শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

মতামত

শেখ রাসেল: এক রক্তাক্ত ইতিহাসের নাম:

✍ লিখেছেন: ঈশ্বর ভট্টাচার্য, কবি, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩:৫৩ পিএম
শেখ রাসেল: এক রক্তাক্ত ইতিহাসের নাম:

বাঙালি ইতিহাসের মহাকাব্যে একটি অধ্যায় চিরকালের জন্য থমকে গেছে রক্তের কালিতে, যেখানে মিশে আছে এক নিষ্পাপ শিশুর আকুতি এবং এক নির্মম পৈশাচিকতার উপাখ্যান। সে অধ্যায়ের নাম শেখ রাসেল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের কনিষ্ঠ পুত্র। ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িতে যখন তিনি প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেন, তখন বাংলার রাজনৈতিক আকাশ ছিল আন্দোলন আর সংগ্রামে উত্তাল। ঠিক তার প্রায় এগারো বছরের মাথায়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাত্রে সেই ৩২ নম্বরের গৃহকোণেই নিভে যায় এই ছোট্ট প্রদীপের আলো।

ইতিহাসের পাতায় তিনি কেবল একটি নাম নন, বরং তিনি একটি গভীর ক্ষত, এক অপূরণীয় শূন্যতা এবং মানবিক বেদনার এক চিরন্তন প্রতীক। গতকাল ছিল এই অমর শিশুর জন্মদিন, যা প্রতি বছর আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক অপরিসীম ভালোবাসার গল্প এবং এক নির্মম ট্র্যাজেডির ইতিহাস।

রাসেলের জন্মের সময়টি ছিল বাঙালি জাতির এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণ। আইয়ুব খানের স্বৈরশাসন, ছয় দফার আন্দোলন এবং স্বাধিকারের দাবিতে বাংলার মানুষ তখন জেগে উঠছে। বঙ্গবন্ধু তখন রাজপথের আপসহীন নেতা, যার জীবনের সিংহভাগই কেটেছে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। এমন এক সময়ে রাসেলের জন্ম ধানমন্ডির সেই সাধারণ বাড়িটিতে এক পশলা আনন্দের বৃষ্টি নিয়ে এসেছিল। বড় বোন শেখ হাসিনার বর্ণনায় জানা যায়, রাসেলের জন্মের পর পুরো পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তখন বিখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের অনুরাগী ছিলেন। তাঁর যুদ্ধবিরোধী দর্শন এবং শান্তির বার্তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই তিনি নিজের কনিষ্ঠ পুত্রের নাম রেখেছিলেন রাসেল। কে জানত, শান্তির দূতের নামে নাম রাখা এই শিশুটিকেই একদিন পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে অশান্ত ও পাশবিক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হবে।

রাসেলের শৈশব আর দশটা সাধারণ শিশুর মতো ছিল না। তিনি যখন আধো-আধো বোলে কথা বলতে শিখেছেন, তখন থেকেই বাবাকে দেখেছেন বন্দি অবস্থায়। কারাগারের রোজনামচায় বঙ্গবন্ধু নিজেই লিখেছেন তাঁর এই ছোট্ট ছেলেটির কথা। রাসেল যখন কারাগারে বাবার সঙ্গে দেখা করতে যেত, তখন সে বাবাকে সহজে ছাড়তে চাইত না। বাবাকে দেখতে না পেয়ে সে নিজের মাকেই 'আব্বা' বলে ডাকতে শুরু করেছিল। এই ঘটনাটি যেমন একদিকে চরম আবেগঘন, তেমনই তা ফুটিয়ে তোলে এক অবোধ শিশুর পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হওয়ার নির্মম বাস্তবতা। রাসেল ভাবত, কারাগার বুঝি তাঁর বাবারই বাড়ি। সেখানে যখন দেখা শেষ করে চলে আসার সময় হতো, রাসেলের সেই কান্নাভেজা চোখ আর নিষ্পাপ আকুতি বঙ্গবন্ধুর হৃদয়কে কতটা ব্যথিত করত, তা তাঁর ডায়েরির পাতায় পাতায় স্পষ্ট হয়ে আছে।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ— এই দুটি বড় ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়েই রাসেলের বেড়ে ওঠা। একাত্তরের পঁচিশে মার্চের কালরাতে যখন বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানি সেনারা গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়, তখন রাসেলের বয়স মাত্র সাত বছর। সেই অবরুদ্ধ সময়ে মা এবং বোনদের সঙ্গে ধানমন্ডির আরেকটি বাড়িতে বন্দি জীবন কাটাতে হয়েছিল এই ছোট্ট শিশুকে। চারদিকে তখন গুলির শব্দ, মানুষের আর্তনাদ আর যুদ্ধের ভয়াবহতা। এই ছোট বয়সেই রাসেলের মনে যুদ্ধের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়েছিল। তিনি খেলনা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন বন্দুক কিংবা যুদ্ধের সরঞ্জাম। তাঁর খেলার সঙ্গী ছিল পাড়ার সাধারণ শিশুরা, যাদের তিনি কাঠের তৈরি বন্দুক নিয়ে কুচকাওয়াজ শেখাতেন। এই প্রাণচঞ্চলতা এবং দেশের মানুষের প্রতি এক সহজাত টান তাঁর রক্তের মধ্যেই ছিল, যা তিনি পেয়েছিলেন তাঁর মহান পিতার কাছ থেকে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বীরের বেশে বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তখন রাসেলের আনন্দের সীমা ছিল না। তিনি তাঁর বাবাকে ফিরে পেয়েছিলেন এক মুক্ত স্বাধীন দেশে। কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক বাবার ব্যস্ততার কারণে রাসেল সবসময় বাবাকে কাছে পেতেন না। তাই তিনি বাবার কাছাকাছি থাকার জন্য প্রায়ই সচিবালয়ে বা গণভবনে চলে যেতেন। সেখানে তাঁর মার্জিত আচরণ, মিষ্টি হাসি আর প্রখর বুদ্ধিমত্তা সবাইকে মুগ্ধ করত। রাসেল ছিলেন অত্যন্ত সাইকেলপ্রেমী। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের চারপাশের রাস্তায় তাঁর সাইকেল চালিয়ে ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য আজও অনেকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। তিনি যেমন ছিলেন বাড়ির সবার আদরের, তেমনই ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী। গৃহশিক্ষকের কাছে পড়ার সময় তাঁর আচরণ ছিল এক আদর্শ ছাত্রের মতো। বাড়ির কর্মচারীদের প্রতিও তাঁর ছিল গভীর সহানুভূতি। নিজের খাবার ভাগ করে খাওয়া কিংবা বন্ধুদের উপহার দেওয়ার মাঝে তাঁর সুন্দর ও পরোপকারী ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটত।

ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক সাহিত্যে শেখ রাসেল কেবল একটি হারিয়ে যাওয়া শিশুর প্রতিমূর্তি নন, বরং স্বৈরাচার এবং নির্মমতার বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ ও চিরন্তন ক্ষতের প্রতীক। দেশ-বিদেশের বরেণ্য সাহিত্যিক ও রাজনীতিকদের লেখনীতে রাসেলকে নিয়ে যে হাহাকার ও স্মৃতিকথা ফুটে উঠেছে, তা ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ এবং প্রাণবন্ত করেছে। কোনো কৃত্রিম অলঙ্কার বা অতিরঞ্জন ছাড়া, বস্তুনিষ্ঠ দলিলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই স্মৃতির পরিচ্ছেদগুলো রাসেলের জীবনকে ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী আসন দিয়েছে। রাসেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি স্কুলে পড়তেন। তিনি তখন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। স্কুলের শিক্ষকরা এবং সহপাঠীরা রাসেলের মাঝে কখনো কোনো অহংকার বা ঔদ্ধত্য দেখেননি। রাষ্ট্রপতির ছেলে হওয়া সত্ত্বেও তিনি সাধারণ পোশাকে, সাধারণভাবেই সবার সাথে মিশতেন। তাঁর ডায়েরি বা খাতায় আঁকা ছবিগুলোতে ফুটে উঠত এক শান্ত, সবুজ এবং ভালোবাসাময় বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। তিনি স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হবেন, হয়তো বাবার মতোই দেশের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করবেন, কিংবা বিজ্ঞান ও দর্শনের আলোয় বিশ্বকে আলোকিত করবেন। কিন্তু নিয়তির এক ভয়ানক চক্রান্ত তাঁর সেই সব রঙিন স্বপ্নকে এক মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ করে দেয়।

পারিবারিক এবং রাজনৈতিক স্মৃতিকথার দিক থেকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিলটি এসেছে রাসেলের বড় বোন শেখ হাসিনার লেখনী থেকে। তিনি তাঁর স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ 'আমাদের ছোট রাসেল সোনা' বইটিতে রাসেলের জন্ম থেকে শুরু করে তাঁর বেড়ে ওঠার প্রতিটি মুহূর্ত এবং তাঁর নির্মম বিদায়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ অত্যন্ত সহজ অথচ হৃদয়বিদারক ভাষায় লিপিবদ্ধ করেছেন। শেখ হাসিনা লিখেছেন যে, রাসেল যখন জন্মগ্রহণ করেছিল তখন বাড়িটি আনন্দে মুখরিত হয়ে উঠেছিল, কিন্তু সেই আনন্দ যে মাত্র দশ বছরের জন্য স্থায়ী হবে তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। তিনি তাঁর লেখায় বারবার ফুটিয়ে তুলেছেন কীভাবে কারাগারের রোজনামচায় বঙ্গবন্ধু তাঁর এই কনিষ্ঠ পুত্রের জন্য ব্যাকুল থাকতেন। বাবার জন্য রাসেলের সেই আকুতি এবং পরবর্তীতে ঘাতকদের সামনে মায়ের কাছে যাওয়ার শেষ আকুতিকে তিনি বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

রাজনীতিবিদ ও সমকালীন ইতিহাসবিদদের পর্যালোচনায় দেখা যায়, শেখ রাসেলকে হত্যার ঘটনাটি ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের অংশ। দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ বিভিন্ন সময়ে লিখেছেন যে, এই হত্যাকাণ্ডটি কোনো আকস্মিক সেনা বিদ্রোহ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ। রাসেলের মতো ১০ বছরের একটি শিশুকে হত্যা করার পেছনে ঘাতকদের মনস্তত্ত্ব ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট— তারা বঙ্গবন্ধুর রক্তের কোনো চিহ্ন এই স্বাধীন বাংলাদেশে রাখতে চায়নি। বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিলে সমকালীন রাজনৈতিক নেতাদের ভাষ্য থেকে জানা যায়, রাসেলের এই নির্মম বিদায় তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতিতেও এক গভীর শোক ও নিন্দার ঝড় তুলেছিল, কারণ একটি নিরপরাধ শিশুকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার লোভে হত্যা করার মতো কলঙ্কিত অধ্যায় আধুনিক সভ্যতায় বিরল।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই অভিশপ্ত ভোর। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কময় এবং অন্ধকার দিন। কিছু কুচক্রী ও ঘাতক সেনা সদস্য ট্যাংক আর ভারী অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের সেই ঐতিহাসিক বাড়িতে। ভোরের শান্ত পরিবেশ ধরণী কাঁপানো গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। একের পর এক বুলেটের আঘাতে লুটিয়ে পড়েন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা, শেখ কামাল, শেখ জামালসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। সেই রক্তগঙ্গার মাঝে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছিল ১০ বছরের অবোধ শিশু রাসেল। চারপাশে তখন কেবল রক্তের স্রোত আর প্রিয়জনদের নিথর দেহ। রাসেলকে যখন ঘাতকরা ধরে নিচে নিয়ে আসছিল, তখন তিনি ভয়ে কাতর হয়ে কেঁদে উঠেছিলেন।

ইতিহাসের সবচেয়ে বুকফাটা আকুতি সেদিন প্রতিধ্বনিত হয়েছিল সেই বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে। রাসেল ঘাতকদের হাত ধরে মিনতি করেছিলেন, "আমি মায়ের কাছে যাব।" ঘাতকরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ছলে ওপরে নিয়ে যায়, যেখানে তাঁর মায়ের রক্তাক্ত মৃতদেহ পড়ে ছিল। রাসেল তাঁর মায়ের নিথর দেহ দেখে ডুকরে কেঁদে উঠে বলেছিলেন, "আমাকে আমার হাসু আপার কাছে পাঠিয়ে দিন।" কিন্তু রক্তপিপাসু নরপিশাচদের হৃদয়ে সেই করুণ আকুতি বিন্দুমাত্র দয়া বা মানবিকতার উদ্রেক করতে পারেনি। তারা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায়, সুপরিকল্পিতভাবে এই নিষ্পাপ শিশুটির বুকেও গুলি চালায়। বুলেটের আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় রাসেলের মাথা এবং তাঁর নিষ্পাপ দেহটি লুটিয়ে পড়ে তাঁর প্রিয় মা ও বাবার রক্তের সাগরে। একটি সম্ভাবনাময় কুঁড়ি ফোটার আগেই ঝরে যায় একদল পশুর বুলেটের আঘাতে।

রাসেলকে নিয়ে সাহিত্যজগতের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী এবং নির্ভুল সৃষ্টিগুলোর একটি হলো ওপার বাংলার প্রখ্যাত কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'শিশুরক্ত' কবিতাটি। এই কবিতায় কবি অত্যন্ত তীব্র ভাষায় রাসেলের নিষ্পাপ শৈশব এবং তার ওপর নেমে আসা নির্মম পাশবিকতার নিন্দা জানিয়েছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর লেখনীর মাধ্যমে এই অবোধ শিশুর হত্যার গ্লানিকে পুরো মানবজাতির বিবেককে দংশনকারী এক ঘটনা হিসেবে তুলে ধরেছেন। হুবহু উদ্ধৃতি দিলে বাষ্পরুদ্ধ সেই ক্ষোভ ও বেদনার ভাষাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

"রাসেল, অবোধ শিশু, তোর জন্য আমিও কেঁদেছি খোকা, তোর মরহুম পিতার নামে যারা একদিন তুলেছিল আকাশ ফাটানো জয়ধ্বনি তারাই দুদিন বাদে থুতু দেয়, আগুন ছড়ায়— বয়স্করা এমনই উন্মাদ! তুই তো গল্পের বই, খেলনা নিয়ে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন বয়সে ছিলি! তবুও পৃথিবী আজ এমন পিশাচী হলো শিশুরক্তপানে গ্লানি নেই? সর্বনাশী, আমার ধিক্কার নে!"

শেখ রাসেলের এই হত্যাকাণ্ড কেবল একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ছিল না, এটি ছিল চরমতম মানবতাবিরোধী অপরাধ। পৃথিবীর কোনো যুদ্ধনীতি বা রাজনৈতিক আদর্শে একটি নিরপরাধ শিশুকে এভাবে হত্যার কোনো নজির খুঁজে পাওয়া মেলা ভার। ঘাতকদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকারকে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা, যাতে ভবিষ্যতে এই বাংলায় আর কোনো দিন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। কিন্তু তারা জানত না যে, রক্ত দিয়ে কখনো আদর্শকে মুছে ফেলা যায় না। রাসেলকে হত্যা করে তারা তাঁর শরীরকে নশ্বর পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছে সত্যি, কিন্তু বাংলার কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে রাসেলকে করে তুলেছে অমর ও চিরঞ্জীব।

আজকের বাংলাদেশে শেখ রাসেল এক অনুপ্রেরণার নাম, এক গভীর বেদনার প্রতীক। প্রতি বছর যখন ১৮ অক্টোবর আসে, তখন বাংলার আকাশ-বাতাস যেন রাসেলের সেই করুণ আকুতিতে ভারী হয়ে ওঠে। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো আজ একজন মহান রাষ্ট্রনায়ক, একজন বিজ্ঞানী কিংবা একজন মানবতাবাদী দার্শনিক হিসেবে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করতেন। ঘাতকের বুলেট কেবল একটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে বাংলাদেশের একটি সোনালী ভবিষ্যৎ। বড় বোন শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা, যাঁরা সেই রাতে প্রবাসে থাকার কারণে অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন, তাঁদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে রাসেলের স্মৃতি এক চিরন্তন ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে। সেই গভীর ক্ষত বুকে নিয়েই তাঁরা আজ বাংলার প্রতিটি শিশুকে রাসেলের মতো নিরাপদ ও সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়ার জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন।

শেখ রাসেল আজ বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর অধিকারের প্রতীক, শান্তিময় শৈশবের এক আকুল আহ্বান। পৃথিবীর বুক থেকে যেন আর কোনো শিশুকে এভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে না হয়, আর কোনো মায়ের কোল যেন এভাবে খালি না হয়, সেই বার্তাই দিয়ে যায় রাসেলের সংক্ষিপ্ত জীবন। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের সেই রক্তভেজা সিঁড়ি আর রাসেলের সাইকেলটি আজ ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। রাসেল আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তিনি আছেন শরতের কাশফুলে, হেমন্তের নতুন ফসলের গন্ধে, আর বাংলার প্রতিটি নিষ্পাপ শিশুর হাসির মাঝে। বাঙালি জাতি যত দিন বেঁচে থাকবে, তত দিন গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর অশ্রুসিক্ত নয়নে স্মরণ করবে তাদের এই ছোট্ট রাজপুত্রকে। রাসেল মরেও অমর, তিনি আমাদের হৃদয়ের ক্যানভাসে এক চির অম্লান ধ্রুবতারা।

লেখক: ঈশ্বর ভট্টাচার্য, কবি, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: