ক্ষতবিক্ষত স্বদেশের নীরব আর্তনাদ: আমরা কি তবে নিঃশব্দেই নিঃশেষ হব?
একখণ্ড মানচিত্র, কোটি প্রাণের স্বপ্ন আর এক ফালি সবুজের বুকে ভর করে দাঁড়ানো আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। কিন্তু সেই জন্মভূমির হৃদপিণ্ড আজ বড় বেশি ক্লান্ত, বড় বেশি বিপন্ন। যে অর্থনীতি ছিল কোটি মানুষের পেটের ভাত আর ঘামের আশার প্রদীপ, তা আজ যেন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুর প্রহর গুনছে। অথচ তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষমতার লাল গালিচায় চলছে ভাগ-বাটোয়ারার উৎসব। চারপাশের রাজকীয় চেয়ারগুলো আজ আবারও ছেয়ে গেছে দলীয় চাটুকার আর নিজস্ব মানুষের ভিড়ে।
গত মাত্র ছয়টি মাসের হিসেব যেন এক একটা দীর্ঘশ্বাসের গল্প। ৬ মাসে বন্ধ হয়ে গেছে ৯৫টি চালু কারখানা। এক নিমেষে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন অন্তত ৬২ হাজার ঘামঝরা মানুষ। যে হাতের ওপর ভর দিয়ে সংসার চলত, যে চোখে ছিল সন্তানকে মানুষ করার স্বপ্ন—সেসব চোখ আজ শুধুই অন্ধকারের মুখোমুখি। সিপিডি (CPD)-র সমীক্ষা বলছে, অর্থনীতির ৩১টি মূল সূচকের মধ্যে ১৯টিই নিমজ্জমান। এটি কেবল পরিসংখ্যানের শুষ্ক সংখ্যা নয়, এটি দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন হাহাকার। বাজার থেকে যখন খালি হাতে ঘরে ফিরতে হয়, যখন সংসারের খরচ সামলাতে মা-বাবার চোখে অশ্রু জমে—তখন স্পষ্ট বোঝা যায়, দেশের অর্থনীতি আজ সত্যি কত বড় হাসপাতালে বন্দি।
রাজস্ব আদায়ের ঘর শূন্য, ব্যাংক ঋণের বোঝা আকাশচুম্বী, বৈশ্বিক বিনিয়োগের দরজা প্রায় রুদ্ধ এবং শিল্প উৎপাদনের চাকা থমকে দাঁড়িয়েছে। উন্নয়নের যে স্বপ্ন দেখে মানুষ বাঁচে, সেই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (ADP) আজ স্তব্ধ। কিন্তু সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই তীব্র সংকটের মাঝেও ক্ষমতার অলিন্দে চলছে আমলাতন্ত্রের নগ্ন দলীয়করণ। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সতর্কবার্তা আমাদের সেই পুরনো আঁধারেই ফিরিয়ে নিয়ে যায়—যেখানে যোগ্যতার চেয়ে দলের প্রতি আনুগত্যই হয়ে ওঠে পদায়নের একমাত্র মাপকাঠি।
আমাদের স্মৃতিতে আজও স্পষ্ট ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সেই ইতিহাস। ব্যাংক লুটের উৎসব, রাজস্ব ফাঁকির সাম্রাজ্য আর শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সেই দুঃস্বপ্ন যেন ২০২৬ সালে এসে ফের নতুন মোড়কে ফিরে এসেছে। কিন্তু আফসোস! আগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার সাহস ছিল, প্রতিবাদী কণ্ঠ ছিল। আর আজ সবাই চোখের সামনে নিজের সর্বস্ব হারিয়ে যেতে দেখেও যেন এক অদ্ভুত নিথর নীরবতায় আচ্ছন্ন! আজও কি আমরা চুপ করে থাকব? চোখ, কান আর বিবেক বন্ধ করে রাখলে কালকের সকালটি হয়তো আরও নির্মম কোনো দুঃসংবাদ নিয়ে আসবে। পরবর্তী পরিসংখ্যানে এই হাহাকারের সংখ্যাটা যখন দ্বিগুণ হবে, তখন কিন্তু চোখের জল ফেলার মতো মাটিটুকুও আমরা আর পাব না। তাই এখনই সময়—নিদ্রা ভাঙার, মুখ খোলার এবং স্বদেশের এই রক্তক্ষরণ রোধে সত্যের পক্ষে সজাগ হওয়ার।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
ড্রাগনের ডানায় ঢাকার আকাশ: J-10C চুক্তি কি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন ভারসাম্য রচনা করছে?
সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন নাকি ফৌজদারি অপরাধ: তিন বাংলাদেশি সাংবাদিককে কারাবাস, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সংবাদমাধ্যমের উদ্বেগ
বাংলাদেশে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ জঙ্গি অবাধে ঘোরাফেরার অভিযোগ: ভারতীয় গোয়েন্দাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ