আগুনের বৃত্তে বাঁধা পৃথিবী: ইউক্রেনের ধ্বংসস্তূপ থেকে পারস্যের বিষণ্ণ সন্ধ্যা
বিশ্বজুড়ে এখন এক থমথমে অন্ধকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস কিংবা স্নায়ুযুদ্ধের সেই আতঙ্কময় দিনগুলোর পর পৃথিবী আর কখনোই এমন গভীর খাদের কিনারায় এসে দাঁড়ায়নি। আজ আমাদের চারপাশের মানচিত্রজুড়ে শুধু রক্তের দাগ আর বারুদের গন্ধ। দুটি বিশাল আগুনের কুণ্ডলী একসঙ্গে জ্বলে উঠেছে। একটি আগুন ঝলসে দিচ্ছে ইউরোপের সবুজ প্রান্তর আর হাজার বছরের সভ্যতাকে, আর অন্যটি ছাড়খার করে দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন আকাশ ও সমগ্র বিশ্বের শান্তিকে। মানুষ আজ নিজের তৈরি মরণাস্ত্রের কাছেই বন্দি হয়ে পড়েছে।
ইউক্রেনের এক বরফাবৃত পরিত্যক্ত পথ ধরে হাঁটলে দেখা যাবে কোনো এক মায়ের ভেঙে যাওয়া ঘরের জানালা, যেখান থেকে প্রতিদিন সকালে হয়তো আনন্দের আলো ছড়াত। সাড়ে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই অহেতুক লড়াই হাজার হাজার জীবনকে শুধু পরিসংখ্যানে রূপ দিয়েছে। পাঁচ লাখের বেশি রুশ সেনার তাজা প্রাণ শেষ হয়ে গেছে এক অনাকাঙ্ক্ষিত জেদের আগুনে, আর ইউক্রেনের লক্ষাধিক তরুণ সেনা চিরতরে ঘুমিয়ে পড়েছে এই পবিত্র মাটিতে। আজ ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাসপাতাল আর বিদ্যালয়গুলো ইট-পাথরের স্তূপ ছাড়া আর কিছুই নয়। কোটি কোটি মানুষের চোখে আজ স্বদেশের ছাদ নেই, তাদের ভাগ্যে জুটেছে যাযাবরের মতো শরণার্থীর জীবন। কত মা এখনো পথের দিকে চেয়ে বসে আছেন তাঁর সন্তানের অপেক্ষায়, যে সন্তান আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।
ঠিক একই বিষাদের সুর বাজছে পারস্য উপসাগরের উপকূলেও। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন তেহরান বা তেল আবিবের আকাশ। পরাশক্তির অহংকার আর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে এখানেও ঝরে যাচ্ছে হাজারো নিষ্পাপ প্রাণ। মার্কিন বিমান হামলায় বা ইরানের পাল্টা ড্রোন বারুদে কার ঘর পুড়ছে? সেই তো কোনো এক সাধারণ বাবার, কোনো এক অবুঝ শিশুর! হরমুজ প্রণালি আজ অবরুদ্ধ, বিশ্বজুড়ে বাড়ছে হাহাকার। পারস্য উপসাগরের সেই ঐতিহ্যবাহী শান্ত রাতগুলো আজ যুদ্ধবিমানের গর্জনে চূর্ণ-বিচূর্ণ। অথচ, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যুদ্ধে কখনোই কেউ বিজয়ী হতে পারে না, বিজয়ী হয় শুধু শোক আর শ্মশান।
আজ ক্ষমতার শীর্ষ সিংহাসনে বসে থাকা শাসকরা হয়তো লাল গালিচায় হেঁটে বৈঠকে বসছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, জেলেনস্কি, নেতানিয়াহু কিংবা পুতিনের কূটনীতির টেবিলে কত শত অঙ্ক কষা হচ্ছে। কিন্তু যে ছেলেটি হারিয়ে গেছে, যে মেয়েটি পঙ্গু হয়ে হাহাকার করছে, তাদের সেই অশ্রুজলের হিসাব কি কোনো চুক্তিপত্রে লেখা থাকে? রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ক্ষমতার মোহে চুক্তি করতে ভয় পাচ্ছেন, পাছে তাঁর সাম্রাজ্য চুরমার হয়ে যায়। অন্যদিকে কিয়েভের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিও নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে কোনো ভূখণ্ড ছাড়তে নারাজ। আর ওয়াশিংটন ক্ষমতার দম্ভে ইরানে পা দিয়ে আজ এমন এক চোরাবালিতে আটকে গেছে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ হারিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু যুদ্ধের এই ভয়াবহ অন্ধকারময় ক্যানভাসে একটি অদৃশ্য সুতো জড়িয়ে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বকে বাঁচাতে হলে আজ ইউক্রেন ও ইরানের এই জোড়া বিষাক্ত সুতো ছিন্ন করতে হবে। রাশিয়াও ভেতর থেকে ক্লান্ত; তার অর্থনীতি আজ পঙ্গু, সামরিক শক্তি ক্ষয়িষ্ণু। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও চায় এই অনন্ত যুদ্ধ থেকে মুক্তি পেতে। এই বিশাল বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে হয়তো একটাই আলোর রেখা অবশিষ্ট রয়েছে—ইউক্রেন যুদ্ধ যদি সত্যি থামানো যায়, তবে তা হয়তো ইরানের রক্তক্ষরণ বন্ধের চাবিকাঠি হয়ে উঠবে। কিয়েভের আকাশে যদি রক্তের বদলে আবার ভোরের নরম রোদ ওঠে, তবে তেহরানের বিষণ্ণ আকাশেও হয়তো ফিরে আসবে শান্তির বাতাস।
আমরা সাধারণ মানুষরা রাজনীতি বা ভূ-রাজনীতি বুঝি না। আমরা শুধু বুঝি এক ফোঁটা রক্ত আর এক ফোঁটা চোখের জলের দাম। কত শত রাত বাবা-মায়েরা ট্রেনের কামড়ায় বা ঠাণ্ডা বাঙ্কারে তাদের কোলের শিশুকে জড়িয়ে ধরে পরম করুণাময়ের কাছে শুধু একটি শান্ত ভোরের জন্য প্রার্থনায় লীন হন। শাসকশ্রেণী কি শুনতে পায় সেই নিভৃত রাতের আর্তনাদ? মানবতা আজ ধুঁকছে, প্রদীপ নেভার আগেই কি বিশ্বনেতারা জ্বালাবেন সচেতনতার আর ভালোবাসার কোনো প্রদীপ? ইউক্রেনের বরফ ঢাকা পথ কিংবা পারস্যের বালুচরে আর কোনো রক্ত যেন না ঝরে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সকল নিষ্পাপ শিশুর হাসির মুখ ফিরিয়ে দিতেই যুদ্ধবাজদের অস্ত্র নামাতে হবে আজই।
লেখক: শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক
সম্পর্কিত সংবাদ
মহাকাশ থেকে ছায়াযুদ্ধ: মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি হামলার নেপথ্যে কি তবে চিনা কৃত্রিম উপগ্রহ? মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে মহাকাশ গোয়েন্দাগিরির নতুন সমীকরণ
বাংলাদেশ কি চরম সংকটের দ্বারপ্রান্তে? — প্রবৃদ্ধি, শাসনব্যবস্থা ও টিকে থাকা
দোভাল-চালে ধরাশায়ী ঢাকা: ভারত-চীন মেরুকরণে বাংলাদেশের মহা-কূটনৈতিক বিপর্যয়: মোদী-জিনপিং ঐতিহাসিক বৈঠক: ভুল পদক্ষেপে আম ও ছালা দুটোই খোয়াল তারেক