মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

আজ We Don't Care, কাল প্রত্যাবর্তন

লিখেছেন: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯:০৯ পিএম
আজ We Don't Care, কাল প্রত্যাবর্তন

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এমন দিন বহুবার এসেছে, যখন মনে হয়েছে আওয়ামী লীগ বুঝি শেষ। এমন সময়ও এসেছে, যখন দলটির নেতাকর্মীদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর হয়েছে, নেতাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে, নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার সর্বোচ্চ চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই ইতিহাস অন্য কথা বলেছে।

আজ যারা মনে করছেন আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়ে আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে মুছে ফেলা যাবে, তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পড়েননি, অথবা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে চান না।

আজকের এই রায় আওয়ামী লীগের জন্য শেষ নয়। বরং এটি আরো একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের শুরু।

আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে এই রায় তাই শুধু কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় নয়; এটি তাদের কাছে একটি রাজনৈতিক সংগ্রামের নতুন প্রতীক। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ভাষায়, ‘I don't care’। আজ আওয়ামী লীগের লাখো-কোটি নেতাকর্মীর কণ্ঠে সেই একই প্রত্যয়; We Don't Care. কারণ আওয়ামী লীগ ভয় পেয়ে রাজনীতি শেখেনি।

ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখতে পাবেন আওয়ামী লীগ বারবার নিষেধাজ্ঞাকে পরাজিত করেই রাজনীতিতে বীরদর্পে ফিরেছে। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারির পর রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করলে আওয়ামী লীগও এর আওতায় পড়ে। পরে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সুযোগে দলটি আবার সংগঠিত হয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু সুমহান মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই দেশ স্বাধীনতা অর্জন। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনাও করে আওয়ামী লীগ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগ আবারও কঠিন রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার, গৃহবন্দি ও ৩ নভেম্বর কারাগারে জাতীয় চার নেতা হত্যার ঘটনায় দলটির সাংগঠনিক কাঠামো বিপর্যস্ত হয়। পরে ১৯৭৬ সালে রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধনের সুযোগ তৈরি হলে আওয়ামী লীগ নতুন করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দৃশ্যমান হয়। ১৯৮২ সালে এরশাদের সামরিক শাসন জারির পরও আওয়ামী লীগসহ রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও সীমিত করা হয়। পরে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলটি আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে আমাদের দলের প্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই স্বেরাচারের পতন হয়েছিল।

ওয়ান ইলেভেনের সময় বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে মাইনাস করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। তখনও ইউনূস ফখরুদ্দিন-মইনউদ্দিনের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। সেই পরাজয়ের শোধ নিতেই চব্বিশে ষড়যন্ত্র করে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের ম্যাটিকুলাস ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারকে জোর করে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। জুলাই-আগস্টের ষড়যন্ত্রকে পুঁজি করে ক্ষমতায় এসেছিল ইউনূস গং। তারই ধারাবাহিতা ধরে রেখেছে তারেক রহমানের বিএনপি। ইতিমধ্যেই বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে ব্যবহার করে যাকে আমরা ক্যাঙ্গারু কোর্ট বলি, সেখানে তামাশার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া হয়েছে। আরো দেয়া হবে, তাতেও আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মীরা বিন্দুমাত্র বিচলিত নয়।

বরং অসীম সাহস নিয়ে লড়াই করে টিকে রয়েছে, শুধু সময়ের অপেক্ষায়। ডিসেম্বরে আমাদের নেত্রী বাংলাদেশে ফিরবেন, এটাই সত্যি। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত হবে।

আজকে তারেক রহমানের ক্যাঙ্গারু কোর্ট জননেতা ওবায়দুল কাদেরসহ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য জননেতা কৃষিবিদ আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে।

কিন্তু আপনারা হয়তো অনেকেই জানেন না, জননেতা কৃষিবিদ আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম একজন মৃত্যুঞ্জয়ী মানুষ। ওয়ান-ইলেভেনের সময় তাকে গ্রেপ্তার করে অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। তবুও তিনি ফিরেছেন বীরদর্পে এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন । তার হাত ধরেই আরো দুইটি সহযোগী সংগঠন কৃষকলীগ এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগের কার্যক্রম গতিশীল হয়। সারাদেশে একজন আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম নিজের যোগ্যতায় হাজার হাজার নেতাকর্মী তৈরি করেছেন। এমন একজন জননেতাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়ে থামিয়ে রাখা যাবে না। কারণ তিনি মৃত্যুকে ভয় পান না। বঙ্গবন্ধু কন্যার হাতকে শক্তিশালী করতে জননেতা আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন বলেই বিশ্বাস করি।

ইতিহাসই বলে দেয়; একটি রাজনৈতিক দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা, মামলা, গ্রেপ্তার কিংবা রাজনৈতিক প্রতিকূলতা তৈরি করলেই সেই দলের অস্তিত্ব মুছে যায় না। আর দলটির নাম যদি আওয়ামী লীগ হয়; তাহলে তো কথাই নেই। কারণ আওয়ামী লীগ বারবার ফিরে এসেছে। বাংলার মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন করার জন্যই ফিরেছে।

২০২৪ এর আগস্টের পর দুই বছরের বেশি সময় ধরে দেশের সাধারণ মানুষ একটা কথাই বলছেন, তারা জননেত্রী শেখ হাসিনার আমলেই ভালো ছিলেন, আবারো শেখ হাসিনাকেই ক্ষমতায় দেখতে চান। দেশের সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়েই বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আবারও ক্ষমতায় আসবেন-এটাই সত্যি এবং রাজনৈতিক সমীকরণ। তাই আমাদের দলের নেতাকর্মীদের একটা কথাই বলবো, হতাশ হওয়ার কিছু নেই।

আমাদের শ্রদ্ধেয় সাধারণ সম্পাদক জননেতা ওবায়াদুল কাদের তো আজই বলেছেন, ভয়ের কিছু নেই। ডিসেম্বর আর বেশি দূরে নয়। আমিও তার সাথে একমত। আমরা ডিসেম্বরে ফিরবোই। তাই পরিশেষে বলতে চাই, ক্যাঙ্গারু কোর্টের এই রায় মানে We Don't Care। ডিসেম্বরে হবে প্রত্যাবর্তন।

লেখক: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন।