মহাকাশ থেকে ছায়াযুদ্ধ: মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি হামলার নেপথ্যে কি তবে চিনা কৃত্রিম উপগ্রহ? মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে মহাকাশ গোয়েন্দাগিরির নতুন সমীকরণ
মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুর বুকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিতে হানা দিয়েছে এক নতুন ও আশঙ্কাজনক ভূ-রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্ত। জর্ডনের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ঘাঁটি ‘মুওয়াফাক সলতি এয়ারবেসে’ সম্প্রতি ঘটে যাওয়া প্রাণঘাতী ইরানি রকেট হামলার নেপথ্যে এখন উঠে আসছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি চীনের নাম। মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়েছে—হামলার ঠিক আগ মুহূর্তে জর্ডনে মোতায়েন থাকা মার্কিন বাহিনীর প্রতিটা পদক্ষেপ, বিমান ও সামরিক সম্পদের নিখুঁত অবস্থান চীনের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বাণিজ্যিক বা বেসরকারি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সরাসরি পৌঁছে গিয়েছিল তেহরানের হাতে।
মহাকাশ প্রযুক্তি, বেসরকারি স্যাটেলাইট নজরদারি এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রক্সি লড়াইয়ের এই ত্রিমুখী মেলবন্ধন বিশ্বরাজনীতিতে এক চরম অস্বস্তিকর অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র হানায় তিন মার্কিন সেনার মৃত্যু এবং চারজনের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় ওয়াশিংটন যেমন ক্ষুব্ধ, তেমনই চীনের এই পরোক্ষ ভূমিকার গুঞ্জন হোয়াইট হাউসকে গভীর ভাবনায় ফেলে দিয়েছে।
জর্ডনের মরুভূমিতে রক্তের দাগ: ১৭ জুলাইয়ের সেই অভিশপ্ত প্রহর
গত ১৭ জুলাই জর্ডনের মুওয়াফাক সলতি এয়ারবেস সাধারণ আর দশটা দিনের মতোই ব্যস্ত ছিল। এটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমান বাহিনীর অন্যতম প্রধান কৌশলগত কেন্দ্র, যেখান থেকে পুরো অঞ্চলে নজরদারি ও জঙ্গি-বিরোধী অপারেশন পরিচালনা করা হয়। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই ঘাঁটির ওপর আছড়ে পড়ে তেহরান-সমর্থিত অথবা সরাসরি ইরানের ছুড়ে মারা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র।
সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য হলেও, সেদিন ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অবিশ্বাস্য নিখুঁতভাবে মার্কিন সেনাশিবির ও সামরিক সম্পদের ওপর আঘাত হানে। হামলায় ঘটনাস্থলেই তিন মার্কিন সেনা নিহত হন এবং আরও চারজন গুরুতর আহত হন। এই হামলার নির্ভুলতা মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের হতবাক করে দিয়েছিল—কীভাবে ইরান এত দূর থেকে মার্কিন ঘাঁটির ভেতরের নিখুঁত কাঠামোগত তথ্য সংগ্রহ করল? মহাকাশ থেকে নজরদারি: চীনের বেসরকারি স্যাটেলাইট ও গোয়েন্দা লিঙ্ক
হামলার পরপরই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশদ তদন্তে নামে। তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে মার্কিন আধিকারিকরা দাবি করেন, হামলার ঠিক আগে এবং অব্যবহিত পরে মুওয়াফাক সলতি এয়ারবেসের অতি উচ্চ-রেজলিউশনের (High-resolution) স্যাটেলাইট ছবি ইরানের কাছে পৌঁছানো হয়েছিল। আরও চমকপ্রদ তথ্য হলো, স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং এবং তথ্যের সূত্র বিশ্লেষণ করে জানা গেছে—এই হাই-রেজলিউশন ছবি সরবরাহকারী প্রযুক্তিগত মাধ্যমগুলো চীনের কোনো না কোনো বাণিজ্যিক বা বেসরকারি স্পেস কোম্পানির মালিকানাধীন।
মার্কিন প্রশাসনের মতে, এই ছবিগুলো সাধারণ কোনো মানচিত্র ছিল না। এগুলো ছিল ঘাঁটির সাম্প্রতিকতম পরিস্থিতির একটি রিয়েল-টাইম ছবি, যেখানে প্রতিটি যুদ্ধবিমান, অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট মিসাইল ব্যাটারি, তেল ডিপো এবং সেনা আবাসের সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। শুধু তা-ই নয়, ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর কতটুকু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং কত দ্রুত মার্কিন সেনারা পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা মূল্যায়ন করতেও ওই চিনা স্যাটেলাইট চিত্রগুলো ইরানকে চূড়ান্ত সাহায্য করেছিল।
রাষ্ট্রীয় মদত নাকি বেসরকারি ব্যবসা: ওয়াশিংটনের মেপে পা ফেলার কৌশল
রিপোর্টে চিনা সংস্থার নাম উঠে আসলেও ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে জল মাপছে। মার্কিন আধিকারিকরা সুনির্দিষ্টভাবে এ কথা স্পষ্ট করেছেন যে, এই তথ্য হস্তান্তরের পেছনে বেজিংয়ের সরাসরি কোনো সরকারি নির্দেশ বা রাষ্ট্রীয় নির্দেশিকা ছিল কিনা, তার কোনো স্পষ্ট বা অকাট্য প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। কোনো কোনো চিনা বেসরকারি বা আধা-সরকারি স্পেস-টেক সংস্থা এই ডেটা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত, সেই নামগুলোও মার্কিন তদন্তকারীরা জনসমক্ষে আনেননি।
এর দুটি সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে:
• প্রথমত, চীনের অনেক স্যাটেলাইট সংস্থা বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উচ্চমানের উপগ্রহ চিত্র বিক্রি করে থাকে এবং হয়তো ইরান কোনো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বা সরাসরি বাণিজ্যিক চুক্তিতে এই ডেটা কিনেছে। • দ্বিতীয়ত, এখনই সরাসরি শি জিনপিং সরকারকে কাঠগড়ায় তুলে দিলে মার্কিন-চীন কূটনৈতিক সম্পর্কের যে ক্ষীণ সুতোটুকু অবশিষ্ট আছে, তা পুরোপুরি ছিঁড়ে যেতে পারে।
চীন ইতিমধ্যেই মার্কিন সংবাদমাধ্যমের এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দিয়েছে। বেজিংয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রকের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, চীন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো পক্ষকে বেআইনি সামরিক তথ্য বা গোয়েন্দা সহায়তা দেয় না।
ট্রাম্পের রহস্যময় প্রতিক্রিয়া: 'আমরাও তো চীনের ওপর নজরদারি চালাই' এই সংবেদনশীল ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি কাঁপানো তথ্য সামনে আসার পর স্বভাবতই সবার নজর চলে যায় আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া কী হয় তার ওপর। বিষয়টি নিয়ে হোয়াইট হাউসে যখন মার্কিন সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়—যেখানে জানতে চাওয়া হয় চিনা সংস্থার এই কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি কি চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আসন্ন দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে কড়া প্রতিবাদ জানাবেন?
ট্রাম্প যে উত্তর দিলেন, তা অনেককেই অবাক করেছে। তিনি কোনো সামরিক হুমকি বা বেজিংকে সরাসরি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার পথে হাঁটেননি। বেশ শীতল ও কৌশলী ভঙ্গিতে ট্রাম্প মন্তব্য করেন,
"চীন যদি এমনটা করেও থাকে, তবে মনে রাখা দরকার আমেরিকাও কিন্তু ২৪ ঘণ্টা চীনের ওপর একইভাবে নজরদারি চালায়।"
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের মূল সুর ধরে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তিনি বিশ্বস্ত মহাসমরের এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছেন যে modern espionage বা আধুনিক গোয়েন্দাগিরিতে দুই পরাশক্তিই একে অপরের বিরুদ্ধে মহাকাশ ও সাইবার প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। তাছাড়া আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে এক হাই-প্রোফাইল বৈঠকের সূচি নির্ধারিত রয়েছে। সেই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আগে সম্পর্কের পারদ যাতে অতিরিক্ত চড়ে না যায়, ট্রাম্প হয়তো সেই সতর্ক কূটনৈতিক চালই চেলেছেন। একমাত্র উৎস চীন, নাকি রাশিয়ার ছায়া? একটি বড় সামরিক প্রশ্নের সমাধান এখনো মেলেনি—ইরানের এই সফল ও নিখুঁত হামলার মূল কারিগর কি শুধুই ওই চিনা স্যাটেলাইটের ছবি? নাকি এর পেছনে রয়েছে এক বহুমাত্রিক গোয়েন্দা জটাজাল?
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, চিনা স্যাটেলাইট ছবি নিঃসন্দেহে বড় ভূমিকা রেখেছে, কিন্তু সেটিই ইরানের একমাত্র তথ্যসূত্র ছিল না। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের নিজস্ব ড্রোন ও রিফ্লেক্টর স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক রয়েছে। এছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়ার সঙ্গে তেহরানের যে নজিরবিহীন সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা গড়ে উঠেছে, তার সুফলও ইরান পেতে পারে। মস্কো ও তেহরান সামরিক তথ্য বিনিময়ে বেশ সক্রিয়। ফলে চিনা বাণিজ্যিক ডেটা, রাশিয়ান মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স এবং ইরানের নিজস্ব গ্রাউন্ড ইন্টেলিজেন্স—এই তিনের সংমিশ্রণেই মুওয়াফাক সলতি ঘাঁটিতে ওই মারাত্মক আঘাত হানা সম্ভব হয়েছিল।
পরাশক্তিগুলোর স্নায়ুযুদ্ধ এবং ভবিষ্যতের সমীকরণ
জর্ডনের এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল, ২১ শতকের প্রক্সি যুদ্ধ আর কেবল মাটিতে বা সমুদ্রে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন ছড়িয়ে পড়েছে মহাকাশের কক্ষপথেও। রাষ্ট্রযন্ত্র সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়েও কীভাবে বেসরকারি প্রযুক্তি সংস্থাকে ঢাল বানিয়ে প্রতিপক্ষের ক্ষতি সাধন করতে পারে, তার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে রইল এই ঘটনা।
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বরের ট্রাম্প-শি জিনপিং শীর্ষ বৈঠক এই ইস্যুতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে। চীনের তথ্য সরবরাহ যদি সত্যি প্রমাণিত হয় এবং এর পেছনে রাষ্ট্রীয় সম্মতির গন্ধ পাওয়া যায়, তবে তা কেবল ওয়াশিংটন-বেজিং সম্পর্ককেই বিষিয়ে তুলবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত ভূ-রাজনীতিকে বিশ্বযুদ্ধের আরেক ধাপ কাছাকাছি নিয়ে যাবে।
লেখক: শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক
সম্পর্কিত সংবাদ
বাংলাদেশ কি চরম সংকটের দ্বারপ্রান্তে? — প্রবৃদ্ধি, শাসনব্যবস্থা ও টিকে থাকা
আগুনের বৃত্তে বাঁধা পৃথিবী: ইউক্রেনের ধ্বংসস্তূপ থেকে পারস্যের বিষণ্ণ সন্ধ্যা
দোভাল-চালে ধরাশায়ী ঢাকা: ভারত-চীন মেরুকরণে বাংলাদেশের মহা-কূটনৈতিক বিপর্যয়: মোদী-জিনপিং ঐতিহাসিক বৈঠক: ভুল পদক্ষেপে আম ও ছালা দুটোই খোয়াল তারেক