মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

আন্তর্জাতিক

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে বহু-মেরু বিশ্বের বার্তা: কাজান ব্রিকস সম্মেলনে ভারত-ইরান-রাশিয়া সমীকরণ । সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা ও বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা: ব্রিকস সম্মেলনে বিশ্বমঞ্চে নয়াদিল্লির কৌশলগত অবস্থান

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০২ পিএম
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে বহু-মেরু বিশ্বের বার্তা: কাজান ব্রিকস সম্মেলনে ভারত-ইরান-রাশিয়া সমীকরণ । সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা ও বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা: ব্রিকস সম্মেলনে বিশ্বমঞ্চে নয়াদিল্লির কৌশলগত অবস্থান

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে বহু-মেরু বিশ্বের বার্তা: কাজান ব্রিকস সম্মেলনে ভারত-ইরান-রাশিয়া সমীকরণ । সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা ও বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা: ব্রিকস সম্মেলনে বিশ্বমঞ্চে নয়াদিল্লির কৌশলগত অবস্থান

বিশ্বরাজনীতি যখন ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে তীব্রভাবে বিভক্ত, ঠিক তখনই রাশিয়ার কাজানে আয়োজিত ষোড়শ ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনে উদযাপিত হলো এক অভূতপূর্ব কূটনৈতিক দৃশ্যপট। সম্মেলনের মূল মঞ্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দেখা গেল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের হাত শক্ত করে ধরে হেঁটে যেতে, আর তাঁদের পাশেই দাঁড়িয়ে হাসিমুখে সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা। সাম্প্রতিককালের বৈশ্বিক সমীকরণের নিরিখে এই একটি একক মুহূর্ত বিশ্বমঞ্চে এক অত্যন্ত জোরালো ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।

সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু ও ব্রিকসের গুরুত্ব

যে প্রেক্ষাপটে এই ছবিটি সামনে এসেছে, তা বৈশ্বিক রাজনীতির সূক্ষ্ম জটিলতাকে ফুটিয়ে তোলে। একদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্রদের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে রাশিয়া। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনা, ইজরায়েলের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ইরানকে বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম সংঘাত কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

এই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ব্রিকসের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জোট কেবল একটি অর্থনৈতিক মঞ্চ হিসেবেই থেকে যায়নি; বরং এটি পশ্চিমা আধিপত্যের বাইরে একটি বিকল্প বহু-মেরুভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা (Multipolar World Order) গড়ে তোলার শক্তিশালী মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো নতুন দেশগুলোর অন্তর্ভুক্তির পর এই জোটের বিশ্ব জনসংখ্যা ও জিডিপিতে অংশীদারিত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

শান্তি ও বাণিজ্যের পক্ষে ভারতের স্পষ্ট অবস্থান

ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতের চিরন্তন শান্তিকামী নীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। সংঘাত নিরসনে যুদ্ধ নয়, বরং নিরবচ্ছিন্ন আলোচনা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন। আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলের অবাধ প্রবাহ বজায় রাখার জোর দাবি জানিয়ে তিনি স্পষ্ট বলেন যে, অসামরিক সাধারণ নাগরিক, বাণিজ্যিক জাহাজ এবং নাবিকদের সুরক্ষা যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে হবে।

পরবর্তীতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বসার সময়েও ভারতের একই বার্তা ধ্বনিত হয়। মোদি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, “এটি যুদ্ধের যুগ নয়।” ভারত কোনো পক্ষ অবলম্বন না করে সর্বদা মানবতা, শান্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার পক্ষপাতী। একই সাথে চাবাহার বন্দর প্রকল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোগত যোগাযোগ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ইরান ও ভারত তাদের যৌথ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে, যা মধ্য এশিয়ার বাণিজ্যে মোড় ঘোরাতে পারে।

পশ্চিমা চাপ ও ইরানের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি

ব্রিকস বিজনেস ফোরামের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান পশ্চিমাদের একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “গত কয়েক বছর ধরে ইরান নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আমাদের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলি সরকারের প্রত্যক্ষ সামরিক আগ্রাসন পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে।”

পেজেশকিয়ান তাঁর বক্তব্যে অর্থনীতি ও সুরক্ষার গভীর সম্পর্কের কথা তুলে ধরে বলেন, “অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব। যখন কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ, পরিকাঠামো বা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক বা সামরিক চাপ তৈরি করা হয়, তখন তার মাশুল শুধু সেই দেশকে মেটাতে হয় না; তার ক্ষতিকর প্রভাব পুরো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকেই ধ্বংস করে দেয়।”

কূটনৈতিক সমীকরণ ও ভবিষ্যতের রূপরেখা পশ্চিমা বিশ্বের তীব্র চাপ সত্ত্বেও ভারত যেভাবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগ্রস্ত দুই রাষ্ট্র—রাশিয়া ও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে একমঞ্চে দাঁড়িয়ে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে, তা নয়াদিল্লির স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত পররাষ্ট্রনীতিরই (Strategic Autonomy) এক উৎকৃষ্ট প্রতিফলন। একদিকে আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি করা, অন্যদিকে ব্রিকস ও গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা—এই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিতে ভারত তার দক্ষতা বিশ্বমঞ্চে আবারও প্রমাণ করল।

কাজানের এই সম্মেলন প্রমাণ করে যে, বিশ্ব বাণিজ্য ও ভূ-রাজনীতিকে আর একক কোনো শক্তির ইচ্ছেমতো চালনা করা সম্ভব নয়। উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো এখন নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে একটি স্থিতিশীল, ভারসাম্যপূর্ণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সচেষ্ট।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)