সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

আন্তর্জাতিক

ভোটের রাজনীতি ও বিশ্ববাজার: ট্রাম্পের রুশ ডিজেল চুক্তি: ভূরাজনীতির নতুন মোড়: এবং দ্বৈত নীতির বিতর্ক

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ৬:৪৯ পিএম
ভোটের রাজনীতি ও বিশ্ববাজার: ট্রাম্পের রুশ ডিজেল চুক্তি: ভূরাজনীতির নতুন মোড়: এবং দ্বৈত নীতির বিতর্ক

১. মূল প্রস্তাবনা ও চুক্তির পটভূমি

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির লাগামছাড়া দাম নিয়ন্ত্রণ এবং আসন্ন কংগ্রেস নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক যুগান্তকারী ও বিতর্কিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সফল আলোচনার পর ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাজারে বড় পরিসরে ডিজেল সরবরাহ করতে রাজি হয়েছে মস্কো। এই চুক্তির ফলে দীর্ঘমেয়াদী নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক বৈরিতার মাঝেও ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে জ্বালানি বাণিজ্যের একটি নতুন দুয়ার উন্মোচিত হলো।

২. চুক্তির রূপরেখা ও পর্যায়ক্রমিক সরবরাহ পরিকল্পনা

ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষণা অনুযায়ী, দুই নেতার মধ্যকার সমঝোতা অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ও ভবিষ্যৎ সরবরাহের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে:

• অবিলম্বে সরবরাহ: রাশিয়া প্রথম ধাপে অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে, যা প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল জ্বালানির সমতুল্য।

• নভেম্বর ও পরবর্তী ধাপ: আগামী নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন এবং পরবর্তীতে আরও ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। রাশিয়ার শোধনাগারগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এই পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

• নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ: ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার রাজস্ব আওয়ার কমানোর জন্য পূর্বে আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়। আগামী বছরের ৭ এপ্রিল পর্যন্ত রাশিয়ার ডিজেল আমদানির জন্য বিশেষ লাইসেন্সও জারি করা হয়েছে।

৩. মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নির্বাচনী সমীকরণ

আগামী ৩ নভেম্বর মার্কিন কংগ্রেস নির্বাচনকে সামনে রেখে জ্বালানির উচ্চমূল্য ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছিল। কৃষিকাজ, বাড়িঘর গরম রাখা এবং পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর কারণে মার্কিন অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ তীব্র আকার ধারণ করে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো আমেরিকান কৃষক, খামারমালিক ও ট্রাকচালকদের স্বস্তি দেওয়া এবং নির্বাচনের আগে জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল করা।

৪. নীতিগত দ্বৈত মানদণ্ড: ভারতের তেল আমদানি বনাম মার্কিন ডিজেল চুক্তি

রাশিয়ার সঙ্গে মার্কিন এই চুক্তি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ‘দ্বৈত নীতি’ বা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে:

• ভারতের ওপর চাপ ও শুল্কের হুমকি: এর আগে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার কারণে ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র তীব্র কূটনৈতিক চাপের মুখে ফেলেছিল এবং শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিল। এমনকি রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধের বিষয়ে ভারতের প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ টেনে মার্কিন প্রশাসন শুল্ক নীতিতে পরিবর্তন এনেছিল।

• যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব নীতি: অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের জ্বালানি সংকটের অজুহাতে ঠিকই পুতিনের কাছ থেকে ডিজেল আমদানিতে সায় দিয়েছে। যদিও দুই দেশের জ্বালানি আমদানির ধরন ও আইনি কাঠামো এক নয়, তবুও বৈশ্বিক রাজনীতিতে জাতীয় স্বার্থ এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রয়োগ নিয়ে বড় ধরনের নৈতিক ও কূটনৈতিক প্রশ্ন উঠেছে।

৫. ইউক্রেনের তীব্র প্রতিক্রিয়া ও মিত্রদের সমালোচনা

রাশিয়ার সঙ্গে মার্কিন এই সমঝোতাকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ইউক্রেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে শক্তিশালী মিত্রদের ‘দুর্বল সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, পুতিনকে কোনো ধরনের ছাড় বা উপহার দিলে বিশ্ববাজারে শান্তি ফিরে আসবে না, বরং এটি রাশিয়াকে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আরও অর্থ জোগান দেবে। এছাড়া মার্কিন রিপাবলিকান পার্টির প্রতিনিধি ডন বেকনের মতো আইনপ্রণেতারাও এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছেন যে, কোনো স্বৈরশাসককে পুরস্কৃত করা উচিত নয়।

৬. দীর্ঘমেয়াদী বাজার স্থিতিশীলতা ও বিশ্লেষকদের সংশয়

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাশিয়ার সঙ্গে সাময়িক এই চুক্তির ফলে ডিজেলের দাম দীর্ঘ সময় কম থাকবে এমন নিশ্চয়তা নেই। জ্বালানি গবেষক ররি জনস্টন এবং উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষক জিম মিচেলের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদী সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়, বরং এটি সংকুচিত বাজারে সামান্য কিছু বাড়তি উৎস যোগ করবে মাত্র। বিশেষ করে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির নিয়মিত রপ্তানি ক্ষমতাও প্রশ্নবিদ্ধ।

৭. উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিকল্প মার্কিন উদ্যোগ ডিজেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ট্রাম্প প্রশাসন কেবল রুশ আমদানির ওপর নির্ভর করছে না, বরং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতেও বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে:

• প্রেসিডেন্সিয়াল স্মারকলিপি: জ্বালানি উৎপাদনে বাধা সৃষ্টিকারী স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের পরিবেশগত বা আইনি বিধিনিষেধ পাশ কাটানোর জন্য নতুন নির্দেশনা জারি করা হচ্ছে।

• ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট (ডিপিএ) এর ব্যবহার: শীতল যুদ্ধের সময়কার এই আইন প্রয়োগ করে মার্কিন শোধনাগারগুলোর দক্ষতা ও পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা নতুন শোধনাগার তৈরির দীর্ঘসূত্রিতা এড়াতে সহায়তা করবে।

পুতিনের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ডিজেল চুক্তি একদিকে যেমন মার্কিন অভ্যন্তরীণ বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে জ্বালানির দাম ৫ শতাংশ কমিয়ে এনেছে, অন্যদিকে তা বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অবস্থানের ক্ষেত্রে এক বিশাল নৈতিক विरोধ তৈরি করেছে। নিজের দেশের অর্থনীতি ও নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে ওয়াশিংটন মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলেও, এই চুক্তি বিশ্ববাজারে কতটা দীর্ঘস্থায়ী স্বস্তি আনতে পারবে এবং ইউক্রেন সংকটে কী প্রভাব ফেলবে—তা সম্পূর্ণ নির্ভর করবে সরবরাহের বাস্তবায়ন ও আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতির ওপর।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: