশের প্রতিনিধি ও কূটনীতিকদের মধ্যে পর্দার আড়ালে আলোচনা চলছে।

বিশেষ করে গত তিন দিনে তিন দেশের (যুক্তরাজ্য, ভারত ও তুরস্কের কূটনৈতিক যোগাযোগ সংশ্লিষ্ট) শীর্ষ কূটনীতিকদের ঢাকা ত্যাগের বিষয়টি কূটনৈতিক পাড়ায় নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

২. ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি: আইনি মারপ্যাঁচ ও ভারতের অবস্থান বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে এর মধ্যেই একাধিকবার নোট ভার্বাল পাঠিয়েছে। ২০১৩ সালের বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তি (২০১৬ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী এই দাবি করা হলেও, আইনি ও প্রক্রিয়াগত দিকগুলো নিয়ে দিল্লি দীর্ঘসূত্রিতা বজায় রাখছে।

দ্বৈত অপরাধনীতি: চুক্তি অনুযায়ী যে অপরাধের জন্য প্রত্যর্পণ চাওয়া হচ্ছে, তা উভয় দেশের আইনে অপরাধ হতে হবে এবং ন্যূনতম এক বছরের কারাদণ্ডের বিধান থাকতে হবে।

রাজনৈতিক ও ন্যায়বিচারের ব্যতিক্রম:

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তির ৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী—অনুরোধপ্রাপ্ত রাষ্ট্র যদি মনে করে যে অভিযোগটি ন্যায্য বিচার বা সুবিচারের স্বার্থে সৎ উদ্দেশ্যে করা হয়নি, তবে তা প্রত্যাখ্যান করা যায়। এছাড়া ৬(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাজনৈতিক চরিত্রের অপরাধের ক্ষেত্রেও প্রত্যর্পণ না করার সুযোগ রয়েছে।

মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড:

ভারত আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আইসিসিপিআর (ICCPR)-এর স্বাক্ষরকারী দেশ। ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিরপেক্ষ বিচারালয় ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত না হলে বা আসামির নির্যাতন বা মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি থাকলে, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ভারত আন্তর্জাতিক বিধান ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের এখতিয়ার ব্যবহার করে হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানাতে পারে।

দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি প্রাথমিক আইনি পর্যালোচনার কথা বললেও, শেষ পর্যন্ত ১৯৬২ সালের ভারতীয় এক্সট্রাডিশন অ্যাক্টের ২৯ ধারা প্রয়োগ করে নির্বাহী পর্যায়ে এই ফাইল আটকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। অনানুষ্ঠানিকভাবে ভারত সরকার এর মধ্যেই নাকি জানিয়ে দিয়েছে যে, প্রত্যর্পণ নয়, বরং শেখ হাসিনার নিজ দায়িত্বে বা বিকল্প পন্থায় প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি তারা অন্য দৃষ্টিতে দেখছে।

৩. সরকারের কড়াকড়ি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা

ডিসেম্বর মাসকে কেন্দ্র করে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার ঘোষণার পর থেকেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য তৎপরতা ও সাংগঠনিক পুনরুত্থান ঠেকাতে বর্তমান সরকার ও প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

এরই অংশ হিসেবে দলটির সাথে যোগাযোগ রাখা এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন ও উস্কানিমূলক প্রচারণার অভিযোগে সম্প্রতি দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা—অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশানারা এবং অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেবাশিষকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। পরবর্তীতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তাদের আদালতে তোলা হলে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, ডিসেম্বরের সময়সীমা যত ঘনিয়ে আসবে, সরকার ও ক্ষমতাচ্যুত দলটির মধ্যকার এই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব তত তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।

৪. ভবিষ্যৎ দৃশ্যপট ও শেষকথা

শেখ হাসিনা যদি প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে নিজের ইচ্ছায় ট্রাভেল পাসের মাধ্যমে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে স্বদেশে ফিরতে চান, তবে তা যেমন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করবে, তেমনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন সমীকরণ তৈরি করবে। একদিকে বৈধ ভ্রমণ নথির জটিলতা এবং অন্যদিকে আইনি ও রাজনৈতিক সমঝোতার প্রশ্ন—সব মিলিয়ে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: