শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

মতামত

একাকিত্ব আমাকে রাজা করেছে

✍ লিখেছেন: শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৭:৪৬ পিএম
একাকিত্ব আমাকে রাজা করেছে

একাকিত্ব—কী অদ্ভুত এক শব্দ! এর ভেতরে কত বৈচিত্র্য, কত উদারতা, কত গভীরতা! মানুষের চিৎকার নেই, প্রশ্ন নেই, উত্তর নেই। কোনো প্রত্যাশা নেই, কোনো অভিযোগ নেই। শুধু আমি, আমার নিঃশব্দ পৃথিবী, আর নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন।

আমি একা। কখনো কখনো নিঃশব্দে নিজের ভেতর ডুবে থাকি। অথচ মানুষ আমাকে নিয়ে ভাবে, আমাকে দেখে, আমাকে নিয়ে আলোচনা করে। তারা ভাবে, আমি কী বলব, কী চাইব, কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাব। অথচ আমার ভেতরে তখন অন্য এক পৃথিবী জেগে থাকে—যে পৃথিবীর খবর তাদের কেউ জানে না।

আমি ভাবি, মানুষের এই সম্পর্কগুলো আসলে কেমন?

যখন আমার হাতে ক্ষমতা থাকে, যখন আমার দেওয়ার সামর্থ্য থাকে, যখন আমার কাছ থেকে মানুষ কিছু পাওয়ার আশা করে, তখন আমি তাদের কাছে বড় আদরের মানুষ, বড় মহাজন, বড় সাহেব। আমার চারপাশে মানুষের ভিড় জমে। প্রশংসা আসে, ভালোবাসার অভিনয় আসে, কত রকমের মধুর কথা কানে বাজে!

কিন্তু যেদিন আমি ক্ষমতাহীন হব, যেদিন আমার দেওয়ার মতো কিছু থাকবে না, যেদিন আমি রাগে, দুঃখে কিংবা অসহায়তায় চোখের জল ফেলব—সেদিন সেই মানুষগুলোর অনেকেই দূরে সরে যাবে। তখন তারা আমাকে দেখে বলবে, ‘আহা, বেচারা! কত কষ্টে আছে!’

কী অদ্ভুত এই পৃথিবী! মানুষের দুর্বলতার সময় তার পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে দূর থেকে তার দুরবস্থা নিয়ে কথা বলতেই যেন অনেকে বেশি স্বচ্ছন্দ।

জীবনের একটা সময়ে এসে বুঝেছি, এই পৃথিবীতে নিজের বলে কাউকে পাওয়া সহজ নয়। বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আর এমন একজন জীবনসঙ্গী পাওয়া, যে আপনার সুখ-দুঃখ, সাফল্য-ব্যর্থতা, ক্ষমতা-অক্ষমতা—সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে আপনাকে ভালোবাসবে, সে তো পরম সৌভাগ্যের বিষয়।

আমি সেই সৌভাগ্য পেয়েছি। আমার জীবনে আছে আমার স্ত্রী, আমার ভালোবাসার মানুষ। এই পৃথিবীতে আমার কাছে তার ভালোবাসাই সবচেয়ে মূল্যবান আশ্রয়। জীবনের বাকি সময়টুকু আমি তার সঙ্গে কাটাতে চাই—নির্ভরতার বন্ধনে, ভালোবাসার গভীরতায়, জীবনের সমস্ত ক্লান্তি পেছনে ফেলে।

আর তাই আজ একাকিত্ব আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়।

আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো আমাকে সঙ্গ দেয়। তাদের পাতায় পাতায় জীবনের গল্প লেখা থাকে। ফুলের শোভা, শরতের নীল আকাশ, বাতাসের মৃদু স্পর্শ—সবকিছু আমার চোখে ধরা পড়ে, আমার হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়। প্রকৃতি আমাকে কোনো প্রশ্ন করে না, আমার কাছ থেকে কিছু প্রত্যাশা করে না, আমাকে ছোট করে না। সে শুধু তার সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।

অথচ মানুষের ভিড়ে থাকলে কত রকমের কথা শুনতে হয়!

কেউ বলে, ‘আপনাকে তো বয়স বোঝাই যায় না!’ কেউ বলে, ‘আপনাকে দেখে এত বয়স হয়েছে বলে মনে হয় না।’ কেউ প্রশংসা করে, কেউ মুগ্ধতার অভিনয় করে। এসব কথার ভিড়ে কখনো কখনো নিজের সত্যিকারের অস্তিত্বটাকেই হারিয়ে ফেলি। মনে হয়, আমি যেন অন্যের চোখে নিজেকে দেখতে শিখছি, নিজের চোখে নয়।

কিন্তু একাকিত্ব আমাকে সেই সুযোগ ফিরিয়ে দিয়েছে। এখানে আমাকে কারও প্রশংসা দিয়ে নিজের মূল্য নির্ধারণ করতে হয় না। কারও স্বীকৃতির জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। আমি যেমন, ঠিক তেমনভাবেই নিজের কাছে উপস্থিত থাকতে পারি।

আমি উপলব্ধি করেছি, মানুষ অনেক সময় নিজের স্বার্থের প্রয়োজনে অন্য মানুষের কাছে আসে। স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে সম্পর্কের উষ্ণতাও কমে যায়। অবশ্য সবাই এক নয়। পৃথিবীতে এখনো ভালো মানুষ আছে, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আছে, সত্যিকারের বন্ধুত্ব আছে। কিন্তু সেসব পাওয়া সহজ নয়। কিন্তু আমি সেই ভাগ্যবানদের একজন.

স্বার্থহীন ভালোবাসার সবচেয়ে গভীর আশ্রয় হতে পারে একজন প্রকৃত জীবনসঙ্গী—যে আপনার সাফল্যের জন্য নয়, আপনার সম্পদের জন্য নয়, আপনার ক্ষমতার জন্য নয়; আমার সমস্ত অস্তিত্বেরেই ভালোবাসে।

আমার জীবনে সেই মানুষটি আছে। আমার স্ত্রী, আমার ভালোবাসা।

তাই মানুষের ভিড় কমে গেলেও আমার জীবন শূন্য নয়। বরং একাকিত্বের নীরবতায় আমি আমার ভালোবাসাকে আরও গভীরভাবে অনুভব করি।

আমি একাকিত্বকে ভালোবাসি। কারণ একাকিত্ব আমাকে রাজা করেছে, আমাকে কবি করেছে, আমাকে প্রেমিক করেছে। আমার ভেতরে যে অনুভূতিগুলো মানুষের কোলাহলে চাপা পড়ে যায়, নিঃসঙ্গতার নীরবতায় সেগুলোই আবার জেগে ওঠে।

একাকিত্ব আমাকে শিখিয়েছে, সব মানুষকে ঘৃণা করতে নেই; কিন্তু সব মানুষকে নিজের হৃদয়ের ভেতরে জায়গা দিতেও নেই। যারা মুখে এক কথা বলে, অন্তরে আরেক কথা পোষণ করে; যারা সত্যকে আড়াল করে, অন্যের সম্মানকে ছোট করে, অন্যকে অপমান করে আনন্দ পায়—তাদের থেকে দূরে থাকাই ভালো।

কারণ সম্মান ভিক্ষা করে পাওয়ার বিষয় নয়। ভালোবাসা অভিনয় করে অর্জন করার বিষয় নয়। আর নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখারও প্রয়োজন নেই।

যারা আপনাকে অপমান করে, তাদের সামনে নিজেকে প্রমাণ করতে গিয়ে নিজের শান্তি নষ্ট করবেন না। যারা আপনার মূল্য বোঝে না, তাদের স্বীকৃতির জন্য নিজের জীবনকে ব্যস্ত করে তুলবেন না। নিজের সত্যকে ধারণ করুন, নিজের মর্যাদাকে রক্ষা করুন, নিজের ভালোবাসার উপলব্ধির কাছে ফিরে যান।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ হয়তো আর বড় কোনো স্বীকৃতি চায় না। চায় একটু শান্তি, একটু ভালোবাসা, কিছু সত্যিকারের মুহূর্ত। চায় এমন একটি পৃথিবী, যেখানে নিজের মতো করে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়।

আমার কাছে সেই পৃথিবীর নাম একাকিত্ব।

এই একাকিত্ব আমার ভেতরের সত্যকে জাগিয়ে তোলে। আমার অনুভূতিকে গভীর করে, আমার চিন্তাকে মুক্ত করে, আমার ভালোবাসাকে নির্মল করে। এখানে আমি কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নই, কারও অধীন নই, কারও প্রশংসার প্রত্যাশী নই। আমি শুধু আমি।

আমি আমার গাছগুলোর সঙ্গে কথা বলি, ফুলের দিকে তাকিয়ে থাকি, শরতের আকাশ দেখি, নিজের অতীতকে ফিরে দেখি। কখনো স্মৃতি আমাকে কাঁদায়, কখনো ভালোবাসা আমাকে হাসায়, কখনো ভবিষ্যতের ভাবনা আমাকে নীরব করে দেয়। তবু এই নীরবতার মধ্যেই আমি জীবনের এক অনন্য আনন্দ খুঁজে পাই।

একাকিত্ব মানে পৃথিবী থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। একাকিত্ব মানে নিজের কাছে ফিরে আসা।

মানুষের ভিড় থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনকে নতুন করে চিনে নেওয়া। কে সত্যিকারের আপন, কোন ভালোবাসা সত্য, কোন সম্পর্ক কেবল স্বার্থের—তা উপলব্ধি করা।

আজ আমি জানি, আমার সুখের জন্য পৃথিবীর সবার প্রয়োজন নেই। আমার প্রয়োজন প্রকৃতির একটু সবুজ, আকাশের এক টুকরো নীল, হৃদয়ের কিছু সত্য অনুভূতি, আর আমার প্রিয়তম মানুষের ভালোবাসা।

এইটুকু নিয়েই আমি পরিপূর্ণ।

একাকিত্ব আমাকে নিঃস্ব করেনি; বরং আমার ভেতরের ঐশ্বর্যকে চিনিয়েছে। আমাকে শিখিয়েছে, নিজের সঙ্গে শান্তিতে থাকতে পারাটাও এক বিরাট একাকিত্ব আমাকে রাজা করেছে, কবি করেছে, প্রেমিক করেছে—আর সবচেয়ে বড় কথা, একাকিত্ব আমাকে আমার নিজের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে।

লেখক: শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: