রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

কেরানীগঞ্জ, মতিঝিল ও সাভারের বোমা ছিল ‘টাইমারযুক্ত’; ১৭৪ জন জঙ্গিকে জামিনে মুক্তি দেন আসিফ নজরুল, নিয়মিত সমন্বয় করতেন মাহফুজ ও ইউনূস

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৩ পিএম
কেরানীগঞ্জ, মতিঝিল ও সাভারের বোমা ছিল ‘টাইমারযুক্ত’; ১৭৪ জন জঙ্গিকে জামিনে মুক্তি দেন আসিফ নজরুল, নিয়মিত সমন্বয় করতেন মাহফুজ ও ইউনূস

দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সম্প্রতি উদ্ধার ও জব্দ করা বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তুর ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) সূত্রে জানা গেছে—মতিঝিল, আশুলিয়া, সাভার ও কেরানীগঞ্জ থেকে উদ্ধার করা বোমাগুলোতে ‘টাইমার’ যুক্ত ছিল। উদ্ধারকৃত সবকটি বোমাই মূলত ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি)।

সাভার ও আশুলিয়ার ঘটনা

গত বুধবার সাভারের শ্যামপুরে বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় ৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৬-৭ জনকে আসামি করে সাভার থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। উক্ত মামলায় গ্রেপ্তারকৃত মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরান প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তিনি নব্য জেএমবির মতাদর্শে বিশ্বাসী হলেও সরাসরি বোমা তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত নন।

অন্যদিকে, সাভারের সাধাপুর এলাকায় প্রেশার কুকার বোমা উদ্ধারের ঘটনায় গতকাল মামলা দায়ের করা হয়। মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ১টার দিকে স্থানীয় এক ব্যক্তি ৬-৭ জন অপরিচিত লোককে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখেন। স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে সেখানে একটি প্লাস্টিকের ড্রামের ভেতর প্রেশার কুকার বোমাটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরদিন পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল (বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট) সেটি সফলভাবে নিষ্ক্রিয় করে।

এর আগে, গত ৩০ জুলাই ঢাকার আশুলিয়ার চারাবাগ এলাকায় ‘জয়ী জেনারেল স্টোর’-এর সামনে থেকে স্কচটেপে মোড়ানো একটি প্রেশার কুকারসদৃশ বোমা উদ্ধার করা হয়, যাতে আইইডির উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রেশার কুকার সাধারণ গৃহস্থালি সামগ্রী হওয়ায় এটি সন্দেহ এড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি প্রেশার কুকারের বাষ্প নির্গমনের অংশটিকে বোমার বিশেষ কাঠামো হিসেবে ব্যবহারের প্রমানও পাওয়া গেছে।

ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক ও প্রযুক্তি ব্যবহারের আলামত

সিটিটিসি সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ এবং সাভারে বোমা বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থল আলামত হিসেবে ‘ট্রাইঅ্যাসিটোন ট্রাইপারঅক্সাইড’ (টিএটিপি) পাওয়া যায়। টিএটিপি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও শক্তিশালী জৈব পারঅক্সাইড বিস্ফোরক। এছাড়া ঘটনাস্থল থেকে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, নাইট্রিক এসিডসহ প্রায় ১০ কেজি গুঁড়া পাউডার এবং বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

সিটিটিসির মতে, বিস্ফোরণ পরবর্তী পাওয়া বিভিন্ন আলামত—যেমন বল বিয়ারিং ও এন্টেনা বিশ্লেষণ করে মনে করা হচ্ছে, বোমাগুলো দূরনিয়ন্ত্রিত (রিমোট কন্ট্রোল) পদ্ধতিতে বিস্ফোরণের উপযোগী করে তৈরি করা হতে পারে। এ ধরনের বোমা যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সাধারণ মানুষের উপস্থিতির কারণে এসব উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক নিরাপদে উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয় করার পুরো প্রক্রিয়াটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তদন্তকারীদের মতে, কেরানীগঞ্জ, মতিঝিল, আশুলিয়া ও সাভারের ঘটনায় জড়িতদের প্রাথমিক পরিচয় বিশ্লেষণে তারা সবাই ‘নব্য জেএমবি’র সদস্য বলে ধারণা করা হচ্ছে। কেরানীগঞ্জের আল-আমিন, মামুন, রাব্বি এবং যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের ওপর হামলায় অভিযুক্ত রাকিব একই মতাদর্শের অনুসারী।

বরিশালের ঘটনায় ধোঁয়াজাল

এদিকে বরিশাল জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে বুধবার ঘটানো বিস্ফোরণটি পূর্বে পুঁতে রাখা হয়েছিল নাকি বাইরে থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছে—তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। ঘটনার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পুলিশের পক্ষ থেকে এখনও জানানো হয়নি। বিস্ফোরকের ধরন ও প্রকৃতি জানতে ফরেনসিক প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

জামিন ও কারাগার থেকে পলাতক জঙ্গিদের তথ্য

৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে ১৭৪ জন জঙ্গি জামিনে মুক্তি পান। তৎকালীন ঘটনাবলীতে দেশের বিভিন্ন কারাগার (যেমন: শেরপুর, নরসিংদী, সাতক্ষীরা ও কাশিমপুর) ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলার সুযোগে অন্তত ৯৮ জন সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন জঙ্গি ও সন্ত্রাসী পালিয়ে যায়।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের দাবি, তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল জামিন প্রক্রিয়ার বিষয়টি তদারকি ও নিশ্চিত করে নিয়মিত আপডেট উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে জানাতেন। পাশাপাশি, একই তথ্য পাকিস্তান দূতাবাসের তিন কর্মকর্তার কাছেও পাঠানো হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, কারাগার ভাঙচুর ও পলায়নের ঘটনাগুলোতে অপর উপদেষ্টা মাহফুজ আলম সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে জানা যায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বর্তমান পদক্ষেপ ও সমন্বিত ব্যবস্থা কারাগার থেকে পালানো উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে পেনাল কোড ও বিশেষ আইনে নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছে। সার্বিক নিরাপত্তা সুসংহত রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বর্তমানে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে:

• বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি: জামিনে মুক্ত ও পলাতক থাকা জঙ্গিরা যাতে পুনরায় কোনো সংগঠিত উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে বা সাংগঠনিক পুনর্গঠন চালাতে না পারে, সে জন্য সিটিটিসি, র‍্যাব ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা নজরদারি বহুগুণ বাড়িয়েছে।

• দেশব্যাপী গ্রেফতার অভিযান: পলাতকদের ধরতে সারা দেশে বিশেষ চিরুনি অভিযান চলছে। ইতোমধ্যে সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পলাতক একাধিক বন্দীকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।

• সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার ও বায়োমেট্রিক ট্র্যাকিং: পলাতকদের নাম, ছবি ও বায়োমেট্রিক তথ্য সমন্বিত করে দেশের প্রতিটি থানা, ইমিগ্রেশন ও চেকপোস্টে পাঠানো হয়েছে।

• সীমান্তে রেড অ্যালার্ট: চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা যাতে অবৈধ উপায়ে সীমান্ত অতিক্রম করে বিদেশে পালাতে না পারে, সে জন্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB) এবং ইমিগ্রেশন পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।

• জনসচেতনতা ও হটলাইন: বোমাসদৃশ বা সন্দেহজনক কোনো বস্তু চোখে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা (৯৯৯) বা নিকটস্থ থানায় জানানোর জন্য সাধারণ জনগণকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)