বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

আন্তর্জাতিক

ওয়াশিংটনের ক্ষমতার রদবদল থেকে হরমুজ প্রণালী: বাংলাদেশ-ইরান সম্পর্কের নতুন ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৫ নভেম্বর ২০২৬, ২:২১ পিএম
ওয়াশিংটনের ক্ষমতার রদবদল থেকে হরমুজ প্রণালী: বাংলাদেশ-ইরান সম্পর্কের নতুন ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন

১. ভূমিকা: মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ও বৈশ্বিক প্রভাব

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির নজিরবিহীন ভরাডুবি ঘটেছে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ (হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) এবং সেনেট—উভয়েরই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টির হাতে। মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষমতার রদবদল কেবল ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সুদূরপ্রসারী ভূরাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামো এবং মধ্যপ্রাচ্য নীতির ওপর। ট্রাম্পের কার্যকালের শেষ দুই বছরে এই ফলাফল তাকে একজন 'ল্যামডাক' বা দুর্বল প্রেসিডেন্টে পরিণত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২. মার্কিন ভোটারদের ক্ষোভ এবং ডাম্প প্রশাসনের নীতিগত বিপর্যয়

এবারের নির্বাচনে ডেমোক্রেটদের নিরঙ্কুশ জয়ের পেছনে মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের তীব্র অসন্তোষ। এক্সিট পোল ও ভোটার ডেটার তথ্য অনুযায়ী:

অর্থনৈতিক চাপ: প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটার জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতিকে তাদের ভোট দেওয়ার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার অর্থনৈতিক নীতিকে দায়ী করেছেন।

মধ্যপ্রাচ্য নীতি:

জনসাধারণের পূর্বানুমোদন ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা এবং পেট্রোলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানো নাগরিকদের ক্ষুব্ধ করে তোলে।

কঠোর অভিবাসন ও শুল্কনীতি:

ট্রাম্প প্রশাসনের অনমনীয় শুল্কনীতি এবং কঠোর অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলে।

৩. ক্ষমতার পালাবদলে ইরানের প্রতিক্রিয়া ও উল্লাস

মার্কিন কংগ্রেসে ট্রাম্পের দলের পরাজয়ে সবচেয়ে বেশি স্বস্তি ও উল্লাস প্রকাশ করেছে ইরান। দেশটির দক্ষিণ আফ্রিকার দূতাবাস ও সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্পকে ব্যঙ্গ করে বিভিন্ন পোস্ট দেওয়া হয়। ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিফাবসহ নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই ফলাফল ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে দুর্বল করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক যুদ্ধ চালানো হোয়াইট হাউসের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

৪. হরমুজ প্রণালীতে ইরানের বিশেষ ছাড় এবং ভারতের অবস্থান

মার্কিন নির্বাচনের ফলের পরপরই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম সংবেদনশীল জলপথ হরমুজ প্রণালী নিয়ে বড় ধরনের ঘোষণা দেয় ইরান। তেহরান জানিয়েছে, এখন থেকে চারটি দেশের পণ্যবাহী জাহাজ এই প্রণালী দিয়ে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে। দেশগুলো হলো—ভারত, চীন, ইরাক এবং কাতার।

ভারতের অন্তর্ভুক্তি:

মার্কিন ও ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভারতের ওষুধশিল্প ইরানের স্বাস্থ্য খাতের প্রধান স্তম্ভ হওয়ায় এবং জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী আমদানির প্রেক্ষাপটে ভারতীয় জাহাজগুলোকে এই বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে।

চীনের অন্তর্ভুক্তি:

বেইজিংয়ের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন সুনিশ্চিত করতে চীনা জাহাজগুলোকেও এই সুবিধার আওতায় রাখা হয়েছে।

৫. বাংলাদেশের জন্য তেহরানের বার্তা ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

ভারত ও চীন যখন হরমুজ প্রণালীতে বিশেষ ছাড় পেল, ঠিক সেই সময়ে ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত ড. জলিল রাহিম জাহানাবাদী এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন করতে হলে বাংলাদেশকে ইরানের নির্দিষ্ট নির্দেশনা ও তেহরানের সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় করতে হবে।

এই ভিন্ন নীতির পেছনে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছে:

অতিরিক্ত মার্কিন প্রীতি ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক অবস্থান:

ইরান যুদ্ধের পর থেকে বাংলাদেশের অতিরিক্ত মার্কিন প্রীতি তেহরান ভালোভাবে নেয়নি। বিশেষ করে, আমন্ত্রণ না থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের ‘মক্কা চুক্তি’তে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশকে ভালোভাবে দেখেনি ইরান।

জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকি:

বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানি তেলের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে, যা হরমুজ প্রণালী হয়ে দেশে আসে। এই রুটে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট, এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া, সার আমদানি বন্ধ হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত কৃষি ও প্রধান রপ্তানি খাত তথা তৈরি পোশাক শিল্প বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।

কূটনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তন: ইরানের এই শর্ত বা কড়াকড়ি মেনে চললে একদিকে যেমন ওয়াশিংটনের বিরাগভাজ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, অন্যদিকে হরমুজ পথ বন্ধ হলে জ্বালানি আমদানির জন্য ঢাকাকে শেষ পর্যন্ত দিল্লির ওপরই বেশি মাত্রায় নির্ভর করতে হতে পারে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন এক জটিল সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: