বাংলাদেশ কি চরম সংকটের দ্বারপ্রান্তে? — প্রবৃদ্ধি, শাসনব্যবস্থা ও টিকে থাকা
প্রথম খণ্ড — রাজনৈতিক রূপান্তর ও শাসনব্যবস্থার সংকট বাংলাদেশ তার রাজনৈতিক ইতিহাসে আরও একটি ঐতিহাসিক ও নির্ণায়ক মুহূর্তে উপনীত হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ কেবল একটি সরকারের পতন ঘটায়নি, বরং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শাসনক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করেছে। দুই বছর পর বাংলাদেশ তিনটি স্পষ্ট রাজনৈতিক পর্যায়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে—শেখ হাসিনার দীর্ঘমেয়াদী আওয়ামী লীগ সরকার, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন শাসন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার। তবে মূল প্রশ্নটি এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে: রাজনৈতিক পরিবর্তন কি প্রাতিষ্ঠানিক পুনরুজ্জীবন ঘটাতে পেরেছে? এই নিবন্ধে উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণ ইঙ্গিত দেয় যে তা হয়নি—অন্তত এখন পর্যন্ত নয়। ক্ষমতার রদবদল ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু সুশাসন, জননিরাপত্তা, বিচার বিভাগের বিশ্বাসযোগ্যতা, অর্থনৈতিক আস্থা এবং রাজনৈতিক সমঝোতার গভীর সংকটগুলো এখনও নিরসন হয়নি। ফলে দেশ সাধারণ রাজনৈতিক অস্থিরতার চেয়েও বড় বিপদের সম্মুখীন। এটি এমন একটি চক্রে আটকে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে প্রতিবার সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে রাষ্ট্রকাঠামোর পুনর্বিন্যাস, রাজনৈতিক প্রতিশোধের নতুন অধ্যায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার ধারাবাহিক অবনতি ঘটতে থাকে। তিনটি রাজনৈতিক অধ্যায়, একটি অমীমাংসিত সংকট ২০২৪ পরবর্তী তিনটি সময়কালকে কেবল ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক আখ্যান হিসেবে দেখা উচিত নয়। প্রতিটি অধ্যায়ই বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের একেকটি ভিন্ন মাত্রাকে প্রতিনিধিত্ব করে। হাসিনা আমল: উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ ২০২৪ সালের আগস্টের আগে শেখ হাসিনার সরকার অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা চর্চা করেছিল। ক্ষমতার এই একত্রীকরণ স্থিতিশীলতা এনেছিল এবং রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন নীতিগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করতে সাহায্য করেছিল। এই সময়ে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন ঘটেছিল: • দৃঢ় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: ১৫ বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে প্রায় ৬.৬% ছিল। • দারিদ্র্য বিমোচন: জাতীয় দারিদ্র্যের হার ৪২% থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ১৮%-এ নেমে এসেছিল। • অবকাঠামো ও জ্বালানি বিস্তার: মেগা প্রকল্পগুলো জাতীয় অবকাঠামো ও যোগাযোগ খাতকে বদলে দিয়েছিল এবং প্রায় শতভাগ মানুষের কাছে বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছেছিল। • সামাজিক অগ্রগতি: প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এনরোলমেন্ট বা ভর্তির হার প্রায় শতভাগে পৌঁছেছিল, এবং ১৪,০০০-এরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিকের নেটওয়ার্ক গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছিল। • ব্যবসা ও নিরাপত্তার উন্নতি: কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছিল, আর উন্নত বিনিয়োগ পরিবেশ বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আকৃষ্ট করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছিল। এই সাফল্যগুলো যৌথভাবে বাংলাদেশকে গ্লোবাল সাউথে একটি বিশিষ্ট ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। কিন্তু উন্নয়ন ও গণতন্ত্র সমান তালে এগোতে পারেনি। রাজনৈতিক ব্যবস্থা ক্রমশ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে। বিরোধী শক্তিগুলো বাধার মুখোমুখি হয়, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং দলীয় আনুগত্য লাভ ও পৃষ্ঠপোষকতা রাজনৈতিক-প্রশাসনিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। এই বৈপরীত্যটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ: একটি রাষ্ট্র প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে পারে, আবার একই সাথে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বলও হয়ে পড়তে পারে। হাসিনা আমল প্রমাণ করেছে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোর প্রসার এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা চিত্তাকর্ষক জাতীয় সাফল্য এনে দিতে পারে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো যখন মাত্রাতিরিক্তভাবে একটি মাত্র রাজনৈতিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন স্থিতিশীলতা নিজেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। সেই কেন্দ্রটি সরে গেলে, প্রতিষ্ঠানগুলো দেখতে যতটা শক্তিশালী মনে হয়েছিল, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি নড়বড়ে প্রমাণিত হয়। ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন অধ্যায়: বিশৃঙ্খলা ও সংস্কার ২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থান রাজনৈতিক চিত্রপটকে মৌলিকভাবে বদলে দেয়। সংবিধান ফিরিয়ে আনা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির প্রত্যাশা নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্বটি ছিল অত্যন্ত কঠিন: তীব্র রাজনৈতিক বিভাজনে বিভক্ত একটি রাষ্ট্রকে সংস্কার করা, এবং একই সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। কিন্তু এই রূপান্তর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় গুরুতর বিঘ্ন ঘটায়। পুলিশ ও আনসার বাহিনী, যারা গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই চরম চাপে ছিল, তাদের মনোবল ও কার্যকর ক্ষমতায় বড় ধরণের ধস নামে। প্রতিশোধের ভয়ে কর্মকর্তারা কর্মস্থল ত্যাগ করেন। একই সময়ে, মব জাস্টিস ও সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আনুষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে মানুষের আস্থা কমতে থাকে। এই পরিবর্তনের সময়ে হওয়া সহিংসতা ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে নানা উদ্বেগ তৈরি হয়। অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূল্যস্ফীতি, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন, কারখানা বন্ধ হওয়া এবং কর্মসংস্থান হারানোর ফলে সাধারণ পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ বাড়ে। এই অভিজ্ঞতা থেকে একটি বড় শিক্ষা পাওয়া যায়: একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা যত দ্রুত ভেঙে ফেলা যায়, তা গড়ে তোলা তত দ্রুত সম্ভব নয়। সংস্কার অপরিহার্য, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা ছাড়া সংস্কার শূন্যতার সৃষ্টি করতে পারে। পুলিশের কর্তৃত্ব হ্রাস পেলে, বিচার ব্যবস্থার আস্থা দুর্বল হলে এবং প্রশাসনিক কাঠামো গ্রহণযোগ্যতা হারালে রাজনৈতিক গোষ্ঠী, অপরাধী চক্র এবং অনিয়মতান্ত্রিক বিচার ব্যবস্থার পথ উন্মুক্ত হয়। বিএনপি সরকার: নির্বাচনই অন্তর্বর্তীকালীন অধ্যায়ের শেষ নয় তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সাংবিধানিক স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা, আইনশৃঙ্খলা জোরদার করা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করে। তবে তারা এমন একটি দেশ উত্তরাধিকারসূত্রে পায় যার প্রতিষ্ঠানগুলো আগেই গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। নির্বাচন কেন্দ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। আওয়ামী লীগ ও তার চিরাচরিত মিত্রদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বাইরে রাখা হয়েছিল, যা রাজনৈতিক দলগুলোর অন্তর্ভুক্তি এবং এই রাজনৈতিক ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়। তাই নতুন সরকারের সামনে দুটি কাজ একসাথে এসেছে: দেশ পরিচালনা করা এবং রাষ্ট্রের ওপর জনআস্থা ফিরিয়ে আনা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনও বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। সংসদীয় প্রতিবেদন এবং ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (TIB) তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দেখা যায় যে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে (মার্চ থেকে মে ২০২৬) বাংলাদেশে রেকর্ড করা হয়েছে: • ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড • ১৯৬টি অপহরণ • ২৯৪টি ছিনতাই • ৯০টি ডাকাতি • ২,২১৪টি চুরি • ১২৪টি পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা বিচ্ছিন্নভাবে বা সামগ্রিকভাবে দেখা হলেও, এই পরিসংখ্যানগুলো একটি মারাত্মক জননিরাপত্তা সংকটের দিকে নির্দেশ করে। মে ২০২৬-এর পর পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটেছে বলে প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে। এই উদ্বেগ কেবল রাস্তার অপরাধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়ার অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলের যুব ও ছাত্রসংগঠনগুলোর চাঁদাবাজি ও সহিংসতায় জড়িয়ে পড়া এবং অন জামিনযোগ্য আইনি বিধান ব্যবহার করে গ্রেপ্তারের মতো বিষয়গুলো নিয়ে নানা বিতর্ক দেখা যাচ্ছে। এটি বাংলাদেশকে তার বর্তমান সংকটের একদম কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সরকার পরিবর্তন হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাষ্ট্র পরিবর্তিত হয় না। তাই বিএনপি সরকারের আসল পরীক্ষা হবে তারা বিগত আমলের (২০০১–২০০৬) এবং তাদের পূর্বসূরিদের রাজনৈতিক চর্চার পুনরাবৃত্তি করার প্রলোভন সামলাতে পারে কিনা। একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সুযোগ থাকে। কাগজে-কলমে তা থাকলেও বাস্তবে বিএনপি তাদের অনুগতদের সব গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে দিচ্ছে। এই সুযোগটি হাতছাড়া হলে ভবিষ্যতে আরেকটি রাজনৈতিক রূপান্তর আবারও একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের জন্ম দিতে পারে। বৃহত্তর চিত্র তিনটি অধ্যায়কে একত্রে দেখলে একটি উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে। • হাসিনা আমল স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন দিয়েছিল, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক বহুদলীয় চর্চার অভাব ছিল। • ইউনূস আমল রাজনৈতিক পরিবর্তন এনেছিল এবং সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা দেখিয়েছিল, কিন্তু গুরুতর প্রাতিষ্ঠানিক বিশৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছিল। • বিএনপি সরকার দুর্বল হয়ে পড়া প্রতিষ্ঠান, ধারাবাহিক নিরাপত্তাাহীনতা এবং অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তির মধ্যে রাজনৈতিক স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ পেয়েছে। শিক্ষাটি এটি নয় যে একটি অধ্যায় সম্পূর্ণ সফল এবং অন্যটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ ছিল। গভীর শিক্ষাটি হলো, বাংলাদেশ বারবার ‘রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ’-কেই স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছে। এখন এই চিন্তাধারাকে উল্টে দেয়ার সময় এসেছে। স্থিতিশীলতার ভিত্তি হতে হবে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো—কোনো ব্যক্তি, দল বা সরকার নয়।
লেখক: আলি কবীর,ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ,টরেন্টো,কানাডা
সম্পর্কিত সংবাদ
মহাকাশ থেকে ছায়াযুদ্ধ: মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি হামলার নেপথ্যে কি তবে চিনা কৃত্রিম উপগ্রহ? মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে মহাকাশ গোয়েন্দাগিরির নতুন সমীকরণ
আগুনের বৃত্তে বাঁধা পৃথিবী: ইউক্রেনের ধ্বংসস্তূপ থেকে পারস্যের বিষণ্ণ সন্ধ্যা
দোভাল-চালে ধরাশায়ী ঢাকা: ভারত-চীন মেরুকরণে বাংলাদেশের মহা-কূটনৈতিক বিপর্যয়: মোদী-জিনপিং ঐতিহাসিক বৈঠক: ভুল পদক্ষেপে আম ও ছালা দুটোই খোয়াল তারেক