মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

বঙ্গোপসাগরে পরাশক্তিদের ত্রিমুখী লড়াই : দাওয়েই প্রকল্পে রাশিয়ার প্রবেশ: ও মার্কিন প্রভাবের সংকট

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:২১ পিএম
বঙ্গোপসাগরে পরাশক্তিদের ত্রিমুখী লড়াই : দাওয়েই প্রকল্পে রাশিয়ার প্রবেশ: ও  মার্কিন প্রভাবের সংকট

ভারত, বাংলাদেশ আর মিয়ানমারের কোল জুড়ে থাকা বঙ্গোপসাগর এখন আর শুধু নীল জলরাশি নয়; বরং এটি হয়ে উঠেছে পরাশক্তিগুলোর নতুন এক দাবার ছক। অতি সম্প্রতি নেওয়া কিছু ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি অত্যন্ত জটিল রূপ ধারণ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এসব পদক্ষেপ বঙ্গোপসাগরকে একটি নতুন ‘থিয়েটার অব কনফ্লিক্ট’ বা সংঘাতের রঙ্গমঞ্চে পরিণত করতে যাচ্ছে।

১. মিয়ানমার উপকূলে চীন ও ভারতের স্থায়ী প্রভাব

দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমারের রাখাইন উপকূলে চীনের অর্থায়নে নির্মিত ‘ক্যাউকফিউ’ গভীর সমুদ্রবন্দর চালু রয়েছে। এছাড়া মিয়ানমারের কোকো দ্বীপপুঞ্জে চীনের একটি গোপন সার্ভিলেন্স বা নজরদারি ঘাঁটি রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা রয়েছে। অন্যদিকে, এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব সামলাতে ভারতও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ‘কালাদান বহুমুখী পরিবহন করিডোর’ ও সমুদ্রবন্দর প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে ভারতের নিজস্ব পূর্ব উপকূলের বিশাখাপত্তনম থেকে আন্দামানের পোর্ট ব্লেয়ার পর্যন্ত রয়েছে শক্তিশালী নৌ-ঘাঁটি।

২. দাওয়েই বন্দর: বঙ্গোপসাগরের দোরগোড়ায় রাশিয়ার শক্তিশালী উপস্থিতি

দুই পরাশক্তি চীন ও ভারতের পর এবার বঙ্গোপসাগরে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করছে পুতিনের রাশিয়া। দক্ষিণ মিয়ানমারের আন্দামান সাগর উপকূলের ‘দাওয়েই’ (Dawei) গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে সরাসরি যুক্ত হচ্ছে রুশ সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি।

কৌশলগত অবস্থান: ভৌগোলিক মানচিত্রে দাওয়েই শহরটি আন্দামান সাগরের তীরে অবস্থিত হলেও, আন্তর্জাতিক জলবিজ্ঞান সংস্থা (IHO) এবং সামরিক কৌশলবিদদের মতে আন্দামান সাগর বঙ্গোপসাগরেরই একটি সরাসরি অংশ। এখান থেকে বের হওয়া যেকোনো যুদ্ধজাহাজ বা সাবমেরিন কোনো বাধা ছাড়াই বঙ্গোপসাগরের মূল জলসীমায় ঢুকতে পারবে। মস্কো-নেপিডো চুক্তি: গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিনিয়োগ সহযোগিতার স্মারক সইয়ের পর চলতি বছরের আগস্টে মস্কো সফরে মিয়ানমার জান্তা প্রধানের সঙ্গে পুতিনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুস্টিন নিশ্চিত করেন যে, রুশ কোম্পানিগুলো দাওয়েই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে কাজ করতে আগ্রহী।

লজিস্টিক ও সামরিক হাব:

সিঙ্গাপুরভিত্তিক গবেষকদের মতে, এই বন্দরের মাধ্যমে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ভারত মহাসাগরে চলাচলকারী রুশ সাবমেরিন ও যুদ্ধজাহাজগুলো নিয়মিত রিফুয়েলিং, মেরামত ও লজিস্টিক সুবিধা পাবে। সরাসরি ‘সামরিক ঘাঁটি’ ঘোষণা না করা হলেও এটি হবে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে রাশিয়ার স্থায়ী প্রভাব বিস্তারের মূল অবকাঠামো।

কোণঠাসা যুক্তরাষ্ট্রের ‘কমলা রেখা’ ও চরম নিরাপত্তা ঝুঁকি

গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলে সামরিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বঙ্গোপসাগরে চীনের প্রভাব ঠেকাতে আমেরিকা এতদিন ধরে সাড়ে ৩ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘দিয়েগো গার্সিয়া’ সামরিক ঘাঁটির উপর নির্ভর করে আসছিল।

মার্কিন কৌশলবিদদের পরিভাষায় একে ‘কমলা রেখা’ বা ‘অরেঞ্জ লাইন’ বলা হয়। এর মাধ্যমে স্যাটেলাইট লিঙ্কড মেরিটাইম ডোমেইন অ্যাওয়ারনেস (MDA) এবং সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্সের সাহায্যে বঙ্গোপসাগরের তলদেশ থেকে আকাশসীমা পর্যন্ত মার্কিন পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা হতো।

তবে মিয়ানমারের দাওয়েইতে রাশিয়ার উপস্থিতি এবং কোকো দ্বীপে চীনের নজরদারি ব্যবস্থার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের এই নেটওয়ার্ক মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। চীন, রাশিয়া ও ভারতের এই ত্রিমুখী বলয় মার্কিন ঘাঁটির নজরদারিতে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা (Block) তৈরি করছে।

ভারতের ‘রেড এক্সিস’ ও বঙ্গোপসাগরের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ

ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর দিক থেকে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে ভারত।

আনসিঙ্কাবল এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার:

আন্দামান ও নিকোবর কমান্ড (ANC) হলো ভারতের একমাত্র যৌথ সামরিক কমান্ড, যা বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান রুট ‘সিক্স ডিগ্রি চ্যানেল’ এবং মালাক্কা প্রণালীর মুখ থেকে মাত্র ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আইএনএস বর্ষা (INS Varsha): অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমের কাছে রামবিল্লিতে নির্মিত এটি ভারতের একটি পরমাণু সাবমেরিন ঘাঁটি ও অত্যন্ত গোপন সামরিক দুর্গ।

সুরক্ষা বলয়: ভারতের বিশাখাপত্তনম ও পোর্ট ব্লেয়ার—এই দুই বিন্দুর সংযোগে গঠিত হয়েছে ভারতের প্রতিরক্ষা বলয় বা ‘রেড এক্সিস’। বিশ্বমানের প্রযুক্তি থাকলেও সুদূর অঞ্চল থেকে এসে মার্কিন বা রুশ বাহিনীর পক্ষে বঙ্গোপসাগরে ভারতের সমকক্ষ স্থায়ী পরিকাঠামো গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান আমেরিকার নড়বড়ে অবস্থানের কারণে চীন ও রাশিয়াকে ভারসাম্য এনে দিতে ওয়াশিংটনের কাছে ভারত ছাড়া খুব বেশি বিকল্প নেই। বিশ্লেষকদের মতে, বিকল্প হিসেবে টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন উপকূল পর্যন্ত এলাকার ভৌগোলিক গুরুত্বও আলোচনার টেবিলে চলে আসছে।

দাওয়েই বন্দরের মাধ্যমে রাশিয়া, ক্যাউকফিউ ও কোকো দ্বীপের মাধ্যমে চীন এবং আন্দামান-বিশাখাপত্তনমের মাধ্যমে ভারতের শক্ত অবস্থান বঙ্গোপসাগরকে একটি বহুমাত্রিক সামরিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত করেছে। যদি কোনো সময় এই পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি উত্তাপ বা সংঘাত তৈরি হয়, তবে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে মাঝখানে অবস্থান করা বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডের নিরাপত্তার ওপর।

ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে—তা কেবল সামরিক শক্তি নয়, বরং সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করবে। আর যে শক্তির হাতে বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ থাকবে, দিনশেষে তারাই নির্ধারণ করবে পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)