সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

রেজিম চেঞ্জ ম্যানুয়াল: পর্দার আড়ালে ক্ষমতার পরিবর্তন: ভূ-রাজনীতি ও ৬ ধাপের বৈশ্বিক ব্লুপ্রিন্ট ।

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৮ এএম
রেজিম চেঞ্জ ম্যানুয়াল: পর্দার আড়ালে ক্ষমতার পরিবর্তন: ভূ-রাজনীতি ও ৬ ধাপের বৈশ্বিক ব্লুপ্রিন্ট ।

কোনো দেশের নির্বাচিত বা ক্ষমতাসীন সরকার ভেঙে দেওয়া বা ফেলে দেওয়া এখন আর কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এটি একটি সুনির্দিষ্ট ও কৌশলী পদ্ধতি যা ধাপে ধাপে কার্যকর করা হয়। সাম্প্রতিক চার বছরে ভারতের প্রতিবেশী অঞ্চলে এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অন্তত চারবার এই ফর্মুলার সফল প্রয়োগ দেখা গেছে। এই 'রেজিম চেঞ্জ ম্যানুয়াল'-এর ৬টি মূল ধাপ এবং এর বৈশ্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো।

১. সরকার পতনের ৬টি মূল ধাপ ধাপ ১: জনসন্তুষ্টি বা কোনো নির্দিষ্ট ইস্যুকে আঁকড়ে ধরা যেকোনো আন্দোলনের সূচনা হয় জনগণের প্রকৃত বা সাময়িক কোনো অসন্তোষকে কেন্দ্র করে। শ্রীলঙ্কা: খাদ্য ও জ্বালানি সংকট। বাংলাদেশ: সরকারি চাকরির কোটা সংস্কার আন্দোলন। নেপাল: সোশ্যাল মিডিয়া বা টিকটক নিষিদ্ধকরণ।

ধাপ ২: ছদ্মবেশী নেটওয়ার্ক ও অ্যালগরিদম ম্যানিপুলেশন আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে এনজিও , স্বাধীন পেজ, ইনস্টাগ্রাম কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং পূর্বপ্রস্তুতকৃত ছাত্র নেতাদের যুক্ত করা হয়। সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদম নিয়ন্ত্রণ করে এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়, যেন মনে হয় এই আন্দোলন শতভাগ স্বতঃস্ফূর্ত।

কি বলেছিলেন ইউনুস

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সরকার পতনের পর যুক্তরাষ্ট্রে ক্লিনটনের এক মঞ্চে ড. ইউনূস শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় উল্লেখ করেছিলেন যে, এটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ছিল এবং মানুষ এর মূল রূপকারদের চিনত না, যাতে কাউকে এককভাবে অভিযুক্ত করে আন্দোলন থামানো না যায়।

ধাপ ৩: রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর থেকে জনগণের আস্থা বিনষ্ট করা

জনগণকে বিশ্বাস করানো হয় যে, নির্বাচন ব্যবস্থা কারচুপিপূর্ণ এবং বিচারবিভাগ বিক্রি হয়ে গেছে। নির্বাচনে হেরে গেলেও সেই হারকে জালিয়াতির 'প্রমাণ' হিসেবে তুলে ধরা হয়।

ধাপ ৪: সরকারকে উভমুখী সংকটে ফেলা

ছাত্র, শিশু এবং নারীদের আন্দোলনের সামনের সারিতে নিয়ে আসা হয়। কোনো সংঘর্ষে কেউ আহত বা নিহত হলে তাদের 'ভিকটিম' বা 'শহীদ' হিসেবে তুলে ধরে জনরোষ চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় (যেমন: নেপালে ১৯ জন নিহত হওয়ার পরদিন পার্লামেন্টে অগ্নিসংযোগের ঘটনা)।

ধাপ ৫: প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতর ফাটল ধরানো

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আমলাতন্ত্র এবং বিশেষ করে সামরিক বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করা। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকায় শেখ হাসিনার দেশত্যাগের আগের রাতে সেনাপ্রধান স্পষ্ট জানান যে তাঁর সৈন্যরা সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালাবে না, যার ধারাবাহিকতায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে দেশ ছাড়তে হয়।

ধাপ ৬: রেজিম চেঞ্জ বা ক্ষমতা দখল

সর্বশেষ ধাপে কাঙ্ক্ষিত নতুন শাসনব্যবস্থা বা সামরিক সমর্থিত অন্তর্বর্তী কাঠামো বসানো হয়, যা নির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। ২. ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও ঐতিহাসিক পটভূমি

এই ধরনের রেজিম চেঞ্জের পেছনে বড় কোনো আন্তর্জাতিক পরাশক্তির হাত থাকে কি না—তা নিয়ে বহু আলোচনা রয়েছে।

ডোনাল্ড লু এবং পাকিস্তানের ঘটনাপঞ্জি : ২০২২ সালের ৭ মার্চ মার্কিন কূটনীতিক ডোনাল্ড লু পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের সাথে বৈঠক করেন। ফাঁস হওয়া ডিপ্লোম্যাটিক ক্যাবল অনুযায়ী, লু ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাস হলে সম্পর্কের উন্নতি হবে। এর এক মাসের মধ্যে ইমরান খান সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট : ২০২৪ সালের মে মাসে ডোনাল্ড লু ঢাকা সফর করেন। এর আড়াই মাসের মধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে প্রায় ২৯ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে।

ঐতিহাসিক ভিত্তি: এটি কোনো নিছক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়; ১৯৫৩ সালে ইরানের সরকার পতনে সিআইএ প্রত্যক্ষ ভূমিকার কথা আমেরিকা পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে। এছাড়া ২০০০ সালে সার্বিয়ার ছাত্র আন্দোলনেও মার্কিন অর্থায়নের প্রমাণ রয়েছে।

৩. বিশ্বজুড়ে বর্তমান পরিস্থিতি ও ভারতের অবস্থান বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই মডেলের অনুরূপ লক্ষণ দেখা যাচ্ছে: স্পেন: আবাসন সংকট নিয়ে তীব্র বিক্ষোভের মুখে সরকারকে আগাম নির্বাচন ডাকতে হয়েছে। ফ্রান্স: স্কুল শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমেছে এবং ৬,০০০-এর বেশি গ্রেপ্তার হয়েছে। ভারত: বিভিন্ন ইনস্টাগ্রাম পেজ ও সামাজিক মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার, ইভিএম (EVM) এবং দেশের প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের দাবি তোলা হচ্ছে।

বিশ্লেষণ: ভারতে বর্তমানে ধাপ ৩ (সিস্টেমের ওপর আস্থা হ্রাস) কার্যকর করার চেষ্টা চলছে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও এই বিতর্কগুলো আদালতে সমাধানযোগ্য, তবুও এই ধরনের পরিকল্পিত সামাজিক অসন্তোষ আগামী দিনগুলোতে আরো সহিংস রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শেষ কথা

গণতান্ত্রিক দেশে জনগণের ক্ষোভ বা প্রতিবাদ স্বাভাবিক ঘটনা হলেও, যখন একটি সুনির্দিষ্ট ৬-ধাপের প্যাটার্ন বিশ্বজুড়ে বারবার পুনরাবৃত্তি হয়, তখন তা সাধারণ আন্দোলন নাকি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির 'রেজিম চেঞ্জ ব্লুপ্রিন্ট'—তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: