সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

অশ্রুসিক্ত ধানমন্ডি ৩২: অবুঝ রাসেলের শেষ বাইসাইকেল

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৫ এএম
অশ্রুসিক্ত ধানমন্ডি ৩২: অবুঝ রাসেলের শেষ বাইসাইকেল

“এই শুনছো, ছেলের কথা?” মেঝেতে আধো-আধো বোলে এক রাজপুত্রের আবদার ঝরে পড়ে— “বাবা, আমি তো বড় হয়ে গেছি! ট্রাইসাইকেল আর ভালো লাগে না। তুমি না বলেছিলে আমার জন্য একটা লাল বাইসাইকেল এনে দেবে?”

মা ফজিলাতুন্নেছা মৃদু হেসে স্বামীর দিকে তাকান, “শুনছো ছেলের বায়না? রাসেল এখন সত্যিকারের বাইসাইকেল চায়!” পিতা শেখ মুজিব অভয় দিয়ে বলেন, “আচ্ছা, কালই এনে দেব।”

অভিমানী কচি মুখটি যেন আরও একটু ভার হয়ে ওঠে, “তুমি তো সকাল হলেই ভুলে যাও বাবা! সারাদিন অফিসে কাজের পাহাড়, আংকেলদের ভিড়... দাঁড়াও, আমি পেন্সিল আর কাগজ নিয়ে আসছি। তোমাকে লিখে দিচ্ছি, যেন রহমান আংকেলকে বলতে একদম ভুলে না যাও!”

অমনি হো হো হাসির এক অফুরন্ত ঝর্ণাধারা আছড়ে পড়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের দোতলার সেই পরিচিত ঘরের চার দেয়ালে। শঙ্খশুভ্র বিছানার চাদরে স্যান্ডো গেঞ্জি আর চেক লুঙ্গি পরা বিশাল হৃদয়ের পিতা, আর আদুরে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে অবুঝ শিশু রাসেলের ফোকলা দাঁতের হাসি। পিতা এক মুহূর্ত ভেবে নেন, “কাল মুহিতকে একবার মনে করিয়ে দিতে হবে।”

মা পানের বাটাটা এগিয়ে নিতেই পিতা বলেন, “পাইপটা একটু এনে দাও তো।” ঝলসিত পাইপে আগুন জ্বালিয়ে দেশলাইয়ের কাঠিটা নেভাতে পিতার হাতের সেই চিরচেনা ঝাঁকুনি; কুন্ডলী পাকিয়ে শূন্যে ভেসে ওঠে সুবাসিত ধোঁয়া। মা গালে পুরে দেন এক খিলি পান। দীর্ঘ বছরের সুখ-দুঃখের রূপকথা যখন দুজনের চোখেমুখে ফুটে উঠছে, ঠিক তখনই অবুঝ রাসেলের চোখে নেমে আসে এক নিবিড়, ঘুমপরীদের রাজ্য।

বিকেল ঘনিলেই তো সেই চেনা সুর! ৩১ নম্বরের অপ্রশস্ত রাস্তা থেকে শাঁ করে ৩২ নম্বরে ঢুকে ধপাস করে আছড়ে পড়া। গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে আবার সাইকেলের প্যাডেলে চাপ! যেন স্বপ্নের ডানায় ভর দিয়ে লেকের পাড়ে উধাও হয়ে যাওয়া... লেকের পূর্বপ্রান্তের সেই সাদা দালানটিই তো তার দৌড়ের সীমানা।

ওদিকে বাড়ির বারান্দায় স্নেহের আকুলতায় দাঁড়িয়ে থাকেন উদ্বিগ্ন মা। সীমানা পেরিয়ে একটু দূরে গেলেই মায়ের সেই ব্যাকুল ডাক— আর সেই ডাকেই হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় রাসেলের!

ঘুম ভাঙতেই একি নীরবতা? বিছানায় মা নেই, কোথাও নেই প্রকাণ্ড ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকা বাবাও। চারপাশ জুড়ে কেবল 'দ্রিম-দ্রিম' বিকট গর্জন, বারুদের গন্ধ আর গোঙানি!

ত্রস্ত পায়ে, ভীতিবিহ্বল চোখে সামনে এগিয়ে যায় ছোট রাসেল। মেঝেময় ছড়ানো লাল রক্তের লালচে দাগ। চারপাশের বিভীষিকা, অজানা মানুষের কর্কশ চিৎকার আর পৈশাচিক কোলাহলে দিশেহারা হয়ে ছুটতে থাকে সে।

সিঁড়ির গোড়ায় যেতেই থমকে যায় পুতুলটি— রক্তের সাগরে নিথর হয়ে পড়ে আছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ পিতা!

বুকের ভেতর কান্নার পাহাড় জমে ওঠে। আকুল হয়ে ফুঁপিয়ে উঠে নিচে দৌড়ে গিয়ে পরিচিত মুহিত চাচাকে জাপটে ধরে কচি দু’টি হাত— “আমাকে ওরা মারবে না তো, চাচা?”

আচমকা এক হিংস্র, গোঁফওয়ালা ঘাতকের শক্ত হাত এসে টেনে ধরে তাকে। চোখ ফেটে কান্না আসলেও আতঙ্কে মুখ দিয়ে শব্দ ফোটে না। নিষ্পাপ চোখে করুন মিনতি ঝরে পড়ে— “আংকেল, আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাও না!”

“চল, তোকে তোর মায়ের কাছেই নিয়ে যাই...”— ঘাতকের চক্রান্তে মেশা ঠাট্টা। কচি মনে হঠাৎ চেপে বসা বিশ্বাসের ওপর ভর করে, মেরুন রঙের শার্ট আর হাফপ্যান্ট পরা ছোট্ট শিশুটি পা বাড়ায়। কিন্তু হায়! মায়ের কাছে যাওয়ার আকুল দহন পর মুহূর্তেই অঙ্গারে পরিণত হয়—যখন সে দেখে, মা-ও রক্তে ভেসে নিথর হয়ে পড়ে আছেন। এবার অশোরুধে কাঁপা কণ্ঠে অশ্রুসিক্ত মিনতি— “আমাকে হাসু আপার কাছে পাঠিয়ে দিন, প্লিজ!”

আপার কাছে পাঠানোর মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ওকে ঠেলে দেওয়া হয় অন্য একটি রক্তভেজা ঘরে। খুনরাঙা সেই পথে একে একে চোখ পড়ে—বাবা, মা, ভাই, চাচা... রক্তের সাগরে ভেসে থাকা সবার নিস্তব্ধ দেহ।

নরম তুলতুলে শরীরের অবুঝ শিশুটি থরথর করে কেঁপে ওঠে। দুই হাত জোড় করে আকুতি জানায়— “আংকেল, আমাকে মেরো না! আমাকে ছেড়ে দাও!”

কচি হৃদয়ও বুঝে যায়, এই পৃথিবীতে তাকে আর ভালোবাসার আঁচল দিয়ে কেউ মুখ মুছে দেবে না। মনে পড়ে যায় লাল বাইসাইকেল নিয়ে দেখা রঙিন স্বপ্নের কথা... মনে পড়ে যায় লেকের পাড়ে মায়ের দাঁড়িয়ে থাকা... সেলিম আংকেলের পিঠে চড়ে ‘ঘোড়া ঘোড়া’ খেলা...

সবস্মৃতি আর একবুক কষ্ট একসাথে এসে দুমড়ে-মুচড়ে দেয় এই ফুলের কলিটিকে। কচি মনে হাজার শ্রাবণের বেদনার ভার বহনের সেই বিরল সন্ধিক্ষণেই—একটি নির্মম, কাল বুলেটের আঘাত বিদীর্ণ করে দেয় তার নিস্কলুষ হৃদপিণ্ড!

ফিনকি দিয়ে ভেসে যায় এক লোহিত সাগরের শাখা নদী... দূর থেকে তখন ভোরের বাতাসে ভেসে আসছে আজানের পবিত্র ধ্বনি— “আসসালাতু খাইরুম মিনাম নাওম...”

জন্ম-জন্মান্তরের সমস্ত বাঁধন এক নিমেষেই হারিয়ে গেল ঘাতকদের পৈশাচিক উল্লাসে। দেবদূতের মতো দেখতে নিষ্পাপ শিশু রাসেল মুখথুবড়ে পড়ে রইল ৩২ নম্বর বাড়ির এক অন্ধকার কোণায়।

হৃদয় ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে কবির সেই চিরকালের ধিক্কার— “তুই তো গল্পের বই, খেলনা নিয়ে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন বয়সেতে ছিলি! তবুও পৃথিবী আজ এমন পিশাচি হলো শিশু রক্তপানে তার গ্লানি নেই? সর্বনাশী, আমার ধিক্কার নে! যত নামহীন শিশু যেখানেই ঝরে যায় আমি ক্ষমা চাই, আমি সভ্যতার নামে ক্ষমা চাই।”

পিতার কাঁধে লাফানো, হাসু আপার হাতে পরম স্নেহে ভাত খাওয়া, কিংবা চেনা মানুষদের আদরের দিনগুলো আজও স্তব্ধ হয়ে আছে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সেই লাল রক্তের স্মৃতিতে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: