কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন মোড়: পুতিন-হাসিনা ' ফোনালাপ' ও রূপপুর প্রকল্প ও দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ, ব্রিকস সম্মেলনের নেপথ্য আলোচনা ও বিশ্ব নেতাদের ভূমিকা
সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একাধিক বিশ্ব নেতার যোগাযোগ নিয়ে কূটনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার প্রায় ২০ মিনিটের একটি ফোনালাপ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের উপস্থিতিতে এই ফোনালাপটি অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির আদর্শিক সংগঠন আরএসএস-এর মুখপত্র হিসেবে পরিচিত সাপ্তাহিক 'অর্গানাইজার' পত্রিকার এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। যদিও ভারত, রাশিয়া বা শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এর কোনো সত্যতা স্বীকার করা হয়নি, তবুও এ ঘটনাটি আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি ও ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই নতুন পরিস্থিতিকে নিরাপত্তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পর্যালোচনা করছে ভারত। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক স্থিতিশীলতা এবং বাংলাদেশে বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগের সুরক্ষার বিষয়ে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। ভারতের পক্ষ থেকে চীন ও রাশিয়াসহ প্রধান বিনিয়োগকারী দেশগুলোকে বোঝানো হচ্ছে যে, বাংলাদেশে যেকোনো দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও রাশিয়ার স্বার্থ
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কেন বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আগ্রহী, তার পেছনে একটি বড় কারণ হলো প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এটি কেবল একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ায় রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উপস্থিতির মূল ভিত্তি। সিরিয়া ও ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর, রাশিয়ার জন্য রূপপুর প্রকল্পের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আর্থিক লেনদেনে জটিলতা তৈরি হওয়ায় বিকল্প উপায়ে (যেমন ভারতীয় রুপিতে) অর্থ পরিশোধের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে, যেখানে রাশিয়া ও বাংলাদেশ—উভয় দেশের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ভারতের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ।
ঢাকার অবস্থান পরিবর্তন ও 'সম্পর্ক রিসেট'-এর বার্তা
ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করার পরপরই কূটনৈতিক অঙ্গনে বেশ কিছু দ্রুত পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ভারতের সাথে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে 'রিসেট' করে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়েছে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাশিয়ার সক্রিয় কৌশলগত অবস্থান, রূপপুর প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এবং ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের সামগ্রিক প্রভাব ঢাকার নতুন এই ভারতমুখী পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক বার্তার পেছনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন অধ্যায়
অর্গানাইজার পত্রিকার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এসব কূটনৈতিক ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না হলেও, পুতিন-হাসিনা কথিত ফোনালাপ এবং ভারতের মধ্যস্থতামূলক অবস্থানের আলোচনা প্রমাণ করে যে, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নে রাশিয়া, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
রক্তাক্ত বাংলাদেশ ও সুশীল মুখোশের আড়ালে নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় ডাকাতি: ইউনূস সরকারের দেড় বছরের ভয়াবহ প্রতারণার চালচিত্র: আবেগের ছলে ক্ষমতার মোহ: এক মেটিকুলাস চক্রান্তের শিকার জাতি।
মুখোশের আড়ালে মহালুটপাট:ইউনূস সরকারের দেড় বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশী বিষবৃক্ষ
গুলশানে আওয়ামী লীগের হঠাৎ শোডাউন: প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা নাকি পতনের সংকেত ? কাবুলের ছায়া ও ঢাকার উত্তাল রাজনীতি