বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

গোয়েন্দা রিপোর্ট ছিল পকেটে, তবুও ঘুমিয়ে ছিল সরকার? আগাম সতর্কতা উড়িয়ে শ্রমিক অসন্তোষে বিপর্যস্ত দেশ!

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:০৩ এএম
গোয়েন্দা রিপোর্ট ছিল পকেটে, তবুও ঘুমিয়ে ছিল সরকার? আগাম সতর্কতা উড়িয়ে শ্রমিক অসন্তোষে বিপর্যস্ত দেশ!

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি পোশাক খাত আজ এক গভীর সংকটের মুখে। দুই সপ্তাহ আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা থেকে আগাম গোয়েন্দা সতর্কতা পাঠানো হলেও এবং সুনির্দিষ্ট সুপারিশ থাকার পরও সরকারের নীতিগত নিষ্ক্রিয়তা ও উদাসীনতার কারণে পহেলা নভেম্বরের ভয়াবহ সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে—সরকার কি তবে কেবল 'ষড়যন্ত্রের জুজু' দেখিয়ে নিজেদের দায় এড়াতে চাইছে?

১. গোয়েন্দা চিঠির আগাম সতর্কতা এবং সরকারের রহস্যজনক নীরবতা

গত ১৮ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা থেকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা চিঠি পাঠানো হয়। উপসচিব কে এম ইয়াসির আরাফাতের স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, পে-স্কেল, ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন, চা ও নৌযান শ্রমিকদের বকেয়া ও দাবি আদায়ের ক্ষোভের জেরে দেশের শ্রমখাতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে ৪টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হলেও বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর পক্ষ থেকে সময়মতো কোনো প্রতিরোধমূলক বা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এমনকি উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যেই শ্রমমন্ত্রীর বিদেশ সফরের পরিকল্পনাও সরকারের দায়িত্বহীনতার বড় প্রমাণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

২. পহেলা নভেম্বরের দাবানল: গাজীপুর থেকে মিরপুর নজিরবিহীন সহিংসতা গোয়েন্দা সতর্কতার কার্যকারিতা না থাকায় গত পহেলা নভেম্বর সকালে গাজীপুরের কোনাবাড়ী, কালিয়াকৈর, চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, মৌচাক এবং সাভার-আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন।

ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, বকেয়া পরিশোধ এবং কালো তালিকাভুক্তির প্রথা বাতিলের দাবিতে শ্রমিকরা ঢাকা-টাঙ্গাইল ও নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক অবরোধ করেন।

কোনাবাড়ী ও মিরপুরে পুলিশের সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষ, পুলিশ বক্সে ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

নিরাপত্তার মারাত্মক ঝুঁকিতে মিরপুরের তিনটি মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

৩. ৫২৯টি কারখানা বন্ধ ও ১০ লাখ শ্রমিকের অনুপস্থিতি: অর্থনৈতিক বিপর্যয়

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় এবং শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা ভেঙে পড়ায় মালিকপক্ষ বাধ্য হয়ে একের পর এক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে।

বাংলা ট্রিবিউনের তথ্য অনুযায়ী, একযোগে ৫২৯টি তৈরি পোশাক কারখানা থেকে শ্রমিকরা বের হয়ে যান এবং প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক কাজে যোগ দেননি।

মালিকপক্ষের ‘কাজ নেই, বেতন নেই’ বা শ্রম আইনের ১৩(১) ধারায় কারখানা বন্ধ রাখার কঠোর সিদ্ধান্ত সাধারণ দরিদ্র শ্রমিকদের আরও বেশি ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।

এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সময়মতো পোশাক সরবরাহের বাধ্যবাধকতা বা 'লিড টাইম' মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে, যা দেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে।

৪. সরকারের দায় এড়ানোর সংস্কৃতি: ‘ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব’ বনাম বাস্তবতার সংকট

পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জরুরি বৈঠক করলেও এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ ও শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী পরিস্থিতি কঠোর হাতে দমন করার হুশিয়ারি দিলেও মূল সংকট চাপা থাকছে।

সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, এই অস্থিরতার পেছনে সীমান্তের ওপার থেকে ইন্ধন রয়েছে এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীলতা তৈরির পাঁয়তারা চলছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দোষরোপ বা ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব দিয়ে শ্রমিকদের অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতির বাজারে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ন্যায্য মজুরির দাবি পাশ কাটানো যাবে না। গোয়েন্দা সংস্থার নিজস্ব রিপোর্ট অনুযায়ী পুলিশের বর্তমান সক্ষমতা দিয়ে বড় ধরনের আন্দোলন সামাল দেওয়া দুরূহ, যা নীতিনির্ধারকদের বড় ব্যর্থতারই ইঙ্গিত দেয়।

শেষ কথা শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলন এবং কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অশুভ চক্রান্ত—দুটি বিষয়কে আলাদাভাবে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা জরুরি। কেবল গোয়েন্দা রিপোর্ট চাপা দিয়ে বা ষড়যন্ত্রের অজুহাত দিয়ে শিল্পাঞ্চলের এই বারুদ স্তিমিত করা যাবে না। অতি দ্রুত শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি বাস্তবায়ন এবং মালিক-শ্রমিক আস্থার সংকট দূর করে দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি খাতকে রক্ষা করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: