মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

জ্বালানি খাতে 'আমদানি-নির্ভরতা'র অপপ্রচার: বাস্তবতার নিরিখে কড়া প্রতিক্রিয়া

লিখেছেন: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন। প্রকাশিত: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:৩৬ পিএম
জ্বালানি খাতে 'আমদানি-নির্ভরতা'র অপপ্রচার: বাস্তবতার নিরিখে কড়া প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশের পাঁচবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জ্বালানি নীতির উল্লেখ করে বলা যায়, বিগত সরকারের আমলে দেশকে জ্বালানি খাতে ইচ্ছাকৃতভাবে আমদানি-নির্ভর করে তোলা হয়েছে—এমন দাবি ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার। সে সময়ে, দেশীয় উৎস থেকে অনুসন্ধান ও উত্তোলন বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়তি চাহিদা মেটাতে আগাম সময়োপযোগী অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, যা কোনোভাবেই 'আমদানি-নির্ভরতা' নয়, বরং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ।

রেকর্ড কূপ খনন ও নতুন ৬টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার

বিগত দেড় দশকে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেই অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলা করা হয়েছিল। ২০০৯ সালের শুরুতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলন হতো দৈনিক মাত্র ১,৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট (MMcfd), আর তখন আমদানির পরিমাণ ছিল শূন্য। পরবর্তীতে প্রায় ১৫৫টি কূপ খনন এবং ৬টি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করা হয়। এর ফলে নিট ১,০০০ MMcfd-এর বেশি গ্যাস উৎপাদন জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়, যা ২০২০ সাল নাগাদ দৈনিক ২,৭৫০ MMcfd ছাড়িয়ে যায়।

শিল্পায়নের গতি ও কৌশলগত প্রয়োজনে এলএনজি অবকাঠামো

একটি দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির মোট চাহিদা কেবল দেশীয় গ্যাস দিয়ে মেটানো বাস্তবে সম্ভব নয়। দেশের অভাবনীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও শক্তির চাহিদা পূরণে ১,০০০ MMcfd সক্ষমতার এলএনজি (LNG) অবকাঠামো নির্মাণ করা ছিল সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। কয়লার মতো সাধারণ জ্বালানির বিপরীতে এলএনজি গ্রহণ, সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণের বিশেষায়িত টার্মিনাল তৈরিতে বিপুল সময় ও অর্থের প্রয়োজন হয়। সময়ের আগে এই অবকাঠামো গড়ে না তুললে জাতীয় গ্যাস সংকট বড় ধরনের বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারত।

প্রাকৃতিক ক্ষয় বনাম দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধান ব্যবস্থা বিজ্ঞানসম্মত সত্য হলো, যেকোনো তেল-গ্যাসক্ষেত্র থেকে দীর্ঘদিন সরবরাহের পর স্বাভাবিকভাবেই এর উৎপাদন কমে আসে। পুরোনো কূপের ক্ষয়পূরণ এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে তা থেকে বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহ শুরু করার মধ্যবর্তী সময়টি বেশ দীর্ঘ। ফলস্বরূপ, জাতীয় অর্থনৈতিক চাকা এবং শিল্পকারখানা সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস নিশ্চিত করার কৌশল হিসেবে আমদানির বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, যা যেকোনো আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য বাস্তবমুখী নীতি।

কায়েমি মহলের অপপ্রচার ও মূল বাস্তবতা

কেবল এলএনজি আমদানির অবকাঠামো তৈরিকে কেন্দ্র করে পুরো নীতিকে 'আমদানি-নির্ভরতা' হিসেবে চিহ্নিত করা অসম্পূর্ণ পর্যালোচনার শামিল। গ্যাস পরিস্থিতির সঠিক চিত্র বুঝতে হলে কেবল 'আমদানি' শব্দের ওপর ভিত্তি না করে জাতীয় অর্থনীতির দ্রুত বৃদ্ধি, পুরোনো খনির প্রাকৃতিক ক্ষয়, নতুন অনুসন্ধানের সুফল এবং আধুনিক এলএনজি অবকাঠামোর সামগ্রিক হিসাব বিবেচনা করা প্রয়োজন। দেশীয় উত্তোলন সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাড়তি ঘাটতি পূরণের সুনির্দিষ্ট উদ্যোগগুলোই এখানে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে।

লেখক: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন।