শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

দিল্লির আরশোলা আন্দোলন কোন পথে?

লিখেছেন: অমিত গোস্বামী প্রকাশিত: ২১ জুলাই ২০২৬, ৮:৫৭ পিএম
দিল্লির আরশোলা আন্দোলন কোন পথে?

মাস খানেক ধরেই দিল্লির যন্তর মন্তরে চলছে ককরোচ জনতা পার্টির ধর্না। তাঁদের সঙ্গে অনশনে যোগ দেন শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী সোনম ওয়াংচুক। প্রায় ২১ দিন ধরে অনশনে ছিলেন সোনম। তার পরেই তাঁকে আদালতের নির্দেশে ধর্নাস্থল থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে প্রশাসন। এক পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস এবং মূল্যায়ন কেলেঙ্কারি নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ। এই আবহে সম্প্রতি আত্মপ্রকাশ ঘটা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP) বেকারত্ব, প্রশ্নফাঁস ও অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে যে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে তাতে যোগ দিয়েছেন সোনম ওয়াংচুক। কাজেই আন্তর্জাতিক প্রচারের আলোয় এসেছে আন্দোলনটি।

কারা এই ককরোচ জনতা পার্টি?

মাস দুয়েক আগে সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ এক আইনজীবীর আচরণে অসন্তুষ্ট হন। সেই আইনজীবির দাবী ছিল যে দিল্লি হাইকোর্ট জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের তালিকাভুক্তি সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা বাস্তবায়ন করতে বিলম্ব করছে। সেই আবেদন খারিজ করে দিয়ে আদালতের ওই বেঞ্চ জানায়, "সমাজে ইতোমধ্যেই পরজীবী রয়েছে যারা ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ করে। আপনিও কি তাদের দলে যোগ দিতে চান? এমন কিছু যুবক আছে যারা কর্মসংস্থানের অভাব এবং নিজেদের পেশায় জায়গা করে নিতে না পারার কারণে তেলাপোকার মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে কেউ গণমাধ্যমে কাজ শুরু করে, কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় হয়, কেউ আরটিআই (রাইট টু ইনফর্মেশন) কর্মী হয়, কেউ অন্য ধরনের অ্যাক্টিভিস্ট হয়ে ওঠে"। পরে অবশ্য প্রধান বিচারপতি বিষয়টা স্পষ্ট করে দেন যে, তিনি মূলত 'ভুয়া ও জাল ডিগ্রিধারী' আইনজীবীদের কথা বলছিলেন, বৃহত্তর অর্থে ভারতের যুবসমাজকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলেননি।

ভারতীয় সংখ্যালঘু এই দলঃ

ব্যাস, অতি দ্রুত এই বক্তব্য ভাইরাল হয় এবং বোস্টন ইউনিভার্সিটির ছাত্র ও পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটিজিস্ট অভিজিৎ দীপ ও তার কিছু বন্ধু নিছকই মজা করার উদ্দেশ্যে শুধুমাত্র ইনস্ট্যাগ্রামে ককরোচ জনতা পার্টি নামে ডিজিটাল দল বানিয়ে সবাইকে আহ্বান করেন ফলো করার জন্যে। এরপরে যা ঘটে সেটা প্রত্যাশার বাইরে। এই মুহুর্তে তাদের ফলোয়ারের সংখ্যা বিজেপি’র চেয়ে বেশি। এখন অবধি এই ফলোয়ারদের শতাংশের হিসাব এ’রকম ৪৯ শতাংশ পাকিস্তানি, ১৪ শতাংশ আমেরিকার, ১৪ শতাংশ বাংলাদেশের ও মাত্র ৯ শতাংশ ভারতের। কাজেই ডিজিটাল মিডিয়াতে ভারতের বিজেপি বা কংগ্রেসকে টপকে যাওয়ার ঢক্কানিনাদ ইতিমধ্যে ফুস হয়ে গেছে।

জনপ্রিয়তা মীমের দৌলতেঃ

কিন্তু তারা জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কীভাবে? মিম বানিয়ে উপহাস করার প্রবণতা, ইচ্ছাকৃত রুক্ষ উপস্থাপনা এবং বিল দ্য বেল্ট আঘাতকারী ভাষা এদের জনপ্রিয় করেছে। এদের রাজনৈতিক দাবিগুলি হল - জবাবদিহিতা, গণমাধ্যম সংস্কার, নির্বাচনী স্বচ্ছতা এবং নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি। 'ডুমস্ক্রলিং' বা ক্রমাগত স্ক্রল করতে করতে নেচিবাচক কনটেন্ট দেখার প্রবণতা, বেকারত্ব এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক ক্লান্তি নিয়ে আত্ম-বিদ্রূপধর্মী রসিকতা সোশাল মিডিয়ার অ্যালগারিদমকে প্রভাবিত ও ভুল পথে চালিত করে বলেই এদের রিচ অনেক বেশি ছিল। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ২৯ শতাংশ তরুণ (যাদের বয়েস ৩০-এর কম) ভারতীয় সম্পূর্ণভাবেই রাজনৈতিক সক্রিয়তা থেকে দূরত্ব রেখে চলে এবং মাত্র ১১ শতাংশ তরুণ কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য। কাজেই প্রায় ৬৫ কোটি ভারতীয় জেন-জি’র মধ্যে ২৫ লক্ষের কম তরুণ এই ককরোচ জনতা পার্টি’র ফলোয়ার হয়েছে।

আন্দোলন কেন? কারা করছে?

NEET-UG ২০২৪ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস এবং সিবিএসই (CBSE) বোর্ডের মূল্যায়নে মারাত্মক ত্রুটির জেরে ২২ লক্ষেরও বেশি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে পড়তেই পথে নামল ককরোচ জনতা পার্টি। এদের সাথ দিল অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি, বাম ও অতি বাম দলগুলি যাদের পরিচিতি ডিপ স্টেটের এজেন্ট হিসেবে ও টুকরে গ্যাঙ নামে। হাজর কুড়ি লোক নেমে পড়ল দিল্লির যন্তর মন্তর রোডে। যোগ দিলেন আরেক রাস্ট্রবিরোধী লাদাখের সোনম ওয়াংচু যার খ্যাতি থ্রি ইডিয়টের সৌজন্যে। তিনি শুরু করলেন অনশন। আগে বলা যাক এই আন্দোলনের চরিত্র। একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে দ্রুত তদন্ত করে অপরাধীদের গারদে পুরে ফের পরীক্ষার ব্যবস্থা করে ফল প্রকাশ করে দেওয়ার পরে দাবী করা হল তাঁর পদত্যাগ। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে স্পেশাল কমিশনার, জয়েন্ট কমিশনার, ডেপুটি কমিশনার, একাধিক আইপিএস অফিসার-সহ অন্তত ১১৮ জন পুলিশ কর্মী জখম হয়েছেন। গুরুতর আহত হয়েছেন ৬০ জন আন্দোলনকারীও। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দেখা করেন ও দাবিপত্র নেওয়ার পরেও তারা নাকি আন্দোলন চালিয়ে যাবে। আর সোনম ওয়াংচুক জানিয়েছেন, যতদিন না সংসদে সাংসদদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে, ততদিন তিনি অনশন চালিয়ে যাবেন।

সোনম ওয়াংচু’র মতলবী অনশনঃ

এখন প্রশ্ন একটাই। বারবার ধৈর্যের পরীক্ষা দেওয়ার পরেও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তিনি খড়্গহস্ত কেন? তিনি তো ককরোচ জনতা পার্টির কেউ নন। এর মূল কারণ লাদাখকে রাজ্যের মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে গত কয়েক বছর ধরেই তিনি সোচ্চার। তার বক্তব্য লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতাভুক্ত করে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হোক। লাদাখের জন্য একটি পৃথক পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন করা হোক। কিন্তু লাদাখের মানুষ তো তা চাইছে না। তাদের চিরকালই দাবী ছিল লাদাখ কেন্দ্র শাসিত হোক এবং এখন সেটাই চলছে যা সোনম ওয়াংচু'র না'পসন্দ। আরো ঝামেলা আছে। সোনম ওয়াংচু কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে ১৭ একর জমি নিয়ে সেখানে স্কুল করেন যার মূল্য তিনি কেন্দ্রীয় সরকারকে আজও পরিশোধ করেননি। তার চেয়েও বড় কথা তার স্কুল থেকে আজ অবধি সাড়ে চারশ ছেলে মেয়ে দশ ক্লাসের পরীক্ষা পাস করেছে যা সোনম ওয়াংচু সৃষ্ট সিলেবাস অনুযায়ী পঠিত। অর্থাৎ সিবিএসই (CBSE) বোর্ডের অনুমোদিত নয়। ওয়াংচু’র বক্তব্য শুধুমাত্র পুঁথিগত বিদ্যা নয়, হাতেকলমে ছাত্রদের জীবনধারণের পাঠ শেখানো এই সিলেবাসের উদ্দেশ্য। কিন্তু কোন দেশে অনুমোদন ছাড়া সিলেবাস সৃষ্টি করে আপনি পাঠদান করলেও সেও পাঠোত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাস্বীকৃতি মেলে না। অনেকটা খারিজি মাদ্রাসায় (সরকারি মাদ্রাসা নয়) পাঠোত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের মত।

ভারতে ডিপ স্টেট চক্রান্ত মুখ থুবড়ে পড়ছেঃ

দেখুন, রাজনীতি আলাদা এবং তা নিয়ে মস্করা আলাদা। কিছু বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক নেতা যে উল্লাস প্রকাশ করেছেন তা তাদের সাথে বিরাট সংখ্যার পাকিস্তানি ও বাংলাদেশি যারা ভারতবিরোধী এবং ককরোচ দলের ফলোয়ার তাদের সাথে একাসনে বসিয়েছে। ভুলে যাবেন না যে ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে অস্বীকার করেই বিরোধীরা সর্বক্ষেত্রে ডুবেছে। বিশ্বাস করুন বা না করুন, ভারতে কোন সংবাদমাধ্যম এই আন্দোলনকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। ভারত সরকার প্রচুর ধৈর্য ইতিমধ্যে দেখিয়েছে। আন্দোলনের অভিমুখ এই মুহুর্তে উমর খলিদের মুক্তির দাবী ও কাশ্মীরের আজাদী নিয়ে স্লোগানে ঘুরে যাচ্ছে। অর্ধেকের বেশী আন্দোলনকারী ইতিমধ্যে নেতৃত্বকে ‘মতলবী’ বলে স্থানত্যাগ করেছে। কাজেই আন্দোলন শেষের মুখে। তাই অবান্তর ও অবাস্তব দাবী করছে ওয়াংচু ও অন্য চুনোপুঁটিরা। একটা কথা মনে রাখতে হবে যে ভারতে ডিপ স্টেটের দালালরা কোনদিন কিছু করতে পারেনি, আজও পারবে না।

লেখক: অমিত গোস্বামী, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক, কোলকাতা ।