শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

নিরাপত্তাহীন রাষ্ট্র, সংকুচিত মানবাধিকার: বিএনপি সরকারের প্রথম চার মাসের বাস্তবতা

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন, প্রধান সম্পাদক - দ্য সোর্স নিউজ বাংলা প্রকাশিত: ৭ জুলাই ২০২৬, ৬:৫২ এএম
নিরাপত্তাহীন রাষ্ট্র, সংকুচিত মানবাধিকার: বিএনপি সরকারের প্রথম চার মাসের বাস্তবতা

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি নির্বাচিত সরকারের সফলতার অন্যতম প্রধান মানদণ্ড হলো—নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং মানবাধিকার রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নেওয়া। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি—এসবের মূল্য অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়, যদি মানুষ নিজেকে নিরাপদ মনে না করে। কারণ রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্বই হলো নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিএনপি সরকারের প্রথম চার মাসের অভিজ্ঞতা সেই মৌলিক প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবতার সঙ্গে তার ব্যবধান ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। খুন, ধর্ষণ, মব সহিংসতা, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সাংবাদিক নির্যাতন এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার মতো ঘটনা এখনও উদ্বেগজনক হারে ঘটছে। ফলে জনমনে নিরাপত্তাহীনতা যেমন বাড়ছে, তেমনি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ ও বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরবর্তী তিন মাসে সারা দেশে ৯১৫টি হত্যাকাণ্ডের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১০টিরও বেশি মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন। মার্চে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি এবং মে মাসে ৩১০টি হত্যামামলা রেকর্ড হয়েছে। সংখ্যার বিচারে আগের বছরের সঙ্গে তুলনা করা গেলেও বাস্তবতা হলো—একজন নাগরিকের জীবনও যদি নিরাপদ না থাকে, তবে পরিসংখ্যানের সামান্য ওঠানামা মানুষের ভয় ও অনিশ্চয়তা কমাতে পারে না। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো মব সহিংসতার বিস্তার। রাষ্ট্র যখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্বলতার পরিচয় দেয়, তখন বিচার নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা সমাজে বাড়তে থাকে। সরকারের প্রথম ১০০ দিন উপলক্ষে প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদনে দেখা যায়, কঠোর অবস্থানের ঘোষণা সত্ত্বেও গণপিটুনি ও মব সহিংসতা কমেনি। মার্চ ও এপ্রিলেই ৬৯ থেকে ৮০টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। নিহত হয়েছেন ৩১ থেকে ৪২ জন এবং আহত হয়েছেন ৭০ থেকে ১২৫ জন। একই সময়ে কারা হেফাজতে একাধিক মৃত্যুর ঘটনা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নির্যাতন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব ঘটনা আইনের শাসনের দুর্বলতা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতির দিকেই ইঙ্গিত করে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) জুন মাসের পর্যবেক্ষণ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। মাত্র এক মাসে ৭৮টি মব সহিংসতার ঘটনায় ৩৩ জন নিহত এবং ১২৬ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। আগের মাসের তুলনায় আহতের সংখ্যা প্রায় ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগক্ষমতার ওপর মানুষের আস্থা হ্রাসের প্রতিফলন। চোর সন্দেহ, ছিনতাইয়ের অভিযোগ, গুজব কিংবা সামান্য ভুল বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধভাবে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা—কোনো সভ্য রাষ্ট্রে এটি স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না। ধর্মীয় সহনশীলতা ও সামাজিক সম্প্রীতির ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। ঢাকা, কুষ্টিয়া ও সিলেটে মাজার, বাউল সম্প্রদায় এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। একজন পীরকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও দেশের ধর্মীয় সহনশীলতার জন্য অশনিসংকেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নেও উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টসের (বিএজে) তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসেই অন্তত ৪০টি পৃথক ঘটনায় ৫১ জন সাংবাদিক হামলা, নির্যাতন ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা এবং সম্পাদককে গ্রেপ্তারের ঘটনাও স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য অস্বস্তিকর বার্তা বহন করে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বাধীন গণমাধ্যমকে ভয় দেখিয়ে নয়, বরং তথ্যপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেই জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে কেবল সরকার পরিবর্তন করলেই রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যায় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের যে কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে, তা সংস্কার ছাড়া স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়। ব্যক্তি পরিবর্তনের চেয়ে প্রতিষ্ঠানকে পেশাদার, জবাবদিহিমূলক এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর পূর্বে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা খাতে একাধিক কাঠামোগত সংস্কারের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু সেই সুপারিশ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। বরং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, প্রস্তাবিত আইন কমিশনের স্বাধীন তদন্তক্ষমতা সীমিত করতে পারে এবং সরকারের প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। যদি এমনটি ঘটে, তবে মানবাধিকার সুরক্ষার অন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে। একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোনো সরকার কেবল উন্নয়ন প্রকল্প, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা রাজনৈতিক সাফল্যের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারে না। নাগরিক যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, যদি ন্যায়বিচারের ওপর আস্থা হারান, যদি মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, তবে সেই আস্থার ভিত্তি দ্রুত ক্ষয়ে যায়। এ কারণেই এখন সময় এসেছে সরকারকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, বরং রাষ্ট্রের সার্বিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার। দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে ব্যবস্থা নেওয়া, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং একটি স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন গঠন করা—এসব পদক্ষেপ আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার ক্ষমতায় নয়; বরং নাগরিকের আস্থায়। সেই আস্থা অর্জন করতে হলে সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপে আইনের শাসন, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকার রক্ষার সুস্পষ্ট প্রতিফলন থাকতে হবে। অন্যথায় আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও মানবাধিকার সংকট কেবল সরকারের জনপ্রিয়তাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে তুলবে।