মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

রাজনীতির রাজত্বে জিম্মি জনজীবন: আগ্নেয়াস্ত্রের আধিপত্যে অতিষ্ঠ মানুষ। আগস্টেই ৫৫ নারী-শিশু হত্যা ও ৫৪ ধর্ষণ, নিরাপত্তাহীনতার চূড়ান্তে দেশ

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪০ এএম
রাজনীতির রাজত্বে জিম্মি জনজীবন: আগ্নেয়াস্ত্রের আধিপত্যে অতিষ্ঠ মানুষ। আগস্টেই ৫৫ নারী-শিশু হত্যা ও ৫৪ ধর্ষণ, নিরাপত্তাহীনতার চূড়ান্তে দেশ

রাজনীতির মাঠে যখন বুলি ওঠে সংস্কার আর নীতির, ঠিক তখনই রাজপথ ও অলিগলি ভেসে যায় সাধারণ মানুষের রক্তে। দিনদুপুরে চায়ের দোকানে বসে থাকা নিরপরাধ মানুষের গায়ে বিঁধছে গুলি। অথচ যে ক্ষমতার মসনদে বসে থাকা দলগুলোর হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব, তাদেরই ক্যাডার ও কর্মীদের হাতে উঠেছে রাজপথ কাঁপানো আগ্নেয়াস্ত্র। ক্ষমতার বদল ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার চিত্র বদলায়নি একটুও। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সেই চেনা রক্তক্ষয়ী চিত্রনাট্য যেন নতুন মোড়কে ফিরে এসেছে আজ।

মিরপুরে রক্তের খেলা ও আধিপত্যের রাজনীতি রাজধানীর মিরপুরের অলিগলিতে আজ রাজনীতির নাম আতঙ্কের সমার্থক। বড় বড় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। তথাকথিত সংস্কার আর নীতির বুলি আওড়ে ক্ষমতায় আসীন ও সংসদে বসা রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠপর্যায়ের কর্মীরা আজ মেতেছে ক্ষমতার কাড়াকাড়িতে। গোসলখানা বানানো, কাঁচাবাজারের ইজারা কিংবা সিএনজি স্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ—অজুহাত যাই হোক না কেন, পকেট থেকে পিস্তল বের হতে এক মুহূর্তও দেরি হচ্ছে না।

বিগত সাত মাসেরও কম সময়ে কেবল রাজধানী ঢাকাতেই ঘটেছে শতাধিক গুলির ঘটনা, ঝরে গেছে ডজন ডজন তরকাঁচা প্রাণ। চাঁদাবাজির বখরা ভাগাভাগি আর এলাকা দখলের এই নোংরা খেলায় ভুক্তভোগী শুধুই নিরীহ পথচারী ও আমজনতা। যাদের ছত্রছায়ায় এসব অস্ত্রবাজি ঘটছে, তারা রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ক্ষমতার এই লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের না আছে কোনো ভূমিকা, না আছে কোনো নিরাপত্তা; তাদের একমাত্র লক্ষ্য এখন কেবল কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকা।

সহিংসতার নতুন শিকার: আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে নারী ও শিশু নির্যাতন একদিকে রাজনৈতিক অরাজকতা ও আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়া, অন্যদিকে সমাজ জুড়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে নারী ও শিশুদের প্রতি নির্মম সহিংসতা। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুধু আগস্ট মাসেই ২৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন অন্তত আটজন নারী ও শিশু সহিংসতার মুখে পড়েছে।

১৫টি জাতীয় দৈনিক ও ২টি অনলাইন পোর্টালের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি এই চিত্রে দেখা যায়, আগস্টে হত্যা করা হয়েছে ৫৫ জনকে, যার মধ্যে ১০ জন কন্যাশিশু ও ৪৫ জন নারী। একই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৫৪ জন, যার মধ্যে ৩৬ জনই শিশু। আটজন শিশুসহ ১৩ জন শিকার হয়েছেন ভয়াবহ দলবদ্ধ ধর্ষণের, আর ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে দুজনকে।

সামাজিক অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাহীনতার চূড়ান্ত রূপ শুধু হত্যা বা ধর্ষণেই থেমে নেই এই অপরাধের মিছিল। আগস্ট মাসে ২৪ জন কন্যাশিশুসহ মোট ৩০ জন নারী যৌন সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন। এর মধ্যে সাইবার অপরাধের শিকার ৪ শিশুসহ ৭ জন, আর যৌন নিপীড়ন ও উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছে আরও ২৩ জন। এছাড়া পারিবারিক নির্যাতন, বাল্যবিয়ে, অগ্নিদগ্ধ করা, অপহরণ এবং গৃহকর্মী নির্যাতনের মতো ঘটনা সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে এক গভীর অন্ধকার গলির দিকে।

রাজনীতির মারপ্যাঁচ আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই চরম অবনতি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের জীবন আজ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত নয়। রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার আর বখরাবাজির অস্ত্রের মুখে যেমন নিরীহ নাগরিকের জীবন বিপন্ন, তেমনি ঘরের ভেতরে ও বাইরে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে দেশের নারী ও শিশুরা। অবিলম্বে এই রাজনৈতিক অস্ত্রবাজি বন্ধ এবং নারী-শিশু নির্যাতনকারীদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি না করলে, সাম্য ও ন্যায়ের সমাজ গড়ার স্বপ্ন শুধুই খাতায়-কলমে রয়ে যাবে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)