শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

আন্তর্জাতিক

মধ্যবর্তী নির্বাচনের দৌড়ে ট্রাম্পের বড় ধস: রক্ষণশীলদের জরিপেই প্রকাশ্যে প্রশাসনের নজিরবিহীন দেউলিয়াপনা

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩:৫১ পিএম
মধ্যবর্তী নির্বাচনের দৌড়ে ট্রাম্পের বড় ধস: রক্ষণশীলদের জরিপেই প্রকাশ্যে প্রশাসনের নজিরবিহীন দেউলিয়াপনা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগামী গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র ১৭ দিন আগে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নজিরবিহীন ভূকম্পন সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা নিরপেক্ষ কোনো সংস্থা নয়, বরং রক্ষণশীল ধারার সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান 'আরএমজি রিসার্চ'-এর সর্বশেষ জনমত জরিপে উঠে এসেছে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় এক রেকর্ড ভাঙা পতনের চিত্র। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর সার্বিক নীতি ও অবস্থানের ওপর মার্কিন জনগণের তীব্র অনাস্থা এবং জোরালো অসন্তোষের এই হার বিগত যেকোনো সময়ের চেয়ে আশঙ্কাজনক রূপ ধারণ করেছে।

জরিপের সার্বিক চিত্র: পরিসংখ্যানের আয়নায় ট্রাম্পের অবস্থান

নেপোলিটান নিউজ সার্ভিসের জন্য গত ৫ থেকে ১৩ অক্টোবরের মধ্যে ২,০০০ জন নিবন্ধিত ভোটারের ওপর পরিচালিত এই অনলাইন জরিপটিতে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর উপাত্ত উঠে এসেছে:

• সর্বনিম্ন তীব্র সমর্থন (Strong Approval): ট্রাম্পের প্রতি ভোটারদের উগ্র বা জোরালো সমর্থনের হার কমে মাত্র ১৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা সংস্থাটির সূচক অনুযায়ী ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সর্বনিম্ন।

• সার্বিক কাজের মূল্যায়ন: প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর কাজের প্রতি মাত্র ৪১ শতাংশ উত্তরদাতা সমর্থন জানিয়েছেন। বিপরীতে, দেশের ৫৮ শতাংশ ভোটার তাঁর ওপর স্পষ্ট অনাস্থা প্রকাশ করেছেন।

• নিট সমর্থন সূচক (Net Approval Rating): সমর্থক ও বিরোধীদের ব্যবধানের ওপর ভিত্তি করে ট্রাম্পের নিট অ্যাপ্রুভাল রেটিং বর্তমানে দাঁড়াবে মাইনাস ১৭ (-১৭) পয়েন্টে। • তীব্র বিরোধিতা (Strong Disapproval): প্রেসিডেন্টের নীতির প্রতি অত্যন্ত জোরালো অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন দেশের ৪৬ শতাংশ ভোটার।

• মার্জিন অব এরর: এই জরিপের নমুনায় ভুলের সম্ভাব্য মাত্রা ছিল প্লাস বা মাইনাস ২.২ শতাংশ পয়েন্ট।

কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট আধিপত্যের আভাস ও 'ভোটহাব'-এর পূর্বাভাস মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, মার্কিন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু 'ক্যাপিটল হিল'-এর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা রিপাবলিকানদের জন্য ততই কঠিন হয়ে পড়ছে। নির্বাচনী বিশ্লেষণাত্মক পোর্টাল 'ভোটহাব' (VoteHub)-এর ১৫ অক্টোবরের পূর্বাভাস অনুযায়ী:

কক্ষ দল নিয়ন্ত্রণ দখলের সম্ভাবনা প্রতিনিধি পরিষদ (House of Reps) ডেমোক্র্যাট ৮৪% সিনেট (Senate) ডেমোক্র্যাট ৫৯%

এমনকি প্রেডিকশন মার্কেটগুলোতেও ডেমোক্র্যাটদের দুই কক্ষেই একক নিয়ন্ত্রণ (Unified Democratic Control) পাওয়ার সম্ভাবনা জোরালো দেখা যাচ্ছে। শীর্ষ আর্থিক বাজির ক্ষেত্র 'পলিমার্কেট' (Polymarket)-এ ডেমোক্র্যাটদের এই জয়ের সম্ভাবনা ৬৩ শতাংশ এবং 'কালশি' (Kalshi)-তে তা ৬২ শতাংশে লেনদেন হচ্ছে। যদিও বাজির বাজার সরাসরি চূড়ান্ত ভোট প্রকাশ করে না, তবে এটি বিনিয়োগকারী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সম্মিলিত আস্থার প্রতিফলন ঘটায়।

নির্বাচনী মাঠে ট্রাম্পের কৌশল ও দ্বিধাদ্বন্দ্বে রিপাবলিকানরা

জনপ্রিয়তায় ধস নামা এবং আগাম পূর্বাভাসগুলো নেতিবাচক হওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্প তাঁর সমর্থকদের চাঙা করতে কৌশলগত চাল চালছেন। সাম্প্রতিক নির্বাচনী সভাগুলোতে তিনি বারবার সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলছেন:

"ব্যালট পেপারে সরাসরি আমার নাম না থাকলেও আপনারা ধরে নিন এই নির্বাচনে আমি নিজেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি। রিপাবলিকান প্রার্থীদের জয়ী করা মানেই আমার এজেন্ডাকে জয়ী করা।"

তবে বাস্তবে এটি ট্রাম্পপন্থী প্রার্থীদের জন্য শাঁখের করাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে তাঁদের ট্রাম্পের অন্ধ সমর্থকদের (MAGA Base) ভোটকেন্দ্রে আনার জন্য ট্রাম্পের নাম ব্যবহার করতে হচ্ছে, অন্যদিকে ট্রাম্পের প্রতি সাধারণ ও দোদুল্যমান ভোটারদের তীব্র ক্ষোভের কারণে প্রার্থীরা মূলধারার ভোট হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন।

হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া ও ট্রাম্প শিবিরের দাবি তবে এই জরিপ ও নির্বাচনের সম্ভাব্য পূর্বাভাস নিয়ে মোটেও উদ্বিগ্ন নয় ট্রাম্প প্রশাসন। সব ধরণের নেতিবাচক জনমত ও পূর্বাভাস সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে হোয়াইট হাউস। হোয়াইট হাউসের অন্যতম মুখপাত্র ডেভিস ইঙ্গল নিউজউইককে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানান:

"প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর 'মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন' (MAGA) আন্দোলনের মাধ্যমে মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ও অভূতপূর্ব এক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছেন—এই সত্যটি কোনো জরিপ দিয়ে ঢাকা যাবে না। প্রেসিডেন্ট খুব ভালো করেই জানেন কীভাবে তাঁর দেশের মানুষের সাথে যুক্ত থাকতে হয়। রিপাবলিকানদের জন্য তিনি এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা, সেরা বার্তাবাহক এবং প্রেরণার উৎস। কংগ্রেসে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে তিনি সম্পূর্ণরূপে নিবেদিত।"

শেষ কথা: আগামী প্রহরে মার্কিন রাজনীতির হিসাব-নিকাশ রক্ষণশীলদের নিজস্ব জরিপেই ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার এই ঐতিহাসিক ধস মার্কিন রাজনীতিতে নতুন হিসাব-নিকাশের জন্ম দিয়েছে। আগামী ১৭ দিন পর ব্যালট বাক্সে এই জনমতের চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটে নাকি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত করিশমা আবারও সব পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করে রিপাবলিকানদের রক্ষা করে—এখন সেটাই দেখার বিষয়।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: