মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

আন্তর্জাতিক

ডলারের সাম্রাজ্যে ধাক্কা: নিজ নিজ মুদ্রায় বাণিজ্যে ব্রিকসের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। মার্কিন অর্থনৈতিক আধিপত্যের বিকল্প: ‘দিল্লি ঘোষণা’ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন মোড়

লিখেছেন: শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:৩২ পিএম
 ডলারের সাম্রাজ্যে ধাক্কা: নিজ নিজ মুদ্রায় বাণিজ্যে ব্রিকসের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। মার্কিন অর্থনৈতিক আধিপত্যের বিকল্প: ‘দিল্লি ঘোষণা’ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন মোড়

বিশ্ব বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে ব্রিকস (BRICS) জোট। বৈশ্বিক বাণিজ্যে দীর্ঘদিনের একক আধিপত্য বজায় রাখা মার্কিন ডলারকে টেক্কা দিতে এবং নিজস্ব অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার করতে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে জোটটি। ব্রিকস সম্মেলনে ঘোষিত ‘দিল্লি ঘোষণা’-য় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নিজস্ব আঞ্চলিক মুদ্রায় বাণিজ্য পরিচালনার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতি বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই পদক্ষেপটি সরাসরি রাতারাতি 'ডি-ডলারাইজেশন' বা ডলার সম্পূর্ণ বর্জন না হলেও, বৈশ্বিক বাণিজ্যে ডলারের একচেটিয়া সাম্রাজ্যের কফিনে এটি প্রথম মজবুত পেরেক হিসেবে কাজ করবে।

মার্কিন অর্থনৈতিক দাদাগিরি ও ব্রিকসের কৌশলগত বিকল্প

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমেরিকা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে এক ধরনের কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক বৃদ্ধি, বাণিজ্য যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা মেনে না নিলে কঠোর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার নীতি বিশ্ব বাণিজ্যকে বারবার অস্থিরতার মুখে ফেলেছে। মার্কিন নীতির এই প্রভাব ও দাদাগিরি থেকে রক্ষা পেতে এবং কোনো একক দেশের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের শিকার না হতে ব্রিকস জোট বিকল্প বাণিজ্যিক কাঠামোর সূচনা করেছে।

পেমেন্ট সিস্টেম একীকরণ ও আঞ্চলিক মুদ্রায় বাণিজ্যের রূপরেখা সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্রিকস পেমেন্ট টাস্ক ফোর্স (BPTF)-কে একটি দ্রুত, সাশ্রয়ী এবং নিরাপদ আন্তঃসীমান্ত লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থার অন্যতম মূল লক্ষ্য হলো সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব পেমেন্ট নেটওয়ার্কগুলোর মধ্যে একটি সেতু তৈরি করা। ভারতের ইউপিআই (UPI) চীনের ই-সিএনওয়াই (e-CNY) রাশিয়ার ডিজিটাল রুবেল

এই অভ্যন্তরীণ পেমেন্ট ব্যবস্থাগুলোকে একত্রিত করার পাশাপাশি সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি (CBDC) এবং ফাস্ট পেমেন্ট সিস্টেমগুলোর সংমিশ্রণ ঘটাতে পারলে আন্তর্জাতিক লেনদেন আরো সহজ ও কার্যকর হবে।

ডলার ইস্যুতে বিভিন্ন দেশের অবস্থান এবং ভারতের ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা

ব্রিকস সম্মেলনের আলোচনায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। রাশিয়া ও ইরান সরাসরি ডলার বর্জন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে ডলারের ভূমিকা পুরোপুরি ছেঁটে ফেলার পক্ষে জোরালো সওয়াল করে। তবে ভারত এই কঠোর অবস্থানের বিপরীতে দাঁড়িয়ে এক অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও কৌশলগত কূটনৈতিক ভূমিকা বজায় রেখেছে। ভারতের বক্তব্য পরিষ্কার—ভারত সরাসরি ডলারের বিরোধী নয়, বরং আন্তর্জাতিক লেনদেনে বিকল্প ও বহুমুখী ব্যবস্থা তৈরির পক্ষপাতী। অভিন্ন ‘ব্রিকস মুদ্রা’ তৈরির মতো চরম কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে ভারতীয় কূটনৈতিক সতর্কতার ফলেই ব্রিকস মূলত নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য বৃদ্ধির দিকে নজর দিয়েছে।

আঞ্চলিক মুদ্রায় বাণিজ্যের অর্থনৈতিক ইতিবাচক দিক

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিকভাবে ভূ-রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপে যেসব সুফল পাওয়া যাবে:

লেনদেন ব্যয় হ্রাস: তৃতীয় মুদ্রা হিসেবে ডলার কনভার্সন বা রূপান্তরের অতিরিক্ত ফি বেঁচে যাবে। মুদ্রার মূল্যের তারতম্যের ঝুঁকি কম: বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ডলারের হঠাৎ ওঠানামা থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা রক্ষা পাবেন। টাকার বৈশ্বিক ভূমিকা বৃদ্ধি: আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় রুপিসহ সদস্য দেশগুলোর মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা ও সার্বভৌমত্ব বৃদ্ধি পাবে। দ্রুততম লেনদেন: ডিজিটাল কারেন্সি ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সংযুক্তিতে বৈদেশিক বাণিজ্য অনেক বেশি দ্রুত ও সময়সাশ্রয়ী হবে।

ডি-ডলারাইজেশনের ভবিষ্যৎ এবং নতুন অর্থনৈতিক ভারসাম্য

ব্রিকসের এই নতুন কৌশলগত পদক্ষেপে স্বাভাবিকভাবেই মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বৈশ্বিক আর্থিক রিজার্ভ এবং বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরে ডলার যে একচ্ছত্র সুবিধা পেয়ে আসছে, তা নতুন এই ব্যবস্থার কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। রাশিয়া, চীন, ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে যুক্ত হওয়া নতুন সদস্য দেশগুলোর বিশাল অর্থনৈতিক আকার বৈশ্বিক জিডিপির এক বড় অংশ দখল করে আছে। এই বৃহৎ বাজার যদি মার্কিন ডলার এড়িয়ে নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন নিশ্চিত করে, তবে বিশ্ব বাণিজ্য পরিচালনায় বহুমুখী ক্ষমতার ভারসাম্য (Multi-polar economic order) গড়ে উঠবে।

লেখক: শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক

সম্পর্কিত সংবাদ