বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

বাংলাদেশের বর্তমান অন্ধকার: বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়, ধর্মান্ধতা ও ভবিষ্যৎ সংকট

✍ লিখেছেন: শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক প্রকাশিত: ৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:০১ এএম
বাংলাদেশের বর্তমান অন্ধকার: বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়, ধর্মান্ধতা ও ভবিষ্যৎ সংকট

অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় আজ বাংলাদেশ অনেক বেশি অন্ধকারে। এখানে মানুষের মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার এবং মানুষ হিসেবে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার যে চেতনা, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পৃথিবীর সভ্যতা ও উন্নয়নের মধ্য দিয়ে যে উপলব্ধি তৈরি হয়েছে, আমরা যেন তা সম্পূর্ণ বিলীন করে ফেলেছি।

ষাটের দশকে এ দেশে যে রেনেসাঁ বা সাংস্কৃতিক নবজাগরণ ঘটেছিল, সেটি ছিল বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক অধ্যায়।

পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশেরই নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। হাজার বছরের জীবনযাত্রার মধ্য দিয়ে প্রতিটি জাতির নিজস্ব কালচার তৈরি হয়। উদাহরণ হিসেবে আফ্রিকার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর কথা বলা যায়। তাদের ধর্ম, বর্ণ ও বিশ্বাস আলাদা হতে পারে, কিন্তু তাদের নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। সেই সংস্কৃতিই তাদের জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রধান বাহক।

তেমনই ইসলামের উৎপত্তিস্থল সৌদি আরবেও তাদের নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। সৌদি আরবের নারীদের মধ্যে এখনো বিভিন্ন লোকজ উৎসবে উলুধ্বনি দেওয়ার মতো প্রথা দেখা যায়। তাদের নৃত্য, ঢোলবাদন ও অন্যান্য সামাজিক আচার তাদের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। পর্দাপ্রথার বর্তমান সামাজিক রূপও ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বিকশিত হয়েছে। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের অনেক পরে বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও বিশেষত ওহাবি আন্দোলনের প্রভাবে সৌদি সমাজে বর্তমানের কঠোর পর্দাপ্রথার প্রচলন ও বিস্তার ঘটেছে।

আমাদের একটি কথা ছিল—বাঙালি বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ। বছরের প্রতিটি মাসে আমাদের কোনো না কোনো উৎসব ছিল। সেই উৎসবগুলো তৈরি হয়েছে আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে, ফসলের সঙ্গে, এ দেশের আবহাওয়া ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে।

আমাদের পিঠা উৎসব, বৈশাখী উৎসব, গ্রামীণ মেলা, গানের উৎসব, বাউল গান, ভাটিয়ালি, যাত্রাপালা, সারি গান—সবকিছুই হাজার বছরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।

এ দেশে ইসলামের আবির্ভাবের আগে থেকেই বাঙালির নিজস্ব জীবনযাত্রা, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছিল। ইসলামের আবির্ভাবের পরেও সেই ঐতিহ্য বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। এ দেশে লাঠিখেলা, হাডুডু, কুস্তি এবং সামাজিক বিভিন্ন উৎসব আমাদের সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বহন করে আসছে।

আমরা ময়মনসিংহ গীতিকা, পালাগান, জারিগানের কথা শুনেছি। এগুলো কি আমাদের ঐতিহ্যের অংশ নয়?

অথচ আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা সেই রেনেসাঁ, সেই ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি। একটি সংস্কৃতিহীন, ইতিহাসহীন, উদ্দেশ্যহীন জাতিতে পরিণত হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এর পেছনে রয়েছে কিছু সংকীর্ণমনা, অর্ধশিক্ষিত ও ধর্মীয় জ্ঞানের সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ মানুষের ভূমিকা।আমাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কে ধর্ম বিরোধী বলে ফোতুয়া দিচ্ছে ।

আসলে ধর্মীয় জ্ঞানের একটি মৌলিক ভিত্তি হলো পবিত্র কোরআন। কোরআনে কোথাও কোনো নির্দিষ্ট মানবগোষ্ঠীর আক্রমণাত্মক সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। কোথাও বলা হয়নি যে পৃথিবীর প্রতিটি জাতিকে আরব সংস্কৃতিকে নিজেদের জাতীয় সংস্কৃতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

হাদিসশাস্ত্রের বিষয়টিও আমাদের বোঝা দরকার। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের কয়েক শতাব্দী পরে বিভিন্ন হাদিস সংকলিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বুখারি শরিফের কথা বলা যায়। হাদিসের বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতা, তাঁদের স্মৃতিশক্তি এবং বর্ণনার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে যে পদ্ধতিতে বিচার করা হয়, সেটি অত্যন্ত জটিল বিষয়।ইমাম বোখারির হাদীস বর্ণনায় কোথাও ইসলামের প্রথম চার খলিফা কর্তৃক বর্ননা থেকে বর্ণিত কোন হাদিস নাই ।

আমার প্রশ্ন হলো, একজন মানুষ যা বলেছেন, তা পঞ্চাশ বছর পরে আরেকজনের মাধ্যমে, তারপর আরেকজনের মাধ্যমে, এভাবে চার-পাঁচ কিংবা পাঁচ-ছয়জনের বর্ণনায় কীভাবে হুবহু সংরক্ষিত থাকতে পারে? আধুনিক বিজ্ঞান ও জ্ঞানচর্চার আলোকে এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন, গবেষণা ও বিশ্লেষণ হওয়া প্রয়োজন। অথচ আমরা প্রতিদিন বাংলাদেশে হাজার হাজার মওলানা-মৌলভী তৈরি করছি, যাঁদের একটি বড় অংশ ফিকাহশাস্ত্র ও হাদিসশাস্ত্রের বিভিন্ন ব্যাখ্যা নিয়ে একজন আরেকজনের প্রতি ঘৃণা ছড়াচ্ছেন। এক দল আরেক দলকে উসকানি দিচ্ছে। একজন আরেকজনকে কাফের বলছে।

উচ্চকণ্ঠে বক্তৃতা দিয়ে মানুষের সরলতা ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে পুঁজি করে তাঁরা একটি ধর্মান্ধ সমাজ তৈরি করছেন।

এই সমাজ আজ দিকবিদিক হারিয়ে উন্নয়ন, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার পথ থেকে পিছিয়ে পড়ছে। পৃথিবীর আধুনিক সভ্যতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পরিবর্তে আমরা যেন নিজেদের একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত করছি।

যেখানে জ্ঞানচর্চা নেই, উদ্ভাবন নেই, বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা নেই, সেখানে একটি জাতি কীভাবে এগিয়ে যাবে?

পৃথিবীর উৎপাদন, প্রযুক্তি কিংবা বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির কোনো ক্ষেত্রেই আমরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অবদান রাখতে পারছি না। অথচ আমাদের বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আমাদের নিজস্ব পরিচয়, ভাষা, খাবার, সাহিত্য ও জীবনযাত্রার বৈচিত্র্য রয়েছে।

এমনকি পৃথিবীতে আমাদের যে বৈচিত্র্যময়, সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাদ্যসংস্কৃতি রয়েছে, সেটিকেও আমরা আন্তর্জাতিকভাবে নিজেদের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। আমাদের বাঙালি খাবার অনেক ক্ষেত্রেই ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের পরিচয়ে পরিচালিত হয়। অর্থাৎ আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যকেও আমরা যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারছি না।

এর কারণ হলো, কিছু অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও জ্ঞানহীন মানুষ নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থে ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করছেন। নিজেদের সামাজিক অবস্থান ও প্রভাব বাড়ানোর জন্য তাঁরা সাধারণ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগাচ্ছেন। বিভিন্ন অবৈজ্ঞানিক, ভিত্তিহীন ও কাল্পনিক কাহিনি শুনিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন। একেকজন একেক রকম ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করছেন। এভাবে তাঁরা দেশটাকে পতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।

আজ বাংলাদেশে হাজার হাজার মাদ্রাসা ও কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই শিক্ষা মানুষকে কী দিচ্ছে?

মানুষকে কি আধুনিক জ্ঞান দিচ্ছে? বিজ্ঞান শেখাচ্ছে? কারিগরি দক্ষতা তৈরি করছে? কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে তুলছে?

অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানে আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উৎপাদনমুখী শিক্ষার পরিবর্তে শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা, পরকাল, জিহাদ ও পরলৌকিক জীবনের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ধর্মীয় শিক্ষার নামে যৌন হয়রানি, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহের অপব্যবহার, শিশু নির্যাতন এবং বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও আমরা দেখতে পাই। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কোনো ধর্মীয় পরিচয় অপরাধের দায় থেকে কাউকে মুক্তি দিতে পারে না।

একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে যদি উৎপাদনশীল শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়, তাহলে তারা কীভাবে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে?

অনেকে মনে করেন, আল্লাহর নামে জিকির করে, ওয়াজ করে এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেই জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি এভাবে পরিচালিত হতে পারে না। একটি জাতির উন্নয়নের জন্য উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকল্প নেই।

তাঁরা মানুষকে শেখাচ্ছেন, এই পৃথিবী নশ্বর, একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে, বেহেশতে যেতে হবে। পরকাল ও আধ্যাত্মিকতার কথা বলে মানুষের পার্থিব জীবন, শিক্ষা, বিজ্ঞান, কর্মসংস্থান ও সামাজিক দায়িত্বকে অনেক সময় গৌণ করে তুলছেন।

কিন্তু পৃথিবীতে মানুষের জীবনও তো গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের জীবনকে সুন্দর করা, দারিদ্র্য দূর করা, শিক্ষা বিস্তার করা, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা—এসব কি ধর্মীয় ও মানবিক দায়িত্বের অংশ নয়?

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এ দেশের অনেক বিত্তবান ও শিক্ষিত মানুষ এসব প্রতিষ্ঠানে বিপুল অর্থ দান করছেন। তাঁরা বড় বড় মসজিদ, মাদ্রাসা, হেফজখানা ও এতিমখানা নির্মাণ করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব প্রতিষ্ঠানে কতটা আধুনিক শিক্ষা, কতটা বিজ্ঞানচর্চা এবং কতটা উৎপাদনশীল দক্ষতা তৈরি হচ্ছে?

অন্যদিকে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি অংশ অনেকে এসব প্রতিষ্ঠানে দান করছেন। তাঁরা মনে করছেন, অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করলেও তার কিছু অংশ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দান করলে পাপের বোঝা কমে যাবে। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেই সবকিছু মাফ হয়ে যাবে।

কিন্তু ঘুষ খাওয়া, দুর্নীতি করা, মানুষের অধিকার নষ্ট করা এবং রাষ্ট্রের সম্পদ লুট করার পর তার একটি অংশ দান করলেই কি সেই অন্যায়ের নৈতিক দায় শেষ হয়ে যায়?

এই অদ্ভুত চিন্তাধারা আমাদের সমাজে দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয়কে আরও প্রশ্রয় দিচ্ছে।

বাংলাদেশের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নেই। ঘুষ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে কোনো কাজই হয় না। আর সেই ঘুষ ও দুর্নীতির অর্থের একটি অংশ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দান করে অনেকে নিজেদের নৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন বলে মনে করেন।

এটি এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা। ধর্মের নামে এই বিকৃত চিন্তাধারা থেকে বাঙালি জাতির মুক্তি প্রয়োজন।

আজ বাংলাদেশের কোনো সুস্পষ্ট জাতীয় লক্ষ্য নেই, আমরা আমাদের ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলছি, নিজেদের পরিচয় হারিয়ে ফেলছি। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে জাতিকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।

আমার মতে, আগামী দিনে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি অভিন্ন জাতীয় কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। মাদ্রাসাশিক্ষাকে আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। শুধু ধর্মীয় শিক্ষা কোনো মানুষের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাগত যোগ্যতার বিকল্প হতে পারে না।

মাদ্রাসা বোর্ডসহ সব শিক্ষাধারার মধ্যে একটি অভিন্ন শিক্ষাগত মান প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস, প্রযুক্তি, ভাষা ও কারিগরি শিক্ষা দিতে হবে।

তা না হলে সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে আমরা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ব। বিশেষ করে বর্তমান এআই যুগে আমরা আরও পিছিয়ে যাব।

আমরা এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করব, যারা আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তির পরিবর্তে সামাজিক সংঘাত, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড এবং উগ্রবাদী চিন্তায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। শেষ পর্যন্ত দেশটাকে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলবে।

আগামী দিনে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসবেন, তাঁদের এই বিষয়গুলো নিয়ে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকতে হবে।

দেশকে যারা ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে, সেই ব্যর্থ রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। বিশেষ করে ইউনূস চক্র, জামায়াতে ইসলামী এবং ধর্মান্ধ রাজনৈতিক শক্তির উত্থান সম্পর্কে জাতিকে সচেতন হতে হবে।

আজ তৌহিদী জনতার নামে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে যে ধরনের উগ্র ও অরাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মানুষের বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা, পুড়িয়ে দেওয়া, নির্যাতন, ধর্ষণ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

কোনো জনতা আইন ও বিচারব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না। ধর্মের নামে কাউকে হত্যা করার অধিকার কারও নেই।

আগামী দিনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি এসব বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান নিতে না পারে, যদি একটি অভিন্ন আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, যদি ধর্মের নামে উগ্রবাদ ও সহিংসতা ছড়ানো ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে না পারে, তাহলে এই দেশের কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না।

বাংলাদেশ ক্রমশ আফগানিস্তানের মতো একটি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

এতে কোনো ভুল নেই।

আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেই সবকিছু মাফ হয়ে যাবে।

কিন্তু ঘুষ খাওয়া, দুর্নীতি করা, মানুষের অধিকার নষ্ট করা এবং রাষ্ট্রের সম্পদ লুট করার পর তার একটি অংশ দান করলেই কি সেই অন্যায়ের নৈতিক দায় শেষ হয়ে যায়?

এই অদ্ভুত চিন্তাধারা আমাদের সমাজে দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয়কে আরও প্রশ্রয় দিচ্ছে।

বাংলাদেশের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নেই। ঘুষ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে কোনো কাজই হয় না। আর সেই ঘুষ ও দুর্নীতির অর্থের একটি অংশ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দান করে অনেকে নিজেদের নৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন বলে মনে করেন।

এটি এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা। ধর্মের নামে এই বিকৃত চিন্তাধারা থেকে বাঙালি জাতির মুক্তি প্রয়োজন।

আজ বাংলাদেশের কোনো সুস্পষ্ট জাতীয় লক্ষ্য নেই, আমরা আমাদের ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলছি, নিজেদের পরিচয় হারিয়ে ফেলছি। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে জাতিকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।

আমার মতে, আগামী দিনে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি অভিন্ন জাতীয় কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। মাদ্রাসাশিক্ষাকে আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। শুধু ধর্মীয় শিক্ষা কোনো মানুষের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাগত যোগ্যতার বিকল্প হতে পারে না।

মাদ্রাসা বোর্ডসহ সব শিক্ষাধারার মধ্যে একটি অভিন্ন শিক্ষাগত মান প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস, প্রযুক্তি, ভাষা ও কারিগরি শিক্ষা দিতে হবে।

তা না হলে সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে আমরা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ব। বিশেষ করে বর্তমান এআই যুগে আমরা আরও পিছিয়ে যাব।

আমরা এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করব, যারা আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তির পরিবর্তে সামাজিক সংঘাত, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড এবং উগ্রবাদী চিন্তায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। শেষ পর্যন্ত দেশটাকে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলবে।

আগামী দিনে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসবেন, তাঁদের এই বিষয়গুলো নিয়ে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকতে হবে।

দেশকে যারা ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে, সেই ব্যর্থ রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। বিশেষ করে ইউনূস চক্র, জামায়াতে ইসলামী এবং ধর্মান্ধ রাজনৈতিক শক্তির উত্থান সম্পর্কে জাতিকে সচেতন হতে হবে।

আজ তৌহিদী জনতার নামে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে যে ধরনের উগ্র ও অরাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মানুষের বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা, পুড়িয়ে দেওয়া, নির্যাতন, ধর্ষণ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

কোনো জনতা আইন ও বিচারব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না। ধর্মের নামে কাউকে হত্যা করার অধিকার কারও নেই।

আগামী দিনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি এসব বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান নিতে না পারে, যদি একটি অভিন্ন আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, যদি ধর্মের নামে উগ্রবাদ ও সহিংসতা ছড়ানো ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে না পারে, তাহলে এই দেশের কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না।

বাংলাদেশ ক্রমশ আফগানিস্তানের মতো একটি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। এতে কোনো ভুল নেই।

লেখক: শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: