শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

মতামত

বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর দমন-পীড়ন ও হামলা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

লিখেছেন: অশ্রু হাশি প্রকাশিত: ৩০ জুলাই ২০২৬, ১০:০৬ এএম
বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর দমন-পীড়ন ও হামলা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

নিউইয়র্ক, ৩ ডিসেম্বর ২০২৪: ড. ইউনূস বাংলাদেশের নেতৃত্ব গ্রহণের পর প্রকাশ্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা এবং জনগণের ইচ্ছাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তাঁর প্রশাসন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে। বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং ভিন্নমত দমন করার উদ্দেশ্যে বাছাই করা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে—এমন উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ বর্তমানে ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে। দলটির ব্যাপক জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও এর নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে প্রশ্নবিদ্ধ অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিচারব্যবস্থাও প্রবল রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, স্বাধীন আইনি প্রক্রিয়ার পরিবর্তে সরকারপন্থী রাজনৈতিক শক্তি—বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবেই অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ফলে অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তি ন্যায্য বিচার ও আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। গ্রেপ্তারের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও সম্পত্তিও ধ্বংসের মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগসহ সহিংস হামলার ঘটনায় প্রাণহানির খবরও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এসব ঘটনার পরও পুলিশি সহায়তা চাইলে অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা কোনো সহযোগিতা পাচ্ছেন না, ফলে ন্যায়বিচারের পথ তাদের জন্য প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি সমানভাবে উদ্বেগজনক। যারা সত্য তুলে ধরতে বা সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের চেষ্টা করছেন, তারা ক্রমবর্ধমান হুমকি ও হামলার মুখে পড়ছেন। অনেক সাংবাদিক শারীরিকভাবে নির্যাতিত, গ্রেপ্তার কিংবা সংবাদ প্রকাশে আত্মনিয়ন্ত্রণে বাধ্য হওয়ার মতো চাপের শিকার হচ্ছেন। ড. ইউনূসের প্রশাসনের সময় সাংবাদিকদের সামনে যে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো দেখা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে— • ১৫৪ জন সাংবাদিককে মিথ্যা হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে। • ৭১ টিভির চেয়ারম্যান ও সিইও মোজাম্মেল বাবু, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক ভোরের কাগজ-এর সম্পাদক শ্যামল দত্ত, শাকিল আহমেদ এবং ৭১ টিভির হেড অব নিউজ ও বিশেষ প্রতিনিধি ফারজানা রূপাসহ ১২ জন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। • ১৬৮ জন সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে। • ৭৭ জন সাংবাদিক জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্যপদ হারিয়েছেন। • ২৪ জন সাংবাদিককে বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। • গত কয়েক মাসে ৩ জন নারীসহ ২১ জন সাংবাদিক শারীরিক হামলার শিকার হয়েছেন। • ৩২ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কথিত গণহত্যার মনগড়া অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব সরাসরি হামলার পাশাপাশি সাংবাদিকদের ওপর শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের জন্যও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। এই ক্রমবর্ধমান দমন-পীড়ন দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক নেতা ও সাংবাদিকদের কণ্ঠস্বর ক্রমশ স্তব্ধ হয়ে পড়ায়, অনেকের আশঙ্কা—জনগণের ইচ্ছাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতি এখন সরকার ও তাদের মিত্র বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর মাধ্যমে ভিন্নমত দমনের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি এক বিবৃতিতে দেশের শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক ও বিশিষ্ট সাংবাদিক মাহফুজ আনাম বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর বাড়তে থাকা দমন-পীড়ন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সাংবাদিকতা জীবনের ৫৩ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি কখনোই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এত বেশি মিথ্যা মামলা, অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল এবং নানা ধরনের হয়রানির ঘটনা একসঙ্গে দেখেননি। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দীর্ঘদিনের সমর্থক মাহফুজ আনাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি গণমাধ্যমের জন্য অত্যন্ত বৈরী, যা তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে দেখা তুলনামূলক উন্মুক্ত পরিবেশের সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁর মতে, এসব পদক্ষেপ গণতান্ত্রিক সমাজে ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের মৌলিক ভূমিকা দুর্বল করে দিচ্ছে। এমন এক সময়ে তাঁর এই মন্তব্য এসেছে, যখন বাংলাদেশের বহু সাংবাদিক তাদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, ভিন্নমত দমনে কর্তৃপক্ষ প্রায়ই আইনি ও বিচারবহির্ভূত উভয় ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। মাহফুজ আনামের বক্তব্য বাংলাদেশের গণমাধ্যমকর্মী ও নাগরিক সমাজের মধ্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়া নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের প্রতিফলন। প্রবীণ এই সাংবাদিক সরকারকে সাংবাদিকদের অধিকার নিশ্চিত করার এবং প্রতিশোধের ভয় ছাড়াই গণমাধ্যমকে তাদের অপরিহার্য দায়িত্ব পালন করার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এই অনিশ্চিত সরকারের ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগ করা। তাদের মতে, বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এমন আন্তর্জাতিক উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: অশ্রু হাশি, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

সম্পাদকের নোট: ২০২৪ এর আগস্ট এ জঙ্গি হামলার পর, সেই অন্ধকার সময়ে, আন্তর্জাতিক ভাবে প্রথম এই লেখাটি, ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর, নিউইয়র্ক প্রকাশিত হয়েছিল। সংরক্ষণ ও আর্কাইভ এর প্রয়োজনে লেখাটি পুন মুদ্রিত হল।- প্রধান সম্পাদক দা সোর্স নিউজ বাংলা।