ডি-ডলারাইজেশন নয়, প্রযুক্তিগত সংস্কার: BRICS-এ ভারতের বাস্তবমুখী কৌশল। বৈশ্বিক লেনদেনে এক নতুন দিগন্ত: লেনদেন সহজ করতেই ভারতের ঐতিহাসিক সিবিডিসি (CBDC) উদ্যোগ
আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র প্রভাব এবং এর বিকল্প খোঁজার প্রক্রিয়াটি সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। প্রতি বছর BRICS সম্মেলনের পূর্বে বিশ্ব অর্থনৈতিক সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদের মূল নজর থাকে কীভাবে এই উদীয়মান জোটটি ডলারের প্রভাব মোকাবিলা করবে। তবে ২০২৬ সালের BRICS সম্মেলনের আয়োজক হিসেবে ভারত ডলার-বিরোধী কোনো অন্ধ অবস্থান না নিয়ে সম্পূর্ণ এক বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী কৌশল গ্রহণ করেছে। ভারতের উদ্দেশ্য স্পষ্ট—কোনো বিশেষ মুদ্রাকে প্রতিস্থাপন করা নয়, বরং ডিজিটাল ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে বিশ্ব পেমেন্ট কাঠামোর সংস্কার সাধন।
ডি-ডলারাইজেশন ও ভারতের কৌশলগত অবস্থান
BRICS-এর প্রধান দুই শরিক দেশ চীন ও রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডি-ডলারাইজেশন বা ডলারের ব্যবহার কমানোর পক্ষে সোচ্চার। অর্থনৈতিক অবরোধ ও স্যাংশন এড়াতে মস্কো এবং বেইজিং নিজস্ব মুদ্রা এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য কাঠামোর জোরদার প্রসারে ব্যস্ত। ব্রাজিলও সম্প্রতি এই ধারায় যোগ দিয়ে BRICS-এর জন্য একক মুদ্রা তৈরির প্রস্তাব তুলেছে।
তবে ভারত নিজের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের বিষয়টি মাথায় রেখে একেবারেই আলাদা নীতি গ্রহণ করেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর একাধিক ফোরামে বিষয়টি পরিষ্কার করে জানিয়েছেন যে, মার্কিন ডলারের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হলেও, ডলারকে দুর্বল করা বা প্রতিস্থাপন করা ভারতের কোনো উদ্দেশ্য নয়। ভারতের এই অবস্থান বিশ্ব কূটনীতিতে তার নিরপেক্ষ ও স্বাধীন অর্থনৈতিক চিন্তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
লেনদেন সহজীকরণে RBI-এর সিবিডিসি (CBDC) প্রস্তাব
সরাসরি ডলারের বিরোধিতা না করে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (RBI), বাণিজ্য সহজীকরণে ডিজিটাল পরিকাঠামো ব্যবহারের একটি যুগান্তকারী দিকনির্দেশনা প্রস্তুত করেছে। ২০২৬ সম্মেলনের এজেন্ডায় রাখার জন্য প্রস্তুত করা এই প্রস্তাবে BRICS সদস্য দেশগুলোর সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি (CBDC) বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রাসমূহকে একটি অভিন্ন নেটওয়ার্কে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে তা বৈশ্বিক পেমেন্ট ইতিহাসে এক বিরাট পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত করবে। এর প্রধান উপকারিতাগুলো হলো:
• ব্যয় ও সময় হ্রাস: বর্তমানের ঐতিহ্যবাহী ‘সুইফট’ (SWIFT) বা করসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থার দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও উচ্চ ফি এড়িয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট সম্পন্ন হবে। • পর্যটন ও বাণিজ্যের প্রসার: সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের নিজস্ব ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহার করে দ্রুত সেবা ও পণ্য ক্রয় করার সুযোগ তৈরি হবে। • স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা: ব্লকচেইন ও সুরক্ষিত ডিজিটাল পেমেন্ট প্রযুক্তি লেনদেনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করবে।
বাস্তবায়নের প্রযুক্তিগত ও নীতিগত বাধা
ভারতের প্রস্তাবটি যুগান্তকারী হলেও এটি বাস্তবায়নে বেশ কিছু জটিল প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে:
১. প্রযুক্তির ভিন্নতা: BRICS-এর প্রতিটি দেশের ডিজিটাল মুদ্রা প্রযুক্তির মান ও অবকাঠামো ভিন্ন। এগুলোকে একটি প্লাটফর্মে ইন্টারঅপারেবল বা পারস্পরিক ব্যবহারযোগ্য করা অত্যন্ত জটিল। ২. নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও আইন: প্রতিটি দেশের মুদ্রানীতি, ডেটা গোপনীয়তা আইন এবং ক্যাপিটাল কন্ট্রোল ব্যবস্থা ভিন্ন। সর্বসম্মত নিয়ম ছাড়া এমন সমন্বিত ব্যবস্থা কার্যকর করা কঠিন। ৩. বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা: BRICS জোটের ভেতরে ভারতের প্রধান সমস্যা হলো বড় ধরনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঘাটতি। চীনসহ জোটের বাকি দেশগুলোর সাথে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ইতোমধ্যেই ২২৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যদি দেশগুলো ডিজিটাল স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বৃদ্ধি করে, তবে ভারতের হাতে এমন কিছু দেশের বিপুল পরিমাণের মুদ্রা জমা হবে যা বিশ্ববাজারে সহজেই রূপান্তরযোগ্য নয় (যা পূর্বে রাশিয়ার সাথে রুপি-রুবেল বাণিজ্যে ঘটেছিল)।
বাস্তবসম্মত সমাধান: কারেন্সি সোয়াপ ও বিকল্প পথ
অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মুদ্রাসংক্রান্ত ঝুঁকি কমানোর জন্য ডলার বর্জনই একমাত্র উপায় হতে পারে না। রিজার্ভ ব্যাংকের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ লেনদেন কাঠামো গড়তে নিচের বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন:
• কারেন্সি সোয়াপ লাইন: সদস্য দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে পর্যাপ্ত কারেন্সি সোয়াপ সুবিধা তৈরি রাখা, যাতে তারল্য সংকটে আপদকালীন মুদ্রা সরবরাহ সহজ হয়। • ইউনিফর্ম সেটেলমেন্ট স্ট্যান্ডার্ড: একাধিক মুদ্রায় লেনদেনের হিসাব মেলানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য গাণিতিক পদ্ধতি তৈরি করা। • উদ্বৃত্ত মুদ্রা ব্যবস্থাপনার নীতি: বাণিজ্য ঘাটতির ফলে কোনো একটি দেশের হাতে অতিরিক্ত স্থানীয় মুদ্রা জমে গেলে তা পুনরায় অন্য কোনো খাতে বিনিয়োগ বা রূপান্তরের সুনির্দিষ্ট পথ রাখা।
ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কূটনীতির বার্তা
২০২৬-এর BRICS সম্মেলনে ভারতের ভূমিকা মূলত এক বাস্তবমুখী বিশ্বনেতার, যিনি অযথা রাজনৈতিক সস্তা জনপ্রিয়তা না খুঁজে কার্যকর অর্থনৈতিক সমাধানের দিকে মনোনিবেশ করেছেন। ভারত একটি নতুন ‘BRICS মুদ্রা’ চালু করে বাজারে অপ্রয়োজনীয় অস্থিরতা তৈরি করতে চায় না।
ভারতের মূল অগ্রাধিকার হলো লেনদেনের ডিজিটাল পেমেন্ট পাইপলাইনকে আরও আধুনিক, দ্রুত ও সাশ্রয়ী করা। ভারত বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করেছে যে, কোনো বড় অর্থনৈতিক পরাশক্তিকে সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড় না করিয়েও প্রযুক্তির শক্তিতে বৈশ্বিক লেনদেন ব্যবস্থার নতুন রূপরেখা তৈরি করা সম্ভব।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের জয়জয়কার, মোদির আমন্ত্রণ প্রত্যাখানের পর এবার সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টায় বাংলাদেশ
দেউলিয়া বিদ্যুৎ খাত, অন্ধকার জীবন: তারেক-ইউনূস-ফাওজুলের চক্রান্তে জনজীবনের চরম দুর্যোগ
পিঠে দেওয়াল, অস্তিত্বের চরম সংকট: আর কত রক্ত দিলে জাগবে বিবেক? রাষ্ট্রযন্ত্রের নীরবতা নাকি প্রশ্রয়? বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নিধনের ভয়াবহ বাস্তবচিত্র