সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

আন্তর্জাতিক

ট্রাম্পের ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স ফোর্স’: মার্কিন প্রশাসনের এআই নীতিতে নতুন ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত মোড়

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৫ অক্টোবর ২০২৬, ৪:১১ পিএম
ট্রাম্পের ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স ফোর্স’: মার্কিন প্রশাসনের এআই নীতিতে নতুন ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত মোড়

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা বর্তমান যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রযুক্তি খাতের নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্ব বজায় রাখতে হোয়াইট হাউস নিয়েছে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারি পর্যায়ে এআই-এর নামকরণ পরিবর্তনের পাশাপাশি গঠন করেছেন ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স ফোর্স’ (SIF)।

প্রযুক্তি জগতের এই নতুন রূপান্তর কেবল শব্দচয়নের পরিবর্তন নয়, বরং বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখার এক সুদূরপ্রসারী কৌশল।

১. ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স ফোর্স’ (SIF) আসলে কী এবং এর নেপথ্যে কারা?

প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ এবং এর সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো তদারক করতে ট্রাম্প প্রশাসন যে বিশেষ টাস্কফোর্সটি গঠন করেছে, তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স ফোর্স’ (এসআইএফ)। জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক (DNI) জে ক্লেটনকে এর প্রধান বা প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই টাস্কফোর্সের মূল কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

• উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্ব:

• ফেডারেল ট্রেড কমিশনের চেয়ারম্যান অ্যান্ড্রু ফার্গুসন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গবেষণা ও প্রকৌশলবিষয়ক আন্ডারসেক্রেটারি এমিল মাইকেল এবং অফিস অব পারসোনেল ম্যানেজমেন্টের পরিচালক স্কট কুপার এর ভাইস-চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া এই কমিটিতে ভিআইপি পর্যায়ে অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।

• সরাসরি হোয়াইট হাউসের তদারকি:

• টাস্কফোর্সটি সরাসরি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলসের কাছে তাদের প্রতিবেদন ও কার্যক্রম জমা দেবে।

• বহুমাত্রিক সমন্বয়:

• ভোক্তা অধিকার, জনস্বার্থ সংস্থা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, এবং গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকারি নীতিমালার সমন্বয় সাধন করবে এই বাহিনী।

২. কেন এই আকস্মিক পরিবর্তন: ‘এআই’ থেকে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ (SI)?

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সরকারি নথিপত্র, ওয়েবসাইট এবং আনুষ্ঠানিক যোগাযোগে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা ‘এআই’ শব্দের ব্যবহার বাদ দিয়ে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ বা ‘এসআই’ ব্যবহারের যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা বিশ্বজুড়ে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

শব্দগত আপত্তি ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি: ট্রাম্পের মতে, ‘আর্টিফিশিয়াল’ বা কৃত্রিম শব্দটি প্রযুক্তিটিকে একধরনের ‘নকল’ বা ল্যাবরেটরির খেলনা হিসেবে প্রতিপন্ন করে, যা এর বাস্তব ও অপরিসীম শক্তির প্রকৃত মূল্যায়ন নয়। তাঁর মতে, এই প্রযুক্তি শুধু কৃত্রিম নয়, এটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

শিল্প বিপ্লবের চেয়েও বড় বিপ্লব: ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে, বর্তমান যুগের এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা ইন্টারনেট বা বিগত যেকোনো শিল্প বিপ্লবের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ও গতিশীল।

টেক জায়ান্টদের প্রতিক্রিয়া: প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কসহ অনেকে ট্রাম্পের এই নতুন পরিভাষাকে সমর্থন জানিয়েছেন। মাস্ক তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘স্পেসএক্সএআই’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেসএক্সএসআই’ করার ঘোষণা দিয়ে একে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

৩. কৌশলগত ও জাতীয় নিরাপত্তার অগ্রাধিকার জে ক্লেটনকে এই বাহিনীর প্রধান করার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন বুঝিয়ে দিয়েছে যে, এআই খাতের উন্নয়নকে কেবল বাণিজ্যিক বা প্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং একে জাতীয় নিরাপত্তা ও সাইবার সিকিউরিটির একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

• শ্বিক প্রতিযোগিতা: যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে চায় না। ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, অতিরিক্ত ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ বা রেগুলেশনের নামে মার্কিন শিল্প খাতের গতি রোধ করা হবে না, যাতে বৈশ্বিক বাজারে বিশেষ করে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মার্কিন কোম্পানিগুলো পিছিয়ে পড়ে।

• ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা পর্যালোচনা: আগামী ১২০ দিনের মধ্যে এই টাস্কফোর্স বর্তমান সরকারি ব্যবস্থাগুলোর নিরাপত্তা ত্রুটি, সাইবার হামলা বা হ্যাকিং প্রতিরোধের উপায় এবং ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা তৈরি করবে।

৪. বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন ও ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি

সমালোচকরা নাম পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্তকে কিছুটা বিভ্রান্তিকর মনে করলেও, ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এটি মার্কিন নীতি নির্ধারণে একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক শিফট। যুক্তরাষ্ট্র এআই খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এবং একে সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ছাতার নিচে নিয়ে আসতে যে আক্রমণাত্মক ও সুসংগঠিত কৌশল গ্রহণ করেছে, ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স ফোর্স’ তারই বহিঃপ্রকাশ। আগামী দিনে বৈশ্বিক প্রযুক্তি কূটনীতি এবং বাণিজ্যিক বাজারে এই সিদ্ধান্ত এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: