মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

আন্তর্জাতিক

কূটনৈতিক মহাসঙ্কটে ইসলামাবাদ: ব্রিকসের ‘দিল্লি ঘোষণাপত্রে’ বিশ্বমঞ্চে কোণঠাসা পাকিস্তান

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:৩৪ পিএম
কূটনৈতিক মহাসঙ্কটে ইসলামাবাদ: ব্রিকসের ‘দিল্লি ঘোষণাপত্রে’ বিশ্বমঞ্চে কোণঠাসা পাকিস্তান

বিশ্বরাজনীতি ও ভূ-কৌশলগত প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানকে এক নজিরবিহীন কূটনৈতিক ধাক্কার মুখোমুখি হতে হলো। সাম্প্রতিককালে জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে সংঘটিত বর্বর জঙ্গি হামলা এবং পরবর্তীতে ভারতের সামরিক পদক্ষেপের পর বিশ্বমঞ্চে দিল্লির অবস্থান যখন উত্তরোত্তর শক্ত হচ্ছিল, ঠিক তখনই উদীয়মান অর্থনীতির শক্তিশালী জোট ‘ব্রিকস’ (BRICS)-এর সাম্প্রতিক শীর্ষ সম্মেলনে গৃহীত ‘দিল্লি ঘোষণাপত্র’ পাকিস্তানের জন্য চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াল। রাশিয়া, চীন এবং ইরানের মতো ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে প্রভাবশালী দেশগুলো একযোগে পহেলগাঁও হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করায় আন্তর্জাতিকভাবে কার্যত একঘরে হয়ে পড়েছে ইসলামাবাদ।

পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ড ও ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সামরিক প্রেক্ষিত

গত ২২ এপ্রিল জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে ২৬ জন নিরস্ত্র ও নিরপরাধ নাগরিককে নৃশংসভাবে হত্যা করে লস্কর-ই-তৈয়বার ছায়া সংগঠন ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (টিআরএফ)-এর চারজন সশস্ত্র জঙ্গি। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার জবাবে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী ৭ মে ভোররাতে সূচনা করে এক সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত সামরিক অভিযান, যার নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন সিঁদুর’।

গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তান ও পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের (PoK) মোট নয়টি সক্রিয় সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটি একযোগে গুঁড়িয়ে দেয়। ভারতীয় এই পদক্ষেপের পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে পাকিস্তান ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর জনবহুল এলাকা এবং সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে হামলাই চালিয়েছে শুধু নয়, বরং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে তোলে। তবে ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেবল সেই হামলা প্রতিহতই করেনি, বরং শক্তিশালী পাল্টা প্রত্যাঘাত হানে। এতে পাকিস্তানের অন্তত ১১টি বিমানঘাঁটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অভিযানে ১০০ জনেরও বেশি জঙ্গি ও প্রায় ৩৫-৪০ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। শেষ পর্যন্ত সামরিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় পাকিস্তানের অনুরোধেই নয়াদিল্লি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।

‘দিল্লি ঘোষণাপত্র’: বিশ্বমঞ্চে ভারতের কূটনৈতিক বিজয়

জি-৭ কিংবা জাতিসংঘের মতো মঞ্চে ভারতের প্রভাব আগে থেকেই সুসংহত ছিল, তবে ব্রিকস সম্মেলনের যৌথ বিবৃতিতে যেভাবে পাকিস্তানের পৃষ্ঠপোষকতাযুক্ত উগ্রবাদের প্রতি কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা নয়াদিল্লির অসামান্য কূটনৈতিক দক্ষতার পরিচয় বহন করে। ব্রিকসের যৌথ বিবৃতিতে সরাসরি উল্লেখ করা হয়:

সীমান্তপার সন্ত্রাসবাদ রোধ: সীমান্ত পেরিয়ে জঙ্গি অনুপ্রবেশ বন্ধ করা, উগ্রপন্থীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল (safe havens) সম্পূর্ণ ধ্বংস করা এবং সন্ত্রাসী কার্যকলাপে অর্থের জোগান (terror financing) চিরতরে বন্ধ করা ব্রিকস জোটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ‘দ্বিমুখী নীতি’ প্রত্যাখ্যান: সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কিছু রাষ্ট্রের ‘দ্বিমুখী নীতি’ বা দ্বিচারিতাকে ব্রিকস সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। এতদিন ধরে সন্ত্রাসবাদকে রাষ্ট্রীয় নীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তান যে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করত, এই ধারাটির মাধ্যমে সেই কৌশলের ওপর শক্ত আঘাত হানা হয়েছে। যুবসমাজ ও উগ্রবাদ প্রতিরোধ: আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে উগ্রবাদী মানসিকতা ছড়ানো এবং তাদের মৌলবাদে দীক্ষিত করার বিরুদ্ধে ব্রিকস সদস্য দেশগুলো যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে।

চীন ও ইরানের অবস্থান বদল: ভৌগোলিক মেরুকরণে নতুন মোড়

পহেলগাঁও হামলা ও ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালে পাকিস্তানের তথাকথিত ‘সর্বকালের বন্ধু’ চীন ও প্রতিবেশী দেশ ইরান যে অবস্থান নিয়েছিল, ব্রিকস মঞ্চের সিদ্ধান্তে তার এক বড় ধরনের ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা গেল। ঘটনার সময় চীন পাকিস্তানকে ড্রোন ও আধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করে সহায়তা করেছিল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে দাবি করা হয়, আর ইরানও কৌশলগত নীরবতা বজায় রেখে পাকিস্তানের পাশে দাঁড়িয়েছিল।

কিন্তু ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে দাঁড়িয়ে পহেলগাঁও হামলার কঠোর সমালোচনায় চীন ও ইরানের স্বাক্ষর করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভূ-রাজনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে:

১. চীনের কৌশলগত নমনীয়তা: চীন তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং ব্রিকসের মতো বিশ্বমঞ্চের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে গিয়ে প্রকাশ্যে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের দায় নিজেদের কাঁধে নিতে অস্বীকার করেছে।

২. ইরানের নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রতিফলন: নিজস্ব সীমান্তে জৈশ আল-আদলের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিন লড়াই করা ইরানও বুঝেছে যে, সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন জোগানো শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক স্থায়িত্ব বিনষ্ট করে। বিশ্লেষণ

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, পহেলগাঁও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এবং ব্রিকসের সমন্বিত সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয়ভাবে সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেওয়ার কৌশল আধুনিক বিশ্বে আর গ্রহণযোগ্য নয়। ভারত একদিকে সামরিক শক্তিতে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মাধ্যমে নিজেদের আত্মরক্ষা ও কঠোর জবাব দেওয়ার ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক টেবিলে পাকিস্তানের নিকটতম মিত্রদের দিয়েও সেই হামলার নিন্দা করিয়ে নিজেদের নীতিকে বিশ্বজুড়ে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

‘দিল্লি ঘোষণাপত্র’ কেবল একটি নথি নয়, এটি ইসলামাবাদের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি সুস্পষ্ট বার্তা—সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ না করলে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতা আরও গভীর হবে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

সম্পর্কিত সংবাদ

ব্রিকসে টানটান কূটনীতি! জিনপিংকে পাশে নিয়ে রাষ্ট্রসংঘে বদলের ডাক মোদির, বার্তা নেপাল নিয়েও

ডলারের সাম্রাজ্যে ধাক্কা: নিজ নিজ মুদ্রায় বাণিজ্যে ব্রিকসের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। মার্কিন অর্থনৈতিক আধিপত্যের বিকল্প: ‘দিল্লি ঘোষণা’ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন মোড়

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে বহু-মেরু বিশ্বের বার্তা: কাজান ব্রিকস সম্মেলনে ভারত-ইরান-রাশিয়া সমীকরণ । সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা ও বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা: ব্রিকস সম্মেলনে বিশ্বমঞ্চে নয়াদিল্লির কৌশলগত অবস্থান