মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

দোভাল-চালে ধরাশায়ী ঢাকা: ভারত-চীন মেরুকরণে বাংলাদেশের মহা-কূটনৈতিক বিপর্যয়: মোদী-জিনপিং ঐতিহাসিক বৈঠক: ভুল পদক্ষেপে আম ও ছালা দুটোই খোয়াল তারেক

লিখেছেন: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন। প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:৩৯ পিএম
 দোভাল-চালে ধরাশায়ী ঢাকা: ভারত-চীন মেরুকরণে বাংলাদেশের মহা-কূটনৈতিক বিপর্যয়: মোদী-জিনপিং ঐতিহাসিক বৈঠক: ভুল পদক্ষেপে আম ও ছালা দুটোই খোয়াল তারেক

আন্তর্জাতিক রাজনীতির টেবিলে এক পক্ষের দূরদর্শী চাল আর অন্য পক্ষের অপরিপক্ব সিদ্ধান্তের মাশুল কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার চাক্ষুষ প্রমাণ মিলল দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক নাটকে। ভারত ও চীনের দীর্ঘদিনের জমতে থাকা বরফ এক লহমায় গলিয়ে দিয়েছেন দিল্লির নীতি নির্ধারকেরা। আর সেই সমীকরণের ভুল হিসাব কষে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চরম কোণঠাসা ও বিভ্রান্তির মুখে পড়েছে বাংলাদেশের তারেক রহমান সরকার।

দোভালের গোপন মিশন: বেইজিং থেকে নয়াদিল্লি

দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে চলা অনিশ্চয়তা কেটে গিয়েছে শনিবার বেলা বারোটার কিছু আগে, যখন বহুলচর্চিত ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে নয়াদিল্লির মাটিতে পা রাখেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। কিন্তু এই ঐতিহাসিক উপস্থিতির নেপথ্যে কাজ করেছে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও ‘সুপার স্পাই’ খ্যাত অজিত দোভালের নিখুঁত কৌশল।

গত ২৪ ও ২৫ আগস্ট বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ২৫তম ‘স্পেশাল রিপ্রেজেন্টেটিভস’ বৈঠকে যোগ দিয়ে সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির আলোচনার পাশাপাশি দোভাল এক চরম গোপনীয় মিশন বাস্তবায়ন করেন। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—যেকোনো মূল্যে মোদী-জিনপিং দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এবং ব্রিকসে জিনপিংয়ের সরাসরি উপস্থিতি নিশ্চিত করা। প্রশাসনিক স্তরে উচ্চপর্যায়ের ধারাবাহিক বৈঠকের পর দোভালের বিছানো কূটনৈতিক সবুজ গালিচাতেই সাড়া দেয় বেইজিং। চার শতাধিক প্রতিনিধি নিয়ে নয়াদিল্লি নামেন চীনা রাষ্ট্রপ্রধান।

সীমান্ত সংঘাত পেরিয়ে অর্থনীতিতে নতুন মেরুকরণ

দিল্লিতে পৌঁছানোর পরপরই শনিবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন শি জিনপিং। চীনা রাষ্ট্রদূত সু ফেইহোং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বৈঠকের আনুষ্ঠানিক তথ্য নিশ্চিত করেন। গত তিন বছরে এটি দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের তৃতীয় সাক্ষাৎ। ২০২০ সালের প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘাত এবং বৈশ্বিক মহামারীর পর থেকে থমকে থাকা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তায় এই বৈঠক এক বিরাট মোড় ঘোড়ানো সাফল্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমান্ত সংঘাতকে একদিকে সরিয়ে রেখে দুই দেশ এখন অর্থনৈতিক সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতির হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।

চীনের ভরসায় বয়কট: আম ও ছালা দুটোই খোয়াল ঢাকা

ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য যখন আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হচ্ছে, ঠিক তখনই ঢাকার রাজপথে নেমে এসেছে চরম অস্বস্তি। চীন ভারতে যাবে না—এমন একটি অন্ধ ও অদূরদর্শী ধারণার ওপর ভর করে বাংলাদেশ সরকার ব্রিকস সম্মেলন বয়কটের পথ বেছে নেয়। সম্মেলনে কোনো প্রতিনিধি দল না পাঠানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও দেয় ঢাকা।

কিন্তু বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে দেখা গেল, যার ভরসায় ঢাকার এই অবস্থান, সেই শি জিনপিং নিজেই বিশাল বহর নিয়ে দিল্লিতে মোদীর সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন। এর আগে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের ভরসায় বয়কট করার পর শেষ মুহূর্তে পাকিস্তান অংশ নেওয়ায় বাংলাদেশকে যেমন একা হাত কচলানো অবস্থায় বসে থাকতে হয়েছিল, ব্রিকসের ক্ষেত্রেও ঠিক সেই একই ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি ঘটল।

ঢাকার জোড়া ভয় ও ভুল হিসাবের মাশুল

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার এই মহা-কূটনৈতিক বিপর্যয়ের পেছনে কাজ করেছে দুটি বড় ভুল ধারণা:

ওয়াশিংটনের চাপ ও মার্কিন ভয়: ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষোভের মুখে পড়ার ভয়ে পশ্চিমবিরোধী হিসেবে পরিচিত জোটে প্রকাশ্যে অংশ নিতে সংকোচবোধ করেছে ঢাকার বর্তমান সরকার।

বেইজিং-দিল্লি সম্পর্কের ভুল মূল্যায়ন: ভারত ও চীনের দীর্ঘদিনের জমে থাকা বরফ যে অজিত দোভালের কৌশলে এত দ্রুত গলে যাবে, তা কল্পনাও করতে পারেনি বাংলাদেশ সরকারের নীতি নির্ধারকেরা। দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য

একদিকে ভারতের সুচিন্তিত ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশল, অন্যদিকে ঢাকার অপেশাদার ও অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত—এই দুইয়ের ফারাক দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ঢাকাকে পুরোপুরি একা করে দিয়েছে। চীনের ওপর অন্ধ ভরসা রেখে ব্রিকস বর্জন করে শেষ পর্যন্ত আম এবং ছালা দুটোই হারিয়ে চরম রাজনৈতিক ও কৌশলগত অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে তারেক রহমানের সরকার। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দাবাখেলায় ভুল চালের মাশুল কীভাবে একটি রাষ্ট্রকে বিশ্বমঞ্চে কোণঠাসা করে ফেলে, ঢাকার বর্তমান পরিস্থিতি তারই বাস্তব দলিল।

লেখক: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন।