মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

আন্তর্জাতিক

ব্রিকসে টানটান কূটনীতি! জিনপিংকে পাশে নিয়ে রাষ্ট্রসংঘে বদলের ডাক মোদির, বার্তা নেপাল নিয়েও

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:৩৭ পিএম
ব্রিকসে টানটান কূটনীতি! জিনপিংকে পাশে নিয়ে রাষ্ট্রসংঘে বদলের ডাক মোদির, বার্তা নেপাল নিয়েও

আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে ক্ষমতা এবং সমীকরণের পরিবর্তন দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। সম্প্রতি ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তব্য বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ বিশ্বের প্রধান উদীয়মান শক্তিগুলোর শীর্ষ নেতাদের পাশে বসিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিলেন, তা বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর বর্তমান কাঠামোকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার শামিল।

‘ক্ষমতার পিরামিড’ ভাঙার বার্তা এবং গ্লোবাল সাউথের অধিকার

সম্মেলনের মূল মঞ্চ থেকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আন্তর্জাতিক শাসন ব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটি তুলে ধরে ‘ক্ষমতার পিরামিড’ (Pyramid of Privilege) বদলে ফেলার কড়া আহ্বান জানান। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভ ও উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর—অর্থাৎ ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর ওপর। অথচ যখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আসে, তখন তাদের ঠেলে দেওয়া হয় পেছনের সারিতে।

প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেন, এই বৈষম্যমূলক পিরামিডকে ভেঙে একটি ‘অংশীদারিত্বের উন্মুক্ত মঞ্চে’ রূপান্তরিত করা জরুরি, যেখানে ছোট-বড় প্রতিটি দেশের কথা শোনার সমান সুযোগ থাকবে এবং প্রতিটি দেশ তাদের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব অনুযায়ী প্রতিনিধিত্ব পাবে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC) সংস্কার ও ভেটো ক্ষমতার গুরুত্ব

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই প্রশ্ন উঠছে। বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদ মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী শক্তির বিন্যাসকে প্রতিফলিত করে, যা একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক ভিত্তির সঙ্গে পুরোপুরি অমিল।

ব্রিকস মঞ্চে শি জিনপিংকে পাশে নিয়েই মোদি দৃঢ় কণ্ঠে দাবি করেন যে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার আর বিন্দুমাত্র বিলম্বিত করা যাবে না। চীনের মতো পরাশক্তি দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ লাভ এবং ‘ভিটো ক্ষমতার’ (Veto Power) অধিকার অর্জনের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বেইজিং প্রধানকে একই মঞ্চে রেখে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবির যৌক্তিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা দিল্লির এক অত্যন্ত সুচিন্তিত ও সাহসী কূটনৈতিক চাল। ভারত নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসনে বসলে কেবল গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বরই শক্তিশালী হবে না, বরং আন্তর্জাতিক মঞ্চে চীনের একচ্ছত্র সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমটাতেও একটি বড় ধরনের ভারসাম্য বজায় থাকবে।

নেপাল প্রসঙ্গ এবং আধুনিক প্রযুক্তি সংহতির বার্তা

ভাষণে সরাসরি কারো নাম না নিলেও, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে নরেন্দ্র মোদির বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে। নেপালে আকস্মিক প্রাকৃতিক ও মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে মোদি জোর দেন যে, যেকোনো প্রাকৃতিক বা প্রযুক্তিগত সংকটের সময়ে প্রতিবেশীদের মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান করা জরুরি।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) এবং সাইবার স্পেসের এই যুগে রিয়েল-টাইম ডাটা শেয়ারিং বা তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, নেপালের মতো অঞ্চলে বিপর্যয় পরবর্তী তথ্য গোপনের কৌশল কিংবা ভৌগোলিক সুবিধা নিয়ে প্রতিবেশী দেশকে অন্ধকারে রাখার প্রক্রিয়ার ওপর আঘাত হেনে মোদি পরোক্ষভাবে চীনকেই সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তথ্য আদান-প্রদানে স্বচ্ছতা না থাকলে যে গোটা অঞ্চলে মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে, সেই বাস্তবতাই তিনি তুলে ধরেন।

ঐক্য ও সর্বজনীনতার আহ্বান

ব্রিকসের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, ব্রিকস জোট কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা শক্তির বিরুদ্ধে সামরিক বা রাজনৈতিক জোট নয়। বরং এটি বৈশ্বিক ভারসাম্য রক্ষাকারী একটি সর্বজনীন মঞ্চ, যা "সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার" নীতিতে বিশ্বাসী। তিনি ব্রিকস ভুক্ত দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতাকে সম্মান জানিয়ে সর্বসম্মত সমঝোতার মাধ্যমে বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থার রূপ পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

ব্রিকসের মঞ্চ থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই জোরালো ভাষণ নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, এটি একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তিত ভূ-রাজনীতিতে ভারতের নেতৃত্বমূলক ভূমিকার স্পষ্ট বার্তা। বিশ্ব শাসন ব্যবস্থায় স্থায়ী রূপান্তর, গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং কৌশলগত প্রতিবেশীদের ওপর নজর রাখার মধ্য দিয়ে ভারত স্পষ্ট করে দিল যে—বিশ্বমঞ্চে উদীয়মান শক্তির ভূমিকা এখন আর উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

সম্পর্কিত সংবাদ

কূটনৈতিক মহাসঙ্কটে ইসলামাবাদ: ব্রিকসের ‘দিল্লি ঘোষণাপত্রে’ বিশ্বমঞ্চে কোণঠাসা পাকিস্তান

ডলারের সাম্রাজ্যে ধাক্কা: নিজ নিজ মুদ্রায় বাণিজ্যে ব্রিকসের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। মার্কিন অর্থনৈতিক আধিপত্যের বিকল্প: ‘দিল্লি ঘোষণা’ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন মোড়

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে বহু-মেরু বিশ্বের বার্তা: কাজান ব্রিকস সম্মেলনে ভারত-ইরান-রাশিয়া সমীকরণ । সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা ও বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা: ব্রিকস সম্মেলনে বিশ্বমঞ্চে নয়াদিল্লির কৌশলগত অবস্থান