নেপথ্যের কারিগর বনাম জনতা: বাংলাদেশের ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ ও সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতার সংকট
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কেবল রাজপথের উত্তাল আন্দোলন বা সাধারণ ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহের ফল ছিল না—এর পেছনে কাজ করেছে পর্দার আড়ালের নানাবিধ কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারসাজি। সম্প্রতি সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলমের একটি ফেসবুক পোস্ট এই নেপথ্য কাহিনীর এক বিস্ফোরক সত্য উন্মোচন করেছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের ঠিক প্রাক্কালে এএফপির (AFP) একজন সাংবাদিক কীভাবে ছাত্রনেতা ও ড. ইউনূসের মধ্যে গোপন যোগাযোগের মূল সেতু বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন। এই ঘটনা গণমাধ্যমের পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদের নৈতিকতা নিয়ে এক গভীর ও কঠোর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
১. সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা বনাম রাজনৈতিক দালালি: এএফপির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো বস্তুনিষ্ঠতা, দূরত্ব বজায় রাখা এবং নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন। কিন্তু যখন কোনো আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার ফ্যাক্ট-চেক দলের সম্পাদক সরাসরি একটি দেশের সরকার হটানোর গোপন মিশনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন, তখন সেই সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?
শফিকুল আলমের বিবরণে স্পষ্ট যে, কাদারউদ্দিন শিশির নামের ওই সাংবাদিক কেবল সংবাদ সংগ্রহ করেননি, বরং তিনি ছাত্রনেতাদের গোপন বার্তা ড. ইউনূসের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের নেপথ্য নকশা তৈরিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। প্রশ্ন হলো—একজন পেশাদার সাংবাদিকের কাজ কি একটি দেশের ক্ষমতার পালাবদলে ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা দূতের ভূমিকা পালন করা? এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত স্বাধীন সাংবাদিকতা ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার প্রতিনিধিরা স্থানীয় রাজনীতির ক্ষমতার খেলায় সরাসরি পক্ষাবলম্বন করছেন।
২. গোপন যোগাযোগ ও ক্ষমতার হস্তান্তর: নেপথ্যের কুশীলবরা
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মাত্র দুই দিন আগের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারবিরোধী আন্দোলন যতই তীব্র হচ্ছিল, ততই পর্দার আড়ালে একদল অদৃশ্য কুশীলব ক্ষমতার সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত ছিলেন। ছাত্রনেতারা যখন ড. ইউনূসকে পরবর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য বিশ্বস্ত মাধ্যম খুঁজছিলেন, তখন এই সাংবাদিক সেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি অত্যন্ত সুকৌশলে সম্পন্ন করেন।
শফিকুল আলম তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেছেন যে, তখনকার নিরাপত্তা বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পেতে এই গোপন বৈঠক ও যোগাযোগ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালিত হয়েছিল। এই চিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বাংলাদেশের রাজনীতির ভাগ্য নির্ধারণে সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের আড়ালে সব সময়ই কিছু ক্ষমতালোভী ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠী পর্দার অন্তরালে নিজেদের স্ক্রিপ্ট সাজাতে ব্যস্ত থাকে।
৩. আন্তঃসীমান্ত রাজনৈতিক অভিসন্ধি ও ‘রেজিম চেঞ্জ’ তত্ত্ব
প্রশান্ত ভূষণের ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ বা ‘রেজিম চেঞ্জ’ সংক্রান্ত মন্তব্য এবং পরবর্তীতে ভারতীয় তরুণ ও ছাত্র আন্দোলনের প্রতি বাংলাদেশের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সংহতি প্রকাশ পুরো দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাকে ভারতের মাটিতে রপ্তানি করার বা সমান্তরাল আন্দোলন গড়ে তোলার যে প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে, তা কেবল আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে। একদিকে নিজেদের দেশে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা জিইয়ে রেখে অন্যদিকে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো বা বিপ্লবী বয়ান তৈরি করা এক ধরণের রাজনৈতিক দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছু নয়।
৪. বিপ্লবের রোমান্টিসিজম বনাম ক্ষমতার নির্মম বাস্তবতাবাদের দ্বান্দ্বিক রূপ জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উত্থানকে ঘিরে যে রোমান্টিসিজম তৈরি করা হয়েছিল, তার আসল রূপ আজ উন্মোচিত হচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যখন রাজপথে গুলি খাচ্ছিল এবং রক্ত ঝরাচ্ছিল, তখন পর্দার আড়ালে আন্তর্জাতিক লবি, সাংবাদিক এবং অভিজাত বুদ্ধিজীবীরা ক্ষমতার মসনদ কার হাতে যাবে তা নিয়ে দরকষাকষিতে ব্যস্ত ছিলেন।
আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এটি স্পষ্ট যে, তথাকথিত বিপ্লব কেবল জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; এটি ছিল সুপরিকল্পিত ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি অংশ, যেখানে গণমাধ্যমকর্মীরাও নিজেদের পেশাদারিত্ব বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন।
শেষকথা:
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট হলেও এর নেপথ্যের কারসাজিগুলো আজ এক গভীর নৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। সাংবাদিকতার লেবাস পরে যারা ক্ষমতার পালাবদলের ‘দূত’ হিসেবে কাজ করেন, তারা কখনোই গণতন্ত্রের প্রকৃত বন্ধু হতে পারেন না। ইতিহাস একদিন বিচার করবে—কোন শক্তি জনগণের আবেগকে ব্যবহার করে পর্দার আড়ালে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করেছিল।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ, সামরিক বিমানে ভারতে যাত্রা এবং গোপনীয়তার প্রশ্ন; ভিডিও ধারণের জেরে চাকরিচ্যুতি, কোর্ট মার্শাল ও এক কর্মকর্তার রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক
মৃত্যুর পরও মুক্তি নেই একাত্তরের বীরের: এ কেমন বাংলাদেশ যেখানে মুক্তিযোদ্ধার কবর খোঁড়ার জন্য বিচারে মুখোমুখি হতে হয়।
শেখ হাসিনা কীভাবে ফিরতে পারেন