রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

রাজনৈতিক আস্থা ও বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির অনুপস্থিতি একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকট,আইআরআই-এর বাংলাদেশ উদ্যোগের একটি বিশ্লেষণাত্মক পর্যালোচনা

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন প্রকাশিত: ১০ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪২ এএম
রাজনৈতিক আস্থা ও বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির অনুপস্থিতি একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকট,আইআরআই-এর বাংলাদেশ উদ্যোগের একটি বিশ্লেষণাত্মক পর্যালোচনা

বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থায়িত্ব, সর্বজনীন রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা নিয়ে দেশি-বিদেশি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উদ্বেগের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) প্রতিনিধিদলের পৃথক দুটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সকালে গুলশানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এবং দুপুরে মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এই সংলাপে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা অংশ নেন। ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত এই বৈঠকগুলোতে মূল গুরুত্ব পেয়েছে গণতান্ত্রিক অগ্রগতিকে সুসংহত ও টেকসই করা, প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং জনগণের অবাধ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ। আইআরআই-এর মতো ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থাসমূহের এ ধরনের বহুমাত্রিক সংলাপ পরিচালনা নির্দেশ করে যে, পশ্চিমা বিশ্বের উন্নয়ন অংশীদাররা বাংলাদেশে একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভর না করে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে আগ্রহী।

তবে এই কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলোর নেপথ্যে বিদ্যমান একটি গভীর সংকট ও সম্ভাব্য উত্তরণের পথকে বিশ্লেষণ করা জরুরি। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির সংকট এবং বিনিয়োগ পরিবেশের চরম বিপর্যস্ততা ঢাকায় অবস্থিত আইআরআই-এর সরাসরি সহযোগী একটি শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্যানুসারে, বিগত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির অনুপস্থিতি একটি দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতিগত সংকট তৈরি করেছে। এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব সরাসরি পড়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে: অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ না থাকায় শুধু নতুন মার্কিন বিনিয়োগ বা পশ্চিমা মূলধনই স্থবির হয়ে পড়েনি, বরং আন্তর্জাতিক প্রধান প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের স্বার্থও ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান শর্ত হলো নীতিগত স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন; যা রাজনীতির অস্থিতিশীলতার কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি সাধারণ জনগণ, ব্যবসায়ী সমাজ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদদের আস্থার অভাব প্রকট রূপ ধারণ করেছে। এর ফলে মূলধন পাচার এবং দেশীয় নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে এক ধরণের নেতিবাচক জড়তা তৈরি হয়েছে।

গত নির্বাচন এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর একে অপরের ওপর বিষোদগার ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের সংস্কৃতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অনমনীয় করে তুলেছে। গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করা হয় জবাবদিহিতা ও জনমতের সম্মতির ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু যখন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন তা তৃতীয় কোনো অসংবিধানিক শক্তির উত্থান অথবা রাষ্ট্রের ভেতরে বহুমুখী সংকট তৈরি করে। আইআরআই-এর সাম্প্রতিক উদ্যোগটি এই অন্ধগলি থেকে বেরিয়ে আসার একটি প্রচেষ্টা হলেও, দলগুলোর স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক সদ্ব্যচ্ছা ব্যতিরেকে বৈদেশীক মধ্যস্থতা কিংবা পরামর্শ খুব বেশি দূর এগোতে পারে না।

আইআরআই বা বৈশ্বিক অংশীদারদের পাশাপাশি দেশীয় সিভিল সোসাইটি ও রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্যোগে অবিলম্বে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংলাপ শুরু করা প্রয়োজন। যেখানে মূল এজেন্ডা হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ এবং প্রশাসনিক কাঠামোর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে জরুরি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করা আবশ্যক। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অন্তর্বর্তীকালীন রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ সচল রাখা যায়।

বাংলাদেশ আজ একটি চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। আইআরআই-এর দল নিরপেক্ষ বৈঠকগুলো স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, আন্তর্জাতিক বিশ্ব বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্বাসন দেখতে চায়। সংঘাত এবং পারস্পরিক অনাস্থার পথ ধরে কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। যত দ্রুত সম্ভব রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সংলাপে বসবে, ততই দ্রুত বর্তমান অস্থিতিশীলতার নিরসন ঘটবে এবং স্থবির অর্থনৈতিক চক্র সচল হবে।

ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্য সোর্স নিউজ বাংলা