রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

ড্রাগনের ডানায় ঢাকার আকাশ: J-10C চুক্তি কি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন ভারসাম্য রচনা করছে?

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১:২৯ পিএম
ড্রাগনের ডানায় ঢাকার আকাশ: J-10C চুক্তি কি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন ভারসাম্য রচনা করছে?

চীন থেকে ৪.৫ প্রজন্মের J-10C (বা রপ্তানি সংস্করণ J-10CE) বহুমুখী যুদ্ধবিমান ক্রয়ের চুক্তি চূড়ান্তকরণের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে। প্রায় ২০ থেকে ২৪টি উন্নত যুদ্ধবিমান ক্রয়ের খসড়া চুক্তি এবং এর আনুমানিক ২.৩ বিলিয়ন ডলারের বাজেট বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ইতিহাসে সর্ববৃহৎ আধুনিকায়ন প্রকল্প হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

তবে কেবল সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষায় এই পদক্ষেপের সময় ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে নতুন বিশ্লেষণ দেখা দিয়েছে।

বর্তমান আঞ্চলিক ও ভূ-রাজনৈতিক সংকট

১. বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত প্রতিযোগিতা: ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের ত্রিমুখী প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা চরম রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই বৃদ্ধি পেয়েছে।

২. মিয়ানমার সীমান্ত অস্থিরতা: রোহিঙ্গা সংকট এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরে অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ বাংলাদেশ সীমান্তের জন্য বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে। বারবার আকাশসীমা লঙ্ঘনের ঘটনায় একটি আধুনিক ও কার্যকর বিমানবাহিনীর অভাব অনুভূত হয়েছে।

৩. ভারতের পূর্ব সীমান্তে সমীকরণ: ভারতের নীতি-নির্ধারকদের একাংশ বাংলাদেশকে পূর্বে সামরিক ফোকাস হিসেবে দেখছেন। যদিও বাংলাদেশ ভারতের শত্রুভাবাপন্ন বা তৃতীয় ফ্রন্ট নয়, কিন্তু অঞ্চলে চীনা সামরিক প্রযুক্তির মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়াকে ভারতের সামরিক বিশ্লেষকরা ভিন্নমাত্রায় পর্যবেক্ষণ করছেন।

৪. বিশ্বজুড়ে আধুনিকায়নের ধারা: পাকিস্তান কর্তৃক J-10CE বিমান বহরে যুক্ত করা এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে নিজেদের সক্ষমতা পুনর্মূল্যায়ন করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্য এই আধুনিকায়নের গুরুত্ব বাংলাদেশ বিমানবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে পুরনো এবং তৃতীয় প্রজন্মের F-7 যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভরশীল। ৪.৫ প্রজন্মের J-10C-তে রয়েছে আধুনিক Active Electronically Scanned Array (AESA) রাডার, উন্নত ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম এবং Beyond Visual Range (BVR) ক্ষেপণাস্ত্র (যেমন PL-15) ব্যবহারের সক্ষমতা। এই যুদ্ধবিমান যুক্ত হলে বাংলাদেশের আকাশসীমা রক্ষা করার সক্ষমতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে এবং যেকোনো বহিরাগত হুমকি বা সীমান্ত লঙ্ঘনের বিপরীতে দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। অর্থনৈতিক চাপ: বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির ওপর দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের চুক্তি পরিচালনগত ব্যয় বাড়াবে, যা অন্যান্য প্রাথমিক সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারগুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা: যুক্তরাষ্ট্রের মতো পশ্চিমা দেশ এবং ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিকে সন্তুষ্ট রেখে একচেটিয়া চীনা সামরিক সরঞ্জামের ওপর নির্ভরশীল থাকাটা একটা সূক্ষ্ম কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের এই পদক্ষেপ কোনো নির্দিষ্ট প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসী কৌশল নয়; বরং এটি নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করার স্বাভাবিক আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া। ভারতের পূর্ব সীমান্তে এটিকে একটি ভূ-রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখা হলেও বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, আকাশ প্রতিরক্ষা সুসংহত করা এবং বঙ্গোপসাগরে আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রধান অংশীদার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরা।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)