সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

মতামত

বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় পতাকা নিয়ে প্রতারণা?

✍ লিখেছেন: নীহারিকা রায়, উন্নয়নকর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৪ এএম
বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় পতাকা নিয়ে প্রতারণা?

বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের হৃদয়ে স্বাধীনতা, আত্মপরিচয়, ত্যাগ এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ও নিজস্ব মানচিত্র অর্জনের স্মৃতি গভীরভাবে প্রোথিত। তাই কারও হাতে জাতীয় পতাকা কিংবা মুখে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও 'জয় বাংলা’র মতো শব্দ শুনলে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কখনো কখনো সেই আবেগ এতটাই প্রবল হয় যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অতীত কর্মকাণ্ড, বর্তমান আচরণ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যাচাই না করেই তাকে আপনজন কিংবা নিজ পক্ষের মানুষ বলে ধরে নেওয়া হয়।

প্রতারণার ফাঁদটি তৈরি হয় ঠিক এখানেই। কেউ বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করতে পারেন, জাতীয় পতাকা বহনে এগিয়ে আসতে পারেন, মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে পারেন, এমনকি ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা তুলে ধরতে পারেন—অথচ তার ব্যক্তিগত সততা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও কর্মের সঙ্গে এসব প্রতীকের কোনো মিল নাও থাকতে পারে। মানুষের বাহ্যিক পরিচয় বা ব্যবহৃত প্রতীক কখনো তার চরিত্রের কিংবা সততার নিশ্চয়তা দেয় না। আমাদের সমাজে ধর্মীয় পোশাক ও পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার দৃষ্টান্ত যেমন রয়েছে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু বা জাতীয় পতাকার আবেগকে পুঁজি করেও মানুষকে প্রতারিত করা সম্ভব।

অনেক বঙ্গবন্ধুপ্রেমী মানুষের মনে একটি সরলরৈখিক বিশ্বাস কাজ করে: “যে বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসে, সে নিশ্চয়ই স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ।” একইভাবে, কাঁধে বা মাথায় লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা জড়িয়ে কেউ রাজপথে নামলে তাকে স্বাধীন বাংলাদেশের সমর্থক এবং ১৯৭১ সালের পাকিস্তানপন্থীদের বিরোধী বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তব রাজনীতির সমীকরণে এই ধারণা সব সময় নির্ভুল নয়।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক আন্দোলন ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে বাংলাদেশের মানুষ এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভূমিকা, মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল হতে পারেন; আবার একই সাথে শাসকগোষ্ঠীর দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ভুল নীতি, অন্যায় আচরণ বা রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনার কঠোর বিরোধিতাও করতে পারেন। অতএব, কোনো রাজনৈতিক দলের সব কর্মকাণ্ড অন্ধভাবে সমর্থন করা আর বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করা এক কথা নয়। আবার বাহ্যিক প্রতীকের ব্যবহার কিংবা মুখের স্লোগান শুনে কারও রাজনৈতিক চরিত্র সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও নিরাপদ নয়।

অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেখা গেছে, আগে যারা বঙ্গবন্ধু, জাতীয় পতাকা কিংবা মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক ব্যবহার করতেন, তাদের অনেকের অবস্থানে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর প্রতি অবমাননা, জাতীয় পতাকার প্রতি অসম্মান এবং মুক্তিযুদ্ধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে চরম অশ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ প্রকাশ্যে এসেছে। এসব ঘটনা এই মৌলিক প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসে—বঙ্গবন্ধু, জাতীয় পতাকা, মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেমের আবেগকে নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।

এখানেই আমাদের নাগরিক সতর্কতার প্রয়োজন। কারও মুখে শেখানো স্লোগান, গায়ে পরা পোশাক, হাতের পতাকা কিংবা ব্যবহৃত রাজনৈতিক প্রতীক দেখে বিচার না করে—তাঁর কথা, কাজ, অতীত ভূমিকা ও বর্তমান অবস্থান সার্বিকভাবে বিবেচনা করা জরুরি। কারণ, প্রতীক মানুষের আবেগকে উদ্দীপিত করতে পারে, কিন্তু প্রতীক নিজে কোনো ব্যক্তির সততা বা দেশপ্রেমের সনদ হতে পারে না।

বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ প্রায়ই স্মরণ করিয়ে দেন যে, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক অবদান এবং কোনো রাজনৈতিক দলের নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তকে এক করে দেখা ঠিক নয়। নীতিগতভাবে এই পার্থক্য রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভূমিকার মূল্যায়ন এক বিষয়, আর একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোনো সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে আরেকটি বাস্তবতা স্পষ্ট করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় পতাকা, রাজনৈতিক দলগুলোর অতীত এবং দেশের সার্বিক উন্নয়ন-অভিজ্ঞতা কোনোটিই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তবু এগুলোকে ঢালাওভাবে একাকার করে ফেলাও যুক্তিসংগত নয়; ইতিহাসের প্রতিটি বিষয়কে তার নিজস্ব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও গতিধারায় বিচার করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় পতাকা ও 'জয় বাংলা'—এসব উপাদান বাংলাদেশের ইতিহাস এবং এ দেশের মানুষের আবেগের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। তাই এসব প্রতীক অতি সহজেই জনমানুষের বিশ্বাস ও অনুভবে গভীর প্রভাব ফেলে। তবে সেই অনুভূতি যেন রাজনৈতিক প্রতারণার সুযোগ বা হাতিয়ার না হয়ে ওঠে, সেজন্য আবেগের পাশাপাশি আমাদের বিচারবুদ্ধি ও প্রজ্ঞাকেও সক্রিয় রাখতে হবে। কেউ বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করলেই তিনি সৎ—এমনটা ভাবার কোনো সুযোগ নেই; কেউ জাতীয় পতাকা বহন করলেই তিনি চেতনার প্রকৃত ধারক—এমন নিশ্চয়তাও দেওয়া যায় না। আবার কেউ সরকারের ভুল নীতি বা অন্যায়ের বিরোধিতা করলেই তিনি দেশবিরোধী বা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী—এমন সিদ্ধান্তও সমানভাবে অগ্রহণযোগ্য। একটি সুস্থ ও গণতান্ত্রিক সমাজে কোনো ব্যক্তির পরিচিতি ও রাজনৈতিক অবস্থান মূল্যায়নের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি হওয়া উচিত তার কথা, কাজ, মূল্যবোধ, অতীত ইতিহাস এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা—কেবলমাত্র কোনো আবেগময় প্রতীক নয়।

লেখক: নীহারিকা রায়, উন্নয়নকর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: