রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

রক্তাক্ত ১৫ আগস্ট: জাতির জনক ও তাঁর পরিবারের আত্মত্যাগ

লিখেছেন: ঈশ্বর ভট্টাচার্য, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ৫:৪৬ পিএম
রক্তাক্ত ১৫ আগস্ট: জাতির জনক ও তাঁর পরিবারের আত্মত্যাগ

বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে এমন একটি নাম আছে যা উচ্চারণের সাথে সাথে একটি মানচিত্র, একটি পতাকা, একটি জাতীয় সংগীত এবং একটি স্বাধীন সত্তার জন্ম হয়। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি নির্যাতিত জাতির বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসের ভাষা। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া খোকা মুজিব কৈশোর থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করার শিক্ষা নিয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ছয় দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান - প্রতিটি পর্বে তিনি বাঙালির অধিকার আদায়ের জন্য নিজের জীবনকে তুচ্ছ করেছেন। তাঁর জীবনের চৌদ্দটি বছর কেটেছে পাকিস্তানি কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তাঁর বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল আমাদের মুক্তির মহামন্ত্র - এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। সেই একটি ভাষণ একটি নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করেছিল। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁকে গ্রেফতার করার আগ মুহূর্তে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গেলেন। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ত্রিশ লক্ষ শহীদ আর দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে যে বাংলাদেশ তিনি আমাদের দিলেন, তা ছিল তাঁর আজীবন লালিত স্বপ্নের সোনার বাংলা। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ফিরে তিনি যখন বলেছিলেন, আমার জীবনের একমাত্র কামনা বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, তখন সমগ্র জাতি তাঁর মাঝে খুঁজে পেয়েছিল পিতার ছায়া। তাই তো তিনি হয়ে উঠলেন জাতির জনক।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বর - একটি বাড়ি, একটি ইতিহাস:

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটি কখনোই কেবল ইট-কাঠের একটি বাড়ি ছিল না। এটি ছিল বাঙালির দ্বিতীয় রাজধানী, স্বাধীনতার তীর্থভূমি। এই বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে লেগে আছে মুক্তিযুদ্ধের পরিকল্পনা, পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার শপথ আর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে নতুন করে গড়ার স্বপ্ন। এই বাড়ির ছোট্ট লনে বসেই বঙ্গবন্ধু দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতেন, কৃষক-শ্রমিকের কথা শুনতেন। এই বাড়ির দোতলার ছোট্ট ঘরটিতে থাকতেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, যিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর জীবনের প্রতিটি সংকটে তাঁর অবিচল ছায়া। তিনি কখনো সামনে আসেননি, কিন্তু পেছন থেকে পুরো পরিবার এবং রাজনৈতিক জীবনের সমস্ত ঝড় সামলেছেন পরম মমতায়।

এই বাড়িতেই বড় হয়েছেন শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল। শেখ কামাল ছিলেন ক্রীড়া ও সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রাণপুরুষ, মুক্তিযোদ্ধা, যিনি আবাহনী ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে আধুনিক ফুটবলের বীজ বপন করেছিলেন। শেখ জামাল ছিলেন সেনাবাহিনীর তরুণ অফিসার, দেশপ্রেমিক, মার্জিত রুচির মানুষ। আর ছোট্ট রাসেল, মাত্র দশ বছরের শিশু, যে তখন ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র, যার চোখে ছিল পৃথিবী দেখার অদম্য কৌতূহল। এই বাড়িতে থাকতেন বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, যিনি ছিলেন নিভৃতচারী ব্যবসায়ী, ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণি, যিনি যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা, এবং ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, যিনি ছিলেন মন্ত্রী ও বিশ্বস্ত সহচর। এই বাড়িটি ছিল ভালোবাসা, স্নেহ আর নির্ভরতার এক উষ্ণ আশ্রয়। কেউ কল্পনাও করেনি এই আশ্রয়ের মেঝেই একদিন রক্তের স্রোতে ভেসে যাবে।

১৫ আগস্টের কালরাত্রি - ঘাতকের বুলেট যেভাবে ইতিহাসকে থামাতে চেয়েছিল:

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ছিল শুক্রবার। ভোরের আলো তখনো ভালোভাবে ফোটেনি। ঢাকা শহর ঘুমিয়ে আছে। ঠিক তখনই সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী, উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তার নেতৃত্বে একদল সৈন্য ট্যাংক নিয়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ঘিরে ফেলে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কেবল একজন মানুষকে হত্যা করা নয়, একটি আদর্শকে, একটি জাতির ভবিষ্যৎকে হত্যা করা। প্রথমে তারা শেখ আবু নাসেরকে বাইরে থেকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর বাড়ির ভেতরে ঢুকে একে একে হত্যা করে শেখ কামালকে, যিনি নিচে নেমে এসে বলেছিলেন, আমি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল। তারপর শেখ জামালকে।

বঙ্গবন্ধু তখন দোতলায়। তিনি লুঙ্গি পরে পাঞ্জাবি গায়ে নিচে নেমে এসেছিলেন। ঘাতকদের দেখে তিনি নির্ভীক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোরা কী চাস? তোরা কী আমাকে হত্যা করতে চাস? তিনি ভেবেছিলেন হয়তো তাঁর সন্তানতুল্য সৈনিকরা তাঁর কথা শুনবে। কিন্তু তারা শোনেনি। সিঁড়িতেই তাঁকে ব্রাশফায়ারে ঝাঁঝরা করে দেয় কর্নেল ফারুক, রশিদ, বজলুল হুদা, নূরদের নেতৃত্বাধীন খুনি চক্র। সেই সিঁড়িতেই লুটিয়ে পড়ে বাংলার হিমালয়। এরপর উপরে গিয়ে তারা নৃশংসভাবে হত্যা করে বেগম মুজিবকে, যিনি স্বামীর লাশের কাছে যাওয়ার আকুতি জানাচ্ছিলেন। হত্যা করা হয় নববিবাহিত পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামালকে। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে ছোট্ট রাসেলের সাথে। মা-বাবা, ভাই-ভাবী সবার হত্যা দেখে ভয়ে কাঁপতে থাকা দশ বছরের শিশুটি কেঁদে কেঁদে বলছিল, আমি মায়ের কাছে যাবো। ঘাতকরা তাকেও রেহাই দেয়নি। মায়ের লাশের কাছে নিয়ে গিয়ে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করে ফুলের মতো শিশু রাসেলকে। একই রাতে ধানমন্ডিতে শেখ মণি ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি এবং মিন্টো রোডে আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়িতে তাঁর পরিবারের ১৩ জন সদস্যকে হত্যা করা হয়। সেদিন মোট ২৩টি তাজা প্রাণ ঝরে গিয়েছিল, যার মধ্যে রক্তের সম্পর্ক ছিল ১৮ জনের। কেবল বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

নিহত সকল শহীদ - যাঁদের রক্তে লেখা শোকগাঁথা:

এই হত্যাকাণ্ডকে কেবল বঙ্গবন্ধু হত্যা বললে ভুল হবে। এটি ছিল একটি পরিবার নিধনযজ্ঞ, একটি বংশকে সমূলে উৎপাটন করার বর্বর প্রচেষ্টা। আমাদের মনে রাখতে হবে প্রতিটি নাম। বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, যিনি ছিলেন বাঙালির মা, যিনি কারাগারে থাকা স্বামীর জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছেন, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় গৃহবন্দী থেকেও মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস যুগিয়েছেন। শহীদ শেখ কামাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্র, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, যিনি যুদ্ধকালীন মুজিব বাহিনীর প্রধান ছিলেন। তাঁর স্ত্রী সুলতানা কামাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া তারকা। শহীদ শেখ জামাল, স্যান্ডহার্স্ট থেকে প্রশিক্ষিত সেনা কর্মকর্তা, যিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। তাঁর স্ত্রী পারভীন জামাল রোজী।

আর শহীদ শেখ রাসেল, যার হত্যা পৃথিবীর ইতিহাসে সকল মানবতাকে স্তব্ধ করে দেয়। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ যেখানে শিশু হত্যাকে জঘন্যতম অপরাধ বলে, সেখানে একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতার দশ বছরের শিশুপুত্রকে হত্যা করা প্রমাণ করে খুনিরা কতটা পশুতে পরিণত হয়েছিল। এছাড়াও শহীদ হন বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, ভাগ্নে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মণি ও তাঁর স্ত্রী বেগম আরজু মণি, ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও তাঁর কন্যা বেবী, পুত্র আরিফ, নাতি সুকান্ত, ভাইয়ের ছেলে শহীদ সেরনিয়াবাত, এবং আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়িতে আশ্রিত কিশোর পটুসহ আরও অনেকে। প্রতিটি নাম একটি ইতিহাস, প্রতিটি মৃত্যু একটি নক্ষত্রের পতন।

বিশ্বনেতাদের চোখে বঙ্গবন্ধু:

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে শুধু বাংলাদেশ কাঁদেনি, কেঁদেছিল সমগ্র বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষ। তাঁর ব্যক্তিত্ব এতটাই বিশাল ছিল যে বিশ্বের বড় বড় রাষ্ট্রনায়করা তাঁর সামনে শ্রদ্ধায় মাথা নত করতেন।

কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুকে আলিঙ্গন করে বলেছিলেন, "I have not seen the Himalayas. But I have seen Sheikh Mujib. In personality and in courage, this man is the Himalayas. I have thus had the experience of witnessing the Himalayas." অর্থাৎ দিয়ে, আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্বে এবং সাহসে এই মানুষটি হিমালয়। এভাবেই আমি হিমালয় দর্শনের অভিজ্ঞতা লাভ করলাম। f26e

ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট একবার বলেছিলেন, শেখ মুজিবকে না দেখলে বোঝা যাবে না একজন মানুষ কিভাবে একটি জাতির মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, শেখ মুজিব ছিলেন এমন একজন নেতা যিনি জনগণের হৃদয়ে বাস করতেন। নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক উইলি ব্রান্ডট বলেছিলেন, মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করার মতো কিছু থাকলো না। যুগোস্লাভিয়ার নেতা মার্শাল টিটো বলেছিলেন, শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্ব একজন মহান রাষ্ট্রনায়ককে হারালো। এই উদ্ধৃতিগুলো প্রমাণ করে বঙ্গবন্ধু কেবল বাংলাদেশের ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর।

ইতিহাসের আড়ালে ষড়যন্ত্র - দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট:

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, এটি ছিল দীর্ঘদিনের ষড়যন্ত্রের ফল। ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের লেখা থেকে জানা যায়, স্বাধীনতার পর থেকেই একটি পরাজিত শক্তি এবং তাদের দেশীয় দোসররা বঙ্গবন্ধুর সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে খাদ্য সংকট, দুর্নীতি এবং কিছু সুবিধাবাদী আমলার কারণে প্রশাসনে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল, তাকে ব্যবহার করে একটি মহল সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করে। কর্নেল ফারুক, রশিদ, ডালিমদের মতো তরুণ অফিসার যারা মুক্তিযুদ্ধে তাদের কাঙ্ক্ষিত পদ-পদবী পায়নি বলে মনে করত, তাদের ক্ষোভকে কাজে লাগানো হয়।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট নিয়েও বহু গবেষণা হয়েছে। মার্কিন কূটনীতিকদের ডিক্লাসিফাইড নথি এবং সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে স্নায়ুযুদ্ধের সময় দক্ষিণ এশিয়ায় সোভিয়েত-ভারত ঘনিষ্ঠতা এবং বঙ্গবন্ধুর সমাজতান্ত্রিক ও জোট নিরপেক্ষ নীতিকে অনেক পশ্চিমা শক্তি ভালোভাবে নেয়নি। ক্রিস্টোফার হিচেন্স তাঁর বইতে হেনরি কিসিঞ্জারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যদিও সরাসরি বিদেশি সরকারের জড়িত থাকার অকাট্য প্রমাণ আজও বিতর্কিত, তবে এটি স্পষ্ট যে ১৫ আগস্টের পরপরই খুনি সরকারকে দ্রুত স্বীকৃতি দেওয়া এবং খুনিদের পুনর্বাসন করা প্রমাণ করে এই হত্যাকাণ্ড থেকে একটি আন্তর্জাতিক মহল সুবিধা নিতে চেয়েছিল। খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে গঠিত সরকার কর্তৃক ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে খুনিদের বিচার বন্ধ করে দেওয়া ছিল ইতিহাসের আরেকটি কলঙ্ক।

বিচারের দীর্ঘ পথ - ন্যায়বিচারের জন্য অপেক্ষা:

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার পেতে বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ২১ বছর। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার করা যাবে না মর্মে ইনডেমনিটি আইন জারি করে রাখা হয়েছিল। এটি ছিল সভ্য পৃথিবীর ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা যেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে খুনিদের রক্ষা করা হয়েছিল। খুনিরা বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি নিয়ে বিদেশে বিলাসী জীবনযাপন করেছে। আর জাতির জনকের আত্মা যেন বিচারের জন্য কাঁদছিল।

১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করে। শুরু হয় বিচার প্রক্রিয়া। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৮ সালে নিম্ন আদালত ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। উচ্চ আদালত এবং আপিল বিভাগেও সেই রায় বহাল থাকে। ২০১০ সালে পাঁচজন খুনির ফাঁসি কার্যকর করা হয়। পরবর্তীতে ২০২০ সালে আরেক খুনি ক্যাপ্টেন আব্দুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকর হয়। এখনো কয়েকজন খুনি বিদেশে পলাতক রয়েছে। এই বিচার শুধু একটি পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নয়, এটি বাংলাদেশের সংবিধান ও ন্যায়বোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। এটি প্রমাণ করে যে ইতিহাসের কলঙ্ক মোছা যায়, তবে সময় লাগে।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও আজকের বাংলাদেশ - কোথায় দাঁড়িয়ে আমরা:

বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছিলেন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলার। তাঁর রাজনীতির মূল মন্ত্র ছিল চারটি - জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি বাংলাদেশ যেখানে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসবাস করবে। তিনি বলতেন, বাংলার মাটিতে সাম্প্রদায়িকতার স্থান নেই।

আজ ২০২৬ সালের আগস্টে দাঁড়িয়ে যখন আমরা পেছনে তাকাই, তখন বুক ভারী হয়ে আসে। গত দুই মাসের ঘটনাপ্রবাহ আমাদের গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা, সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে হামলার খবর, জঙ্গিবাদের নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আভাস, বিচ্ছিন্ন বোমাবাজির ঘটনা এবং সর্বোপরি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় বঙ্গবন্ধু আজ বেঁচে থাকলে কতটা কষ্ট পেতেন। তিনি যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বীজ বপন করেছিলেন, সেই বীজকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা চলছে। তরুণ সমাজের মধ্যে বিভাজন, সোশাল মিডিয়ায় ঘৃণা ও গুজবের বিস্তার, দুঃশাসনের অভিযোগ - এসবই তাঁর সোনার বাংলার স্বপ্নের বিপরীত। এই বাংলাদেশের জন্য তো ত্রিশ লক্ষ মানুষ জীবন দেয়নি। এই বাংলাদেশের জন্য তো বঙ্গবন্ধু তাঁর পরিবারসহ জীবন উৎসর্গ করেননি। এই বাস্তবতা আমাদের প্রত্যেক বিবেকবান মানুষকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

যদি বঙ্গবন্ধু আজ বেঁচে থাকতেন:

ইতিহাসে যদি শব্দটির কোনো স্থান নেই, তবুও মানুষ কল্পনা করে। যদি ১৫ আগস্টের সেই কালরাত্রি না ঘটত, যদি বঙ্গবন্ধু আরও বিশ বছর বেঁচে থাকতেন, তাহলে আজকের বাংলাদেশ কেমন হতো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমাদের চোখে জল আসে, আবার বুকে আশাও জাগে।

যদি তিনি বেঁচে থাকতেন, তাহলে বাংলাদেশ আজ হয়তো দক্ষিণ এশিয়ার নয়, এশিয়ার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াত। তাঁর কৃষক-বান্ধব নীতি, তাঁর সমবায় আন্দোলন, তাঁর পররাষ্ট্রনীতিতে সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয় - এই নীতিগুলো বাংলাদেশকে অনেক আগেই অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দিত। তিনি বেঁচে থাকলে বাংলাদেশে কখনোই সামরিক শাসন আসতে পারত না, গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা কখনোই ব্যাহত হতো না। তিনি বেঁচে থাকলে আজকের মতো জঙ্গিবাদ, বোমাবাজি, সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিতে পারত না, কারণ তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িকতার বটবৃক্ষ। তাঁর শাসনে মেধা পাচার হতো না, বরং সারা বিশ্বের মেধাবীরা বাংলাদেশে আসত। তিনি হয়তো মালয়েশিয়ার মাহাথির বা সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ-এর অনেক আগেই বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতেন, কিন্তু পার্থক্য হলো তিনি উন্নয়ন করতেন গণতন্ত্র ও মানবিকতা দিয়ে, স্বৈরতন্ত্র দিয়ে নয়। আজ তিনি নেই বলেই আমরা পথ হারাই, আবার তাঁর আদর্শের আলোতেই আমরা পথ খুঁজে পাই।

অশ্রু, শপথ ও ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো:

উপসংহারে বলতে পারি, রক্তাক্ত ১৫ আগস্ট আমাদের শুধু কাঁদায় না, আমাদের শপথও করায়। এই প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে বারবার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। একটি মানুষ, যিনি একটি জাতিকে স্বাধীনতা দিলেন, তাঁকে এবং তাঁর নিষ্পাপ শিশুসহ পুরো পরিবারকে এভাবে হত্যা করা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এই হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে ঘৃণা কতটা ভয়ংকর হতে পারে, আর ভালোবাসা কতটা অবিনশ্বর। ঘাতকরা ভেবেছিল বুলেট দিয়ে ইতিহাস মুছে ফেলা যায়। তারা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আজ ৫০ বছর পরেও বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়, আর খুনিদের নাম উচ্চারিত হয় ঘৃণায়।

আজকের এই অস্থির সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন চারদিকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প, জঙ্গিবাদের উত্থান আর দুঃশাসনের অন্ধকার, তখন বঙ্গবন্ধুর আদর্শই আমাদের একমাত্র আলোকবর্তিকা। ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো মানে শুধু আদালতে খুনিদের বিচার নয়, ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো মানে প্রতিটি সাম্প্রদায়িক হামলার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, প্রতিটি বোমাবাজির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া, প্রতিটি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কলম ধরা। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা মানে কেবল অর্থনৈতিক উন্নতি নয়, সোনার বাংলা মানে এমন একটি দেশ যেখানে কোনো শিশুকে তার ধর্মের কারণে ভয় পেতে হবে না, যেখানে কোনো মায়ের কোল খালি হবে না জঙ্গিবাদের বোমায়। আসুন, এই ১৫ আগস্টে আমরা অশ্রুসিক্ত চোখে শপথ করি, আমরা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সকল শহীদের রক্তের ঋণ শোধ করব অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক: ঈশ্বর ভট্টাচার্য, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট